ইতিহাস, যুদ্ধ আর কূটনীতির ক্যানভাসে ‘রাজা শিবাজি

পরিচালক হিসেবে নিজের পথটা কত দ্রুত বদলে ফেলা যায়, তার উজ্জ্বল উদাহরণ হলেন বলিউড অভিনেতা ও নির্মাতা রীতেশ দেশমুখ। একদিকে প্রেম, অন্যদিকে প্রতিরোধের ইতিহাস। দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি দেখিয়ে দিলেন, বিনোদন জগতে সীমারেখা কখনোই চূড়ান্ত নয়। রীতেশের পরিচালনায় নির্মিত প্রথম ছবি ‘ভেদ’ ছিল নিখাদ প্রেমের গল্প। এই গল্পে তাঁর বিপরীতে ছিলেন স্ত্রী জেনেলিয়া ডি’সুজা। প্রেম, ত্যাগ, আবেগ। সব মিলিয়ে এক আন্তরিক প্রেমকাহিনি উপস্থাপন করেছিলেন তিনি। সেটি বক্স অফিসে ব্লকবাস্টার হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই দর্শকের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল–দ্বিতীয় ছবিতেও হয়তো প্রেমই ফিরবে, নতুন কোনো আঙ্গিকে। রীতেশ ভেঙে দিলেন সেই অনুমানের দেয়াল।

এবার তিনি ঝুঁকলেন ইতিহাসের দিকে এমন এক গল্পে, যা সময়ের সীমানা পেরিয়ে আজও হৃদয়বিদারক ও প্রেরণাদায়ক। সিনেমার নাম ‘রাজা শিবাজি’। নাম দেখেই আন্দাজ করা যায় এটি একটি পিরিয়ড ড্রামার আত্মকথা। ছবিটি নির্মিত হয়েছে মারাঠা সাম্রাজ্যের কিংবদন্তি শাসক ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের জীবনকাহিনি নিয়ে।

নির্মাতা রীতেশ বলেন, এই সিনেমাটি শুধু এক বীরের গল্প নয়; বরং এক প্রতিরোধের ইতিহাস, এক জাতির আত্মমর্যাদার কাহিনি। মুঘল শক্তি, নিজাম এবং ঔপনিবেশিক প্রভাবের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই ভারতীয় ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। সেই অধ্যায়কেই বড়পর্দায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এই ছবিতে আছে যুদ্ধ, আছে কূটনীতি, আছে এক রাজার অন্তর্দ্বন্দ্ব ও দূরদর্শিতা।

এই সিনেমায় রীতেশ শুধু পরিচালকই নন, তিনি অভিনয় করেছেন ছত্রপতি শিবাজি মহারাজার ভূমিকায়। ভারতীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের শাসনব্যবস্থা, সেনাব্যবস্থা এবং ব্যক্তি শিবাজি কেমন ছিলেন। তার জন্য দীর্ঘ গবেষণা করেছেন রীতেশ; যার প্রমাণ মেলে ছবির ট্রেলারে। যেখানে মুহূর্তের মধ্যে ধরা পড়েছে ইতিহাসের সেই পুরোনো দিনের গৌরবময় পটভূমি। 

এই ছবির আরেকটি বড় চমক হলো কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘সেরা সিনেমাটোগ্রাফার’-এর সম্মান পাওয়া সন্তোষ শিবনের উপস্থিতি। তাঁর ক্যামেরার চোখ সবসময়ই গল্পকে ভিজুয়াল সৌন্দর্যের অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। ‘রাজা শিবাজি’ও এর ব্যতিক্রম নয়। সন্তোষ শিবনের ক্যামেরার ভাষা ছবিটিকে এক অনন্য মাত্র দিয়েছে বলাই যায়। বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রের ধুলো থেকে শুরু করে রাজপ্রাসাদের অলংকরণ। প্রতিটি ফ্রেম যেন একেকটি চিত্রকল্প করে তুলে ধরেছেন তিনি। 

ছবিতে শিবাজির চরিত্রে রীতেশের অভিনয় তাঁর জন্য এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। রোমান্টিক বা কমেডি ঘরানার পরিচিত ইমেজ ভেঙে এই প্রথমবার তিনি হাজির হচ্ছেন এক ঐতিহাসিক, গভীর এবং দায়িত্বপূর্ণ চরিত্রে। মারাঠি ভাষা, দৈহিক ভঙ্গি, যুদ্ধকৌশল–সবকিছুই আয়ত্ত করতে বেশ প্রস্তুতি নিতে হয়েছিল তাঁকে। সিনেমায় বিপরীতে শিবাজির স্ত্রীর ভূমিকায় দেখা যাবে জেনেলিয়াকে। বাস্তব জীবনের এই দম্পতির অনস্ক্রিন কেমিস্ট্রি এবার নতুন মাত্রা পেতে চলেছে রাজকীয় ও আবেগঘন আবহে।

তবে শুধু এই দুই মুখ নয়। ছবিতে রয়েছেন এক ঝাঁক তারকা অভিনয়শিল্পী। তারা হলেন সঞ্জয় দত্ত, ফারদিন খান, অভিষেক বচ্চন, বিদ্যা বালান এবং ভাগ্যশ্রী। প্রত্যেকেই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে, যা ছবির পরিসরকে আরও বড় করে তুলেছে। যেমন সঞ্জয় দত্ত অভিনয় করছেন এক বিশ্বস্ত সেনাপতির চরিত্রে। বিদ্যা বালান এক প্রভাবশালী নারীর ভূমিকায়। ভাগ্যশ্রী রয়েছেন অন্য এক ঐতিহাসিক চরিত্রে। ফলে সিনেমায় তাঁদের প্রত্যেকের উপস্থিতি যেন ছবিতে যোগ করছে ভিন্নমাত্রা।

সম্প্রতি এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে মুক্তি পেয়েছে ‘রাজা শিবাজি’ সিনেমার ট্রেলার। সেখানে যেন তারকাদের মিলনমেলা। মঞ্চে উঠে অভিষেক বচ্চন মজার ছলে বলেন, ‘রীতেশ কিছু চাইবে আর আমি না বলব, এটা হতে পারে না।’ বন্ধুত্বের সেই উষ্ণতা যেন ছবির বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। 

অন্যদিকে সঞ্জয় দত্ত রীতেশের পরিচালনার প্রশংসা করে বলেন, কাজটা সহজ ছিল না। কারণ পরিচালক হিসেবে রীতেশ জানেন, তিনি কী চান। বকাবকি না করেও নিজের কাজ আদায় করে নিতে পারে।’ সঞ্জয়ের মতো বিদ্যা বালানের অভিজ্ঞতাও কম নয়। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো তাঁর জন্য ছবিতে কোনো জায়গা নেই। কিন্তু গল্প শোনার পর সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেননি। তাঁর ভাষায়, ‘আমি ঠিক করেই রেখেছিলাম, এই ছবিতে কাজ করব। এরপরই আমার কাছে রীতেশ প্রস্তাব নিয়ে আসে। মূলত গল্পের ঐতিহাসিক মূল্য আর অসাধারণ দৃশ্যায়নের সম্ভাবনাই আমাকে এই গল্পে অভিনয় করতে আগ্রহী করেছে।’ 

শুধু সিনেমার দৃশ্যধারণের সময়ই নয়। শুটিংয়ের বাইরেও আলোচনায় এসেছে রীতেশ-জেনেলিয়ার ব্যক্তিগত সম্পর্কের এক মিষ্টি মুহূর্ত। অভিনেত্রী ভাগ্যশ্রী বললেন, রাতের শুটিং শেষে ক্লান্ত রীতেশকে যখন নিজের হাতে খাইয়ে দিচ্ছিলেন জেনেলিয়া–বিশাল সেট, শত শত টেকনিশিয়ানের মাঝেও যেন ধরা পড়ে এক সাধারণ দাম্পত্যের উষ্ণতা। এই দৃশ্যই যেন বারবার মনে করিয়ে দেয়, সব বড় গল্পের পেছনে থাকে ছোট ছোট ভালোবাসার গল্প।

তবে ছবিটি ঘিরে বিতর্কও কম হয়নি। ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ উঠতেই সামাজিক মাধ্যমে সরব হন রীতেশ। তিনি বলেন, ‘শিবাজি মহারাজ শুধু ইতিহাসের চরিত্র নন, তিনি এক বিশ্বাস, এক ঐতিহ্যের প্রতীক। এই সিনেমায় আমরা একজন বীরের গল্প বলেছি। যিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে প্রেরণা দিয়েছেন।’ জিও স্টুডিওর প্রযোজনায় নির্মিত এই ছবির সংগীত পরিচালনায় রয়েছেন অজয়-অতুল। ইতিহাস, আবেগ এবং মহাকাব্যিক উপস্থাপনার এই মিশেলে তৈরি ‘রাজা শিবাজি’ আগামীকাল মারাঠি, হিন্দি ও তেলুগু ভাষায় বিশ্বব্যাপী মুক্তি পাবে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *