মিশরের পিরামিড ও জ্যোতির্বিজ্ঞান

আফ্রিকা মহাদেশের দেশ মিশর, মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক কালজয়ী নাম। হাজার হাজার বছর আগে নীলনদের তীর ঘেঁষে যে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তা আজো পৃথিবীর মানুষকে বিষ্মিত করে। প্রাচীন মিশরীয়রা মিশরকে বলত তামেরি বা প্রিয় বা ভালবাসার ভূমি। বহিরাগত ভ্রমণকারীরা বলত সোনার ভূমি। সেটা শুধুমাত্র মিশরের ধনসম্পদের জন্য নয়, রাতের অন্ধকারে মরুভূমির বালি থেকে উঠে আসা স্বর্ণাভ দীপ্তিও ছিল এর কারণ। মিশর মানেই ফারাও, মমি, মিথলজি ও মহান সব স্থাপনা। মিশর মানেই পিরামিড। মানুষ মিশরকে চিনেই পিরামিডের কল্যাণে। পিরামিড পৃথিবীর প্রাচীন সপ্তাশ্চর্যের একটি। অবাক করার মতো বিষয় হলো বাকি সব ইতিহাসের গর্ভে বিলীন হয়ে গেলেও মিশরের পিরামিড দাঁড়িয়ে আছে স্বগর্বে। এটি এমন এক অত্যাশ্চর্য স্থাপনা যার আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে রহস্যের চাদর। সাড়ে চার হাজার বছর পূর্বে এই সুবিশাল, সুউচ্চ স্থাপনা কী করে বানানো হয়েছিল তা নিয়ে জল্পনা কল্পনার অন্ত নেই। পিরামিড ও তার নির্মাণশৈলি নিয়ে অনেক ধারণা ও মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। পিরামিডের ভিতরের দেয়ালে আঁকা নানা রকম ছবি, চিত্রলিপি, প্রাচীন লিপি উদ্ধার করে এ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানার চেষ্টা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এরপরও নিশ্চিত হওয়া যায়নি ঠিক কী কৌশলে তখনকার দিনে সুউচ্চ পিরামিডগুলো তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল।

পিরামিড যে সময়কালে তৈরি হয়েছিল, সেই সময়কালে চাকার আবিস্কার হয়নি। তখন তারা কিভাবে সেই পাথরগুলোকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেত? তখন লোহারও আবিষ্কার হয়নি। তাহলে তারা ওই ভারি পাথরগুলোকে কিভাবে কেটে সঠিক আকার দিয়ে পিরামিড বানালো?

গিজার পিরামিডের ওজন ৫৭ লক্ষ ৫০ হাজার টন। আর বর্তমান যুগের বুর্জ খলিফার ওজন মাত্র ৫ লক্ষ টন। আইফেল টাওয়ারের আগে গিজার পিরামিড ছিল সব থেকে উচ্চতম স্থাপনা যার উচ্চতা ৪৫০ ফুট। ২১ লাখের বেশি চুনাপাথরের ব্লক ব্যবহার করে এই পিরামিড বানানো হয়েছিল। যেগুলোর ওজন ২৮০০ কিলোগ্রাম থেকে ৮২ হাজার কিলোগ্রাম পর্যন্ত। ধারণা অনুযায়ী গিজার পিরামিড তৈরি করা হয়েছিল ২০ বছর ধরে এবং শ্রমিক খেটেছিল আনুমানিক এক লক্ষ। এই পাথরগুলো কেটে দড়ি এবং লাঠির মাধ্যমে নিয়ে আসা হয়েছিল দূরের আরেক শহর আসওয়ান থেকে। তাহলে প্রতিটি পাথর কেটে পিরামিড তৈরির স্থানে নিয়ে আসার জন্য তাদের কাছে সময় থাকত মাত্র আড়াই মিনিট। আপাতদৃষ্টিতে এটি অসম্ভব বলে মনে হলেও সত্য হলো তারা আমাদের চেয়ে কৌশল ও স্থাপত্য বিদ্যায় অনেক এগিয়ে ছিল। চার হাজার বছরের পুরোনো এক সমাধিতে অঙ্কিত এক চিত্রে দেখা যায় এক বিশাল স্তম্ভকে স্লেজে করে সরানো হচ্ছে। অনেক মানুষ রশি দিয়ে সেই স্লেজ টেনে নিচ্ছে। আর তাদের মধ্যে একজন পাত্র থেকে জল ঢালছে বালির উপর। এতে ঘর্ষণ প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়। এভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আড়াই টন ওজনের একেকটি ব্লক। এই অত্যাশ্চর্য স্থাপনার সাথে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। আমরা জানি মহাবিশ্বের দ্রুততম বস্তু আলো। এই আলোর গতি সেকেন্ডে ২৯,৯৭,৯২,৪৫৮ মিটার। আর গিজার পিরামিডগুলোর একটির অবস্থানের অক্ষাংশের মান ২৯.৯৭৯২৪৫৮ ডিগ্রি। গিজার গ্রেড পিরামিডের অক্ষাংশের মান ২৯.৯৭৯২ ডিগ্রি। এইরকম কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণেই গিজার পিরামিডগুলোকে বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভুল ও নিখুত স্থাপনা বলা হয়ে থাকে। রহস্য এখানেই, কিভাবে তখনকার মানুষ আলোর এই গতি জানত? আর আলোর গতির এই মানের সাথে পিরামিডের এই নিখুত অবস্থান তারা কিভাবে সৃষ্টি করলো? আর এত ধরনের সংখ্যা থাকতে তারা কেনো আলোর গতির প্রতিই নজর দিলো?

গিজার যে তিনটি পিরামিড রয়েছে সেগুলোর অবস্থান এমনভাবে যে এদের শীর্ষত্রয় পুরোপুরি ভাবেই অরিয়ন নক্ষত্রমণ্ডলের অরিয়ন বেল্টের নক্ষত্র তিনটি বরাবর দিকনির্দেশ করে। রাতের আকাশে সবচেয়ে লক্ষনীয় ও উজ্জ্বলতম নক্ষত্রমণ্ডল হলো কালপুরুষ বা অরিয়ন। রাতের আকাশে একে চেনা খুব সহজ। বিশেষত এর বেল্টের জন্য। যেখানে তিনটি নক্ষত্র এক সরলরেখায় অবস্থিত। যদিও তা সম্পূর্ণ সরলরেখা নয়, সামান্য বাঁকা। এই বেল্টের তিনটি নক্ষত্র দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে, যথাক্রমে অ্যালনিটাক, অ্যালনিলাম ও মিনট্যাকা। মিশরের গিজায় অবস্থিত তিনটি প্রধান পিরামিড (খুফু, খাফরে, মেনকাউরে) এর সাথে এই তিনটি তারা সমান সরলরেখায় অবস্থান করে। এই মিল থেকেই জন্ম নেয় Orion Correlation Theory (OCT)। এই সম্পর্কে মূলধারণাটি দেন রবার্ট বুভাল (জড়নবৎঃ ইধাঁধষ)। তাঁর মতে গিজার তিন পিরামিডের বিন্যাস আকাশের অরিয়ন বেল্টের তিন নক্ষত্রের সাথে অত্যন্ত সাদৃশ্যপূর্ণ। প্রাচীন মিশরিয়রা বিশ্বাস করত, ফারাওদের আত্মা মৃত্যূর পর অরিয়ন নক্ষত্রমণ্ডলে গমন করে। অরিয়ন ছিল দেবতা ও সিরিস (মৃত্যুর দেবতা) এর প্রতীক।

এই কারণে ধারণা করা হয়, পিরামিডগুলো কেবল সমাধি নয়, বরং আকাশভিত্তিক ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিফলন। হাজার হাজার বছর আগে ঠিক এই বিশ্বাস হতেই কি অরিয়ন বেল্টের তিন নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে ছিলেন মিশরের পিরামিড নির্মাতারা ? তবে এই তথ্য নিয়েও মতভেদ রয়েছে। অনেকের মতে পিরামিড ও নক্ষত্রের মিল পুরোপুরি নিখুত নয়। তাছাড়া এটি ইচ্ছাকৃত নকশা নাকি কাকতালীয় মিল সেটা নিয়েও অনেকে সন্দেহ পোষণ করেছেন। আকাশে এতো নক্ষত্র থাকতে গিজার পিরামিডগুলো কেনো শুধু অরিয়ন বেল্টের তিনটি নক্ষত্র বরাবরই নির্দেশ করুপে বানানো হলো?

তারা কি বুঝাতে চেয়েছে এটি দিয়ে ? শুধু তাই নয়, প্রতি ২৩৭৩ বছরে একবার বুধ, শুক্র ও শনি গ্রহ আকাশের এই তিনটি পিরামিডের উপরই এক সরলরেখায় অবস্থান নেয়।

মূলত ভাবার বিষয় হচ্ছে, তারা কিভাবে এ অবস্থান অগ্রিম জেনে পিরামিড তৈরি করলো? তবে কি, প্রাচীনকালে তখনকার মানুষেরা আমাদের বর্তমান সময়ের তুলনায় অনেক উন্নত প্রযুক্তি চর্চা করত? আর করলেও তাদের সে প্রযুক্তি হারিয়ে গেলো কেনো? কীভাবে? এসব প্রশ্নের কোন সঠিক উত্তর পত্নতত্ত্ববিদদের কাছে নেই। কারণ পিরামিডের নির্মাণশৈলিতে এমন কিছু কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে যা বুঝতে বর্তমান প্রত্নতত্ববিদ ও স্থাপত্যবিদদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। আরেকটি আশ্চর্যের বিষয় হলো যদি পৃথিবীর মানচিত্র দেখা হয় তাহলে দেখা যায় যে পৃথিবীর মূল কেন্দ্রে অবস্থান করছে পিরামিড। যদিও এ বিষয়টি বিতর্কিত। আজ থেকে সাড়ে চার হাজার বছর আগে তারা কিভাবে পৃথিবীর কেন্দ্র আবিস্কার করে সেই জায়গাতে পিরামিড তৈরি করল যেখানে আমরা মাত্র কিছুদিন আগেই জেনেছি যে পৃথিবী গোল। তাছাড়া এই যে নক্ষত্রের সাথে অবস্থান এবং পৃথিবীর মূল কেন্দ্রে পিরামিডের অবস্থান, এটা কী কাকতালীয়ভাবেই হয়ে গিয়েছিল, নাকি সব নিখুত পরিকল্পনার ফল?

মিশরের পিরামিডের গঠনশৈলী, রহস্য ও সৌন্দর্যের এক অনন্য সমন্বয়। মিশরের মতো পৃথিবীর খুব কম সভ্যতাই এতটা সমৃদ্ধ। আজো যেন সেখানে রাতের আঁধারে মরুভূমির বুকে প্রতিটি স্থাপনা রূপকথার গল্পের মতো ঘুমন্ত পৃথিবীকে তার ইতিহাস বলে যায়। তাই বলা হয়, মিশর কেবল দিনেই জ্বলে না, চিরকাল সে রাতেও জ্বলছে উজ্বল নক্ষত্রের মতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *