রবীন্দ্রনাথের শেষ বয়সের প্রিয়া

চিত্রকর রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ভাবতে গেলেই প্রথমে যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা হলো–আমরা কি সত্যিই তাঁকে সম্পূর্ণভাবে চিনি? কবি, কথাসাহিত্যিক, গীতিকার, দার্শনিক, নাট্যকার, চলচ্চিত্র নির্মতা, পরিব্রাজক, শিক্ষাবিদ–এই বহুমাত্রিক পরিচয়ের ভিড়ে তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সত্তা হলো তাঁর চিত্রকর রূপ। এই রূপটি কোনো পার্শ্বচরিত্র নয়; বরং তাঁর সৃজনী শক্তির এক গভীর, অন্তর্মুখী এবং বিস্ময়কর প্রকাশ। বাংলা সাহিত্যের যে মহীরুহ আমাদের ভাষা ও ভাবনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে, সেই একই মানুষ রং ও রেখার মাধ্যমে আরেকটি স্বতন্ত্র জগত নির্মাণ করেছেন–যেখানে শব্দের প্রয়োজন নেই, কিন্তু অনুভূতির তীব্রতা আরও নিবিড়।

রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার সূচনা ছিল একেবারেই আকস্মিক। কোনো আর্ট স্কুলের পাঠ, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অনুশীলন কিংবা পূর্বপরিকল্পিত শিল্পচর্চা তাঁর ছিল না। কবিতা বা প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে যখন তিনি খাতা কাটাকুটি করতেন, তখনই সেই কাটাকুটির ভেতর থেকে অদ্ভুত সব রেখা, ছায়া, আকার ফুটে উঠতে থাকে। এই আপাত এলোমেলো রেখাগুলোই ধীরে ধীরে রূপ নেয় চিত্রে। যেন শব্দের ভেতর থেকে ছবি জন্ম নিচ্ছে, অথবা আমরা দেখি–লেখার ভাঙন থেকেই নতুন এক সৃষ্টির উন্মেষ ঘটছে। এই স্বতঃস্ফূর্ততার মধ্যেই তাঁর চিত্রকলার মৌলিক শক্তি নিহিত। তিনি কোনো পূর্বনির্ধারিত নিয়ম মেনে চলেননি; বরং নিজের ভেতরের তাগিদ থেকেই এক নতুন শিল্পভাষা নির্মাণ করেছেন।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সাংস্কৃতিক আবহ এই সৃষ্টিশীলতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সেখানে সংগীত, সাহিত্য, নাটক ও চিত্রকলার এক সমন্বিত চর্চা চলত। তাঁর পরিবারে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো শিল্পীরা ছিলেন, যাদের কাজ রবীন্দ্রনাথকে প্রভাবিত করেছিল নিঃসন্দেহে। কিন্তু তিনি তাঁদের অনুকরণ করেননি; বরং তাঁদের উপস্থিতিকে পাথেয় করে নিজস্ব পথ নির্মাণ করেছেন। এই স্বাতন্ত্রই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়।

রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার সবচেয়ে লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো– স্বাধীনতা। তাঁর ছবিতে কোনো বাঁধাধরা গঠন নেই, নেই প্রচলিত নন্দনবোধের অনুগমন। তিনি রেখাকে ব্যবহার করেছেন এক ধরনের ভাষা হিসেবে–যা কখনো কঠিন, কখনো কোমল, কখনো বা ভাঙা। রঙের ক্ষেত্রেও তাঁর ব্যবহার ছিল স্বতন্ত্র; গাঢ়, সংযত এবং অনেক সময় অপ্রত্যাশিত। তিনি তুলি ছাড়াও আঙুল, কাপড় কিংবা অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে রং প্রয়োগ করতেন। ফলে তাঁর ছবিতে এক ধরনের টেক্সচার বা বুনন তৈরি হয়েছে, যা প্রথাগত চিত্রকলার বাইরে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করে।

তাঁর আঁকা মানবমুখগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই মুখগুলোতে আমরা সাধারণ প্রকাশরীতির চেয়ে বেশি দেখি এক ধরনের গভীরতা, বিষণ্নতা এবং অন্তর্গত টানাপোড়েন। নারীমুখ তাঁর ছবিতে বারবার ফিরে এসেছে, কিন্তু তা কোনো অলঙ্কারমূলক উপস্থিতি নয়; বরং সেখানে এক ধরনের নীরব শক্তি ও রহস্য লুকিয়ে থাকে। এই মুখগুলো যেন কথা বলে না, কিন্তু তবুও তারা দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে। অনেক সময় মুখগুলো বিকৃত বা অসম্পূর্ণ, যেন শিল্পী ইচ্ছাকৃতভাবে রঙের উত্তরাধিকার প্রথার ধারণাকে ভেঙে দিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের চিত্রজগতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর কল্পনাপ্রসূত প্রাণী ও অবয়ব। তিনি এমন সব জীব আঁকেছেন, যেগুলো বাস্তবে নেই–অদ্ভুত, অচেনা, কখনো ভয়াবহ, কখনো হাস্যকর। এই সব চিত্র যেন তাঁর অবচেতনের প্রকাশ, যেখানে যুক্তির সীমা ভেঙে কল্পনা স্বাধীনভাবে বিচরণ করে। একই সঙ্গে প্রকৃতিও তাঁর ছবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। নদী, গাছ, আকাশ, গ্রামীণ দৃশ্য–এসব তাঁর ভ্রমণজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে, তবে তা কখনো সরাসরি বাস্তবের প্রতিলিপি নয়; বরং এক ধরনের আবেগময় রূপান্তর।

বিশ্বপরিমণ্ডলে তাঁর চিত্রকলার গ্রহণযোগ্যতা ছিল উল্লেখযোগ্য। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর তাঁর সাহিত্য যেমন বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়, তেমনি তাঁর চিত্রকলাও ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে। ইউরোপে তাঁর চিত্রপ্রদর্শনী শিল্পসমালোচকদের বিস্মিত করে। তাঁরা তাঁর কাজের মধ্যে এক ধরনের মৌলিকতা ও অন্তর্গত শক্তি দেখতে পান, যা কোনো নির্দিষ্ট ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আর্জেন্টিনার সাহিত্যিক ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সহায়তায় তাঁর চিত্রকর্ম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও বিস্তৃত পরিচিতি লাভ করে।

সমকালীন শিল্পীদের দৃষ্টিতেও তাঁর কাজ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর চিত্রকলার অভিনবত্বের প্রশংসা করেছিলেন, আর যামিনী রায় তাঁর স্বতঃস্ফূর্ততা ও শক্তিকে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। এই মূল্যায়ন প্রমাণ করে যে, রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা কোনো শখের বিষয় ছিল না; বরং তা ছিল গভীর শিল্পসাধনার ফল।

তাঁর চিত্রকলায় সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাও প্রতিফলিত হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসনের দমন, যুদ্ধের অস্থিরতা, মানবিক সংকট–এসব তাঁর ছবির ভেতর দিয়ে এক ধরনের প্রতীকী ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর আঁকা মুখগুলোর কঠোরতা, বিষণ্নতা কিংবা বিকৃতির ভেতর আমরা সেই সময়ের অস্থিরতা ও মানসিক চাপের প্রতিফলন দেখতে পাই। যেন তিনি শব্দের বদলে রেখা ও রঙের মাধ্যমে তাঁর সময়কে ধারণ করেছেন।

একটি আকর্ষণীয় বিষয় হলো–রবীন্দ্রনাথ আংশিক বর্ণান্ধ ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। বিশেষ করে কিছু রঙের পার্থক্য নির্ণয়ে তাঁর অসুবিধা ছিল। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা তাঁর শিল্পকে বাধাগ্রস্ত করেনি; বরং তা এক নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। তাঁর রঙের ব্যবহার তাই প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে এক ধরনের স্বতন্ত্র ভাষা তৈরি করেছে। এই দিক থেকে তাঁর শিল্পীসত্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সীমাবদ্ধতাও কখনো কখনো সৃষ্টির নতুন পথ খুলে দেয়। রবীন্দ্রনাথ নিজের এ শিল্পসত্তাকে বলেছেন–শেষ বয়সের প্রিয়া। মূলত পরিণত বয়সে রবীন্দ্রনাথ চিত্রকলায় জীবন দর্শনের গভীরতাকে খুজেঁছেন।

তবে তাঁর চিত্রকলাকে ঘিরে বিতর্কও ছিল। কেউ কেউ মনে করেন, তাঁর কাজে ইউরোপীয় আধুনিক শিল্পধারার প্রভাব রয়েছে। কিন্তু প্রভাব থাকা মানেই অনুকরণ নয়। বরং তিনি সেই প্রভাবকে নিজের ভেতরে গ্রহণ করে তা নতুনভাবে প্রকাশ করেছেন। ফলে তাঁর কাজ হয়ে উঠেছে একেবারেই নিজস্ব, যেখানে বাইরের প্রভাব থাকলেও তা সম্পূর্ণভাবে রূপান্তরিত।

রবীন্দ্রনাথ নিজে তাঁর চিত্রকলার বিষয়ে খুব আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না। অনেক সময় তিনি এটিকে তুচ্ছ করে দেখেছেন, কিংবা বলেছেন এটি তাঁর প্রধান কাজ নয়। কিন্তু এই আত্মসন্দেহই হয়তো তাঁকে আরও নিরীক্ষামূলক করে তুলেছিল। তিনি কোনো স্থির জায়গায় থেমে থাকেননি; বরং ক্রমাগত নতুন কিছু খুঁজে বেড়িয়েছেন। তাঁর ছবিতে তাই এক ধরনের চলমানতা ও অনুসন্ধিৎসা লক্ষ্য করা যায়।

চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ আমাদের সামনে এক ভিন্নতর শিল্পীসত্তার পরিচয় তুলে ধরে– যেখানে শব্দের বদলে রং ও রেখা কথা বলে। তাঁর চিত্রকলায় যেমন ব্যক্তিগত অনুভবের গভীরতা রয়েছে, তেমনি আছে সময়ের প্রতিচ্ছবি, কল্পনার স্বাধীনতা এবং শিল্পের প্রতি এক নিরন্তর অনুসন্ধান। তিনি শুধু একজন কবি নন, শুধু একজন লেখক নন–তিনি এক বহুমাত্রিক স্রষ্টা, যার প্রতিটি সৃষ্টিধারা আমাদের নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। তাঁর আঁকা ছবিগুলো তাই নিছক দৃশ্য নয়; এগুলো নীরব ভাষা, যেখানে মানুষের মনের গভীরতম অনুভূতি প্রতিফলিত হয়। এই চিত্রকর রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে আবিষ্কার করা মানে, তাঁর সৃষ্টিশীলতার আরেকটি অনন্ত দিগন্তের মুখোমুখি হওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *