ভাষার মাস
‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো/ একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি’- সেই ছেলেবেলা থেকে গানটা কানে এলেই ভেতরটা কেমন মুচড়ে ওঠে। যতবার প্রভাত ফেরিতে গেছি, গাইতে গাইতে কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে এসেছে। কি এক শোকে চোখ ভিজে গেছে। শহীদ মিনারের বেদিতে উঠে নিজের অজান্তেই বলেছি- ক্ষমা করে দিও তোমরা আমাদের। তোমাদের তাজা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ ভাষার যথাযথ মূল্যায়ন আমরা করতে পারছি না।
চলে এসেছে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। কখনো মনে হয় সুখের, কখনো মনে হয় দুঃখের। সালাম, রফিক, জব্বারের মতো কতগুলো তাজা প্রাণের বিনিময়ে আজ আমরা বাংলায় কথা বলতে পারছি। কিন্তু ভাষার জন্য আত্মত্যাগ করা মানুষগুলোর আমরা কতটা সম্মান দিতে পেরেছি! শুধু ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা এর চর্চা নিয়ে নানা কথা বলি। বাংলা আজ আমাদের অতি আধুনিকতায় ‘বাংলিশ’ হয়ে গেছে। বাংলা ভাষাকে ইংরেজির মতো চিবিয়ে উচ্চারণ করে তার আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। বিশেষ করে বর্তমানে তরুণ-তরুণীদের মাঝে এমন চর্চা বেশি পরিলক্ষিত হয়। তারা আমাদের দীর্ঘতম কণ্টকাকীর্ণ যাত্রায় অর্জিত এ ভাষা আর দেশের কথা জানলেও, তাকে আত্মোপলব্ধি করতে পারেনি। তাই বাংলিশ এ ভাষা তাদেরকে আধুনিক সমাজের উপযুক্ত করে দেয়। ইংরেজি একটি বিদেশি ভাষা।
এটি আয়ত্ত করলে আমরা ভিনদেশীদের সঙ্গে কথা বলতে পারি, ভিন্ন দেশ সম্পর্কে জানতে পারি, কর্মক্ষেত্রেও কাজে লাগে। কিন্তু এই বিদেশি ভাষা নিয়ে অনেকেই এমনভাবে গর্ব করে যে, তাদের কথায় বাংলা ভাষার প্রতি অবহেলা প্রকাশ পায়। ইংরেজি মাধ্যমে পড়ালেখা করা অনেক ছেলেমেয়ে ভালো বাংলা বলতে ও লিখতে পারে না। আর কিছু অভিভাবক আছেন এ বিষয়টি খুব গর্বের সঙ্গে বলেন- ওরা তো বাংলায় কথা বলতেই চায় না, ওদের ভালো লাগে না। এটা যে কতটা লজ্জার, সেটা তারা উপলব্ধি করতে পারে না। কথা-বার্তায়, চলনে-বলনে সবদিক থেকে আমরা বাংলিশ হয়ে উঠছি। বাংলা নববর্ষ উদযাপন করতেও পাশ্চাত্যের পোশাক পড়তে কুণ্ঠাবোধ করি না। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য জীবন দিয়েছিল অকুতোভয় সন্তানেরা। সেই ভাষার দূষণে আমরা জর্জরিত। গণমাধ্যমগুলোতে এই ভাষার দূষণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। ভাষার মাস এলেই- বাংলিশ ভাষায় কথা বলা যাবে না, শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে হবে, বাংলা সংস্কৃতিকে ধারণ করতে হবে- এইটুকু বলা ছাড়া আর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না। ভাষার বিকৃতি ও দূষণ ঘটেই চলেছে নানাভাবে। বিবেক আমাদের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। মাতৃভাষা বাংলা চর্চা সর্বত্র দূষণ মুক্ত হোক, এটিই আমাদের প্রত্যাশা।