আইরিশ বিপ্লবী ও মরমি কবি

জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেট (Joseph Mary Plunkett) ছিলেন একজন দৃঢ় আইরিশ জাতীয়তাবাদী। তিনি আইরিশ সংস্কৃতি, ভাষা এবং ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের জন্য কাজ করতেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ছিল আইরিশ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা, যা ব্রিটিশ শাসন থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হবে। তিনি ‘আইরিশ ভলান্টিয়ার্স’ (Irish Volunteers) ও ‘আইরিশ রিপাবলিকান ব্রাদারহুড’ (IRB)-এর সদস্য হন। ১৯১৫ সালে তিনি জার্মানিতে গিয়ে রজার কেসমেন্টের সাথে আইরিশ স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করেন, যদিও এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

ইস্টার বিদ্রোহ ছিল ১৯১৬ সালের ২৪ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত সংঘটিত একটি সশস্ত্র বিপ্লব, যার মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আইরিশ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। এটি মূলত ডাবলিন শহরে সংঘটিত হলেও আয়ারল্যান্ডজুড়ে এর প্রভাব পড়ে। এই সময় জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেট একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি এই বিদ্রোহের একজন প্রধান নেতা ও সামরিক পরিকল্পনাকারী ছিলেন। তিনি জেমস কনোলি ও প্যাট্রিক পিয়ার্সের মতো নেতাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন। অসুস্থ শরীরে তিনি ডাবলিনের জেনারেল পোস্ট অফিস (GPO)-এ বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দেন।

বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে তাঁকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর জীবনে এক করুণ অধ্যায়ের সূচনা হয়। মৃত্যুর ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি তাঁর বাগদত্তা গ্রেস গিফোর্ডকে (Grace Gifford) বিয়ে করার অনুমতি পান। ১৯১৬ সালের ৪ মে প্লাঙ্কেটকে ফাঁসি দেওয়া হয়। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে কারাগারে তাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। এই বিয়ে ও তাঁর আত্মোৎসর্গে এক অদ্ভুত রোমান্টিকতা ও ট্র্যাজেডির মিশেল আছে; যা আইরিশ জাতীয় চেতনাকে আজও আন্দোলিত করে।

প্লাঙ্কেটের প্রেমিকা ও ক্ষণকালীন স্ত্রী গ্রেস ইভলিন গিফোর্ডের (Grace Evelyn Gifford) জন্ম ১৮৮৮ সালে ও মৃত্যু ১৯৫৫ সালে। তিনি ছিলেন একজন আইরিশ শিল্পী, কার্টুনিস্ট ও স্বাধীনতাকামী সক্রিয় কর্মী। গ্রেস  ক্যাথলিক ধর্মে দীক্ষিত প্রটেস্ট্যান্ট পরিবারে জন্ম নেওয়া স্বাধীনচেতা নারী। 

প্লাঙ্কেটের তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের নাম হলো “The Circle and the Sword”। এই কাব্যগ্রন্থে তিনি তাঁর বিপ্লবী আদর্শ এবং আইরিশ জাতীয়তাবাদের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পরে The Poems of Joseph Mary Plunkett প্রকাশিত হয়।

তাঁর জীবন ও কবিতার মূল ভাষ্য– আদর্শের জন্য আত্মত্যাগ কখনও বৃথা যায় না, এবং কবিতার ভাষায় বিপ্লবের বাণীও উচ্চারণ করা যায়। 
প্লাঙ্কেটের কয়েকটি কবিতা

১.
আমি সমুদ্রের একটি ঢেউ
এবং ঢেউয়ের ফেনা
এবং ফেনার বাতাস
এবং বাতাসের ডানা।

আমার আত্মা সমুদ্রের লবণে
ঢেউয়ের ভারে
ফেনার বুদবুদে
বাতাসের পথে।

আমার উপহার সমুদ্রের গভীরতা
ঢেউয়ের শক্তি
ফেনার লঘুতা
বাতাসের গতি।
[A Wave of the Sea]

২.
মধ্যরাতে আমি সূর্য দেখলাম, রক্তিম হয়ে উঠছে,
গভীর রঙে রঞ্জিত তবু জ্বলজ্বলে, রক্তের করুণ ভারে।
আমি দেখলাম তা দ্রুত আকারে বাড়ছে,
এবং ছড়িয়ে পড়ছে তারাদের ওপর; নত হলো আকাশ তার মাথা।
তার হৃদয় থেকে যখন টুপটাপ করে ঝরছিল গাঢ় লাল বৃষ্টি,
তখন এক বিরাট কম্পন তাকে নাড়িয়ে দিল, যেন যন্ত্রণায়–
রাতের আঁধার নেমে এলো, করুণ আর্তনাদে, যখন সে সেখানে ঝুলে আছে মৃতের মতো।
হে সূর্য, হে খ্রিষ্ট, হে জ্বলন্ত শিখার রক্তক্ষয়ী হৃদয়!
তুমি তোমার যন্ত্রণাকে আমাদের জীবনের মূল্য হিসেবে দিয়েছ,
এবং তাকে করেছ অনন্ত, যাতে তোমার নাম ধরে ডাকার মতো
অধিকারের অভাব আমাদের না হয়;
তুমি পৃথিবীকে বন্ধক রেখেছ স্বর্গের জন্য
আর আমাদের মহিমার জন্য সকল লজ্জা ভোগ করেছ।
[I Saw the Sun at Midnight]

৩.
আমি গোলাপের পাপড়িতে দেখি তাঁর রক্তের ছাপ,
নক্ষত্রে দেখি তাঁর চোখের জ্যোতি।
চিরতুষারাবৃত শ্বেত পর্বতের মাঝে ঝলমল করে তাঁর দেহ–
আকাশ থেকে পড়ে তাঁর কান্নার অশ্রু।

প্রতিটি ফুলের মধ্যে আমি দেখি তাঁর মুখ,
বজ্রনিনাদ ও পাখির গান– সবই তাঁর কণ্ঠস্বর।
পর্বতের গায়ে খোদাই করা শিলালিপির মতো
লিখিত তাঁর বাণী।

প্রতিটি পথের ধুলোয় আছে তাঁর পদচিহ্ন,
সমুদ্রের অনিঃশেষ ঢেউ তাঁর হৃদয়ের ধুকপুক।
প্রত্যেক কাঁটায় জড়ানো তাঁর কাঁটার মুকুট,
আর প্রতিটি গাছ যেন তাঁর ক্রুশবিদ্ধতার স্মৃতি।
[I See His Blood Upon the Rose]

৪.
মাতাল তারারা আকাশ জুড়ে টলমল করে,
চাঁদ দোদুল্যমান ও দোলে বাতাসের ঝাপটায় পড়া কুঁড়ির মতো,
আমার পায়ের নিচে পৃথিবী, ভেসে চলা মেঘের মতো
গলে যায় আর পিছলে যায়, গড়াগড়ি খায় আর উঁচুতে ছুটে চলে;
অচল বস্তুগুলো হঠাৎ উড়ে যেতে শুরু করে,
শহর কাঁপে আর কাঁপতে থাকে, কাদা আর পঙ্কের এক শহর–
আমার রক্ত হলো গলে যাওয়া ধাতু ও আগুনের এক কোলাহলপূর্ণ জলপ্রপাত–
ঈশ্বরের মতো আমিও একজন।
যখন ঈশ্বর আমাদের তৃষ্ণার জন্য তাঁর আবেগ-ফল পিষে দেন
এবং মহাবিশ্ব টলমল করে– আমি পৃথিবীর আঙুর ফাটিয়েছি,
আর তার শক্তিশালী রক্তকে যেতে দিয়েছি
অস্বাদিত– চিৎকার করে জানতে চাই, আমার দৃষ্টি কি সাহস করে
একজন মেয়ের কোমল রূপে ঈশ্বরের উচ্চ মহিমা দেখতে পারবে–
হে ঈশ্বর! আমার এই উপাসনা কি আশীর্বাদপ্রাপ্ত, নাকি অভিশপ্ত?
[The Splendour of God] 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *