রাজনীতি-ইতিহাসের টানাপোড়েনে ঝুলে আছে ছবিটির ভবিষ্যৎ

বলিউডের ‘খলনায়ক’ সঞ্জয় দত্তের সময়টা যেন একের পর এক বিতর্কের ঘূর্ণাবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। একদিকে নোরা ফাতেহির সঙ্গে একটি গানের দৃশ্যকে ঘিরে জাতীয় মহিলা কমিশনের নোটিশ; অন্যদিকে তাঁর অভিনীত নতুন সিনেমা ‘আখেরি সওয়াল’ ঘিরে রয়েছে আইনি জটিলতা। সব মিলিয়ে তাঁর আগামীর প্রকল্পগুলো যেন মুক্তির আগেই আটকে যাচ্ছে নানা বিতর্কের জালে। এই জটিলতার মাঝেই ‘আখেরি সওয়াল’ এখন শুধু একটি সিনেমা নয়, বরং আপৎকালীন ভারতীয় রাজনীতি ও ইতিহাসের এক কাঠগড়ায় পরিণত হয়েছে।

গত ৩০ এপ্রিল ছবিটির ট্রেলার মুক্তির ঘোষণা থাকলেও শেষ মুহূর্তে সেন্সর বোর্ড (সিবিএফসি)-এর আপত্তিতে তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে যায়।

ভারতীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, ট্রেলার রিলিজের ঠিক আগের দিনই বোর্ড থেকে একাধিক সংশোধন ও পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ আসে, যার ফলে পুরো পরিকল্পনা ভেঙে পড়ে। ফলত সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা শুরু হলেও তা থেমে যায়। কেবল ট্রেলার নয়, শুটিং করা পোস্টার ও প্রোমো ভিডিওগুলোও যেন বাতিলের মুখে পড়েছে।

জানা গেছে, সেন্সর বোর্ডের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে ছবির বিষয়বস্তু ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা। বিশেষ করে টিজারে ব্যবহৃত কিছু প্রতীকী দৃশ্য ও সংলাপকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। সেখানে মহাত্মা গান্ধী হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী সময়ের ইঙ্গিত, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রেক্ষাপট এবং আরএসএসের শতবর্ষের যাত্রার মতো ঐতিহাসিক ঘটনার রেফারেন্স থাকায় বোর্ড এটিকে ‘উস্কানিমূলক ব্যাখ্যার সম্ভাবনাযুক্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সেন্সর বোর্ডের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘কল্পকাহিনি হলেও বাস্তব ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ইঙ্গিত থাকায় জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।’

অভিজিৎ মোহন ওয়ারাং পরিচালিত এই ছবির গল্প আবর্তিত হয়েছে এমন একটি গোপন বৈঠকের চারপাশে, যা নাকি বদলে দিয়েছিল দেশের রাজনৈতিক গতিপথ। প্রচলিত ইতিহাসের বাইরে গিয়ে ক্ষমতা, আদর্শ, বিশ্বাস এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের অন্ধকার দিকগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন নির্মাতা। এমনটাই দাবি প্রযোজকদের। তবে বোর্ডের কাছে সেই ‘অন্ধকার দিক’ যেন ‘বিকৃত ইতিহাস’ বলেই বিবেচিত হয়েছে।

গুঞ্জন রয়েছে, ছবিতে একটি চরিত্রকে ঘিরে এত স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে যে, শুটিং চলাকালীন সেটে কয়েকবার আইনি নোটিশ পৌঁছেছিল প্রযোজক অফিসে। ছবিতে সঞ্জয় দত্তের চরিত্রকে দেখা যাবে এক রহস্যময় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায়, যার অতীত ও বর্তমান দুটিই ধোঁয়াশায় মোড়া। নামাশি চক্রবর্তী, নীতু চন্দ্র, ত্রিধা চৌধুরী এবং সমীরা রেড্ডির মতো একঝাঁক তারকা ছবির বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সংঘাতের স্তর উন্মোচন করবেন বলে জানা গেছে। 

বিশেষ করে নামাশি চক্রবর্তীর চরিত্রটি নাকি সেই গোপন বৈঠকের এক নীরব সাক্ষী; যার ভেতরের টানাপোড়েন পুরো দ্বিতীয়ার্ধে রহস্য জিইয়ে রাখে।

তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ছবিটি আদৌ কবে মুক্তি পাবে? সেন্সর বোর্ডের নির্দেশ অনুযায়ী বেশ কয়েকটি সংলাপ পুনর্লিখন, কিছু ভিজ্যুয়াল রি-এডিট করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নির্মাতা পক্ষ এখন সেই পরিবর্তন নিয়েই নতুন করে কাটছাঁটের কাজ শুরু করেছে। তবে বলিউডের অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন–এত কাটছাঁটের পর ‘আখেরি সওয়াল’ কি আদৌ ‘আখেরি সওয়াল’ থাকবে, নাকি তা নীরব ‘দুখানি কথা’য় পরিণত হবে? এই বিতর্কের মাঝেই সঞ্জয় দত্তের ভক্তদের মধ্যে আবার নতুন করে উন্মাদনা তৈরি করেছে ‘খলনায়ক’-এর সম্ভাব্য সিকুয়াল নিয়ে গুঞ্জন। ইন্ডাস্ট্রির একটি অংশ মনে করছে, এই সময়টিকে ঘিরে তার পর্দার ‘অ্যান্টি-হিরো’ ইমেজ আবারও আলোচনায় ফিরে এসেছে, যা নতুন কাজগুলোর জন্য বাড়তি কৌতূহল তৈরি করছে। 

সব মিলিয়ে ‘আখেরি সওয়াল’ এখন আর শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়। এটি পরিণত হয়েছে এক রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সৃজনশীল টানাপোড়েনের প্রতীকী ঘটনায়। একদিকে ইতিহাসের পুনঃব্যাখ্যার স্বাধীনতা, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সংবেদনশীলতার প্রশ্ন। এই দুইয়ের মাঝখানে ঝুলে আছে ছবিটির ভবিষ্যৎ। এখন অপেক্ষা শুধু একটিই–সেন্সরের সব আপত্তিকর দৃশ্যগুলোর কাটার পর এই সিনেমা কি আদৌ তার সম্পূর্ণ রূপে দর্শকের সামনে আসতে পারবে, নাকি আরও দীর্ঘ অনিশ্চয়তার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *