নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারে আলোর মুখ দেখিয়েছে কাপ্তাইয়ের সোলার প্রজেক্ট

জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকেছে বিশ্ব। বাংলাদেশ সরকারও বিগত এক দশক ধরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে গুরুত্বারোপ করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে স্থাপিত হয় দেশের প্রথম অন–গ্রিড সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র। বিগত অর্ধযুগের বেশি সময়ে ৬ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দেশের বিদ্যুৎখাতে ভূমিকা রাখছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের মধ্যে দেশে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের অন্তত ৫ শতাংশ সৌরশক্তি থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে তৎকালীন সরকার। এছাড়া ২০২০ সালের মধ্যে অন্তত ১০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও শেষ পর্যন্ত কোনোটিই পূরণ হয়নি। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থানে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু করে সরকার। ২০১৭ সালের ৯ জুলাই রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়। পরে আবার ২০২৫ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

২০১৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সরকারিভাবে দেশের প্রথম সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র হিসেবে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্পিলওয়ে সংলগ্ন এলাকায় কাপ্তাই বাঁধের দক্ষিণ পাশেই ৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা কেন্দ্রটি চালু করা হয়। এটিই দেশের প্রথম অন–গ্রিড সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র; যেখান থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়। ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ের কাপ্তাইয়ের ৭.৪ মেগাওয়াট সোলার বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটিতে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাড়ে ১৯ একর পরিত্যক্ত জমি ব্যবহার হয়েছে। প্রকল্পের ডিপিপি–তে (উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তাব) প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৮ পয়সা।

কাপ্তাই ৭ মেগাওয়াট সোলার বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে ১১ সেপ্টেম্বর উৎপাদনে যাওয়ার পর থেকে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে মোট ৬ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়েছে এবং জাতীয় গ্রিডে যোগ হওয়া বিদ্যুতের বাণিজ্যিক মূল্য ৭২ কোটি টাকা। দৈনিক গড় উৎপাদন সক্ষমতা ২৭ হাজার ইউনিট।

কাপ্তাই ৭ মেগাওয়াট সোলার বিদ্যুৎকেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বর্তমানে কাপ্তাই সোলার বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৭.৪ মেগাওয়াটের সোলার প্ল্যান্ট উৎপাদন হচ্ছে এবং এর সঙ্গে অতি সমপ্রতি আরো এক মেগাওয়াট যোগ হচ্ছে। আলাদাভাবে ৩৩২ কিলোওয়াটের রুফটপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ খুব শীঘ্রই শুরু হবে। এছাড়াও ৭.৬ মেগাওয়াটের আরেকটি আলাদা সোলার প্ল্যান্ট স্থাপন করা হবে।

কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) মো. মাহমুদ হাসান বলেন, পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। তবে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়া–কমা আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে। আমাদের সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলমান রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ বাড়ানোর দাবি করছেন উন্নয়ন কর্মী ও গবেষকরা। এ প্রসঙ্গে প্রতিবেশ–প্রকৃতিবিষয়ক গবেষক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরেই জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে রাষ্ট্রকে আরও উদ্যোগ বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছি। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যাপকহারে গ্রিনহাউজ গ্যাস তৈরি করছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়াচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার পরিবেশবান্ধব ও বার বার ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। সেজন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের আরও উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *