যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতার কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুদ্ধ বন্ধ এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার কাঠামো নির্ধারণে একটি এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারক নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস দুই মার্কিন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে, যা পরবর্তীতে রয়টার্সও উল্লেখ করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সমঝোতা স্মারকের বিষয়ে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরানের প্রতিক্রিয়া পাওয়ার আশা করছে ওয়াশিংটন। যদিও এখনো চূড়ান্ত ঐকমত্য হয়নি, তবে যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথমবারের মতো দুই দেশ এতটা কাছাকাছি এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে। অ্যাক্সিওসের তথ্যমতে, প্রস্তাবিত সমঝোতায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান হলো–ইরান তার পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহার করবে এবং জব্দ করে রাখা বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড় দেবে। এছাড়া হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, এবং আন্তর্জাতিক জলপথে স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়টিও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

এই সমঝোতা স্মারকটি ১৪ দফা নিয়ে গঠিত বলে জানা গেছে। এতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও জারেড কুশনারের সঙ্গে ইরানি কর্মকর্তাদের আলোচনা চলছে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসরের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যদি উভয় পক্ষ এই স্মারকে সম্মত হয়, তাহলে ৩০ দিনের একটি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির দিকে এগোনো হবে। এই সময়ের মধ্যে ধাপে ধাপে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, অবরোধ প্রত্যাহার এবং পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে এক মার্কিন কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় নৌ অবরোধ বা সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করে বলেছেন, চুক্তি হলে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে এবং হরমুজ প্রণালিতে আরোপিত অবরোধ তুলে নেওয়া হবে। তিনি তার নিজস্ব সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, যা নিয়ে সমঝোতা হয়েছে, ইরান তা মেনে নিলে অপারেশন এপিক ফিউরি শেষ হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, চুক্তি হলে হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়া হবে। তবে একই সঙ্গে ট্রাম্প কঠোর হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। তার ভাষায়, ইরান যদি শর্ত মেনে না নেয়, তাহলে বোমা হামলা আরও তীব্রভাবে শুরু হবে এবং আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী আঘাত হানা হবে।

অন্যদিকে ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা শুধুমাত্র একটি ‘ন্যায্য ও পূর্ণাঙ্গ’ চুক্তিই গ্রহণ করবে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি চীন সফরকালে বলেন, আলোচনায় ইরান তার বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। তিনি বলেন, আমরা এমন কোনো চুক্তি গ্রহণ করবো না যা আমাদের স্বার্থের পরিপন্থী।

ইরান আরও জানিয়েছে, তারা স্থায়ী ও ন্যায়সংগত সমাধান ছাড়া অন্য কোনো আপস করবে না। একই সঙ্গে তারা চীনের সমর্থন ও সহযোগিতার প্রশংসা করেছে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।

চলমান আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হলো অর্থ ছাড় বা ক্ষতিপূরণ। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সমঝোতার অংশ হিসেবে ইরান তার উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কমাতে বা ত্যাগ করতে পারে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত অর্থ ছাড় দিতে পারে। শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র খাদ্য ও ওষুধ কেনার জন্য ৬০০ কোটি ডলার ছাড় দিতে রাজি ছিল। কিন্তু ইরান দাবি করে ২ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। দীর্ঘ আলোচনার পর বর্তমানে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলারে সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এই অর্থ কীভাবে এবং কোন খাতে ব্যয় করা হবে, সেটিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যুক্তরাষ্ট্র চায় এই অর্থ শুধুমাত্র মানবিক খাতে ব্যবহৃত হোক। অন্যদিকে ইরান চায় অর্থনৈতিক কার্যক্রমে পূর্ণ স্বাধীনতা। একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই অর্থ ছাড়ের বিনিময়েও ইরান তার সব ধরনের কার্যক্রম–বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার–সম্পূর্ণ বন্ধ করতে রাজি নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ন্ত্রণ করা। বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ২০০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যার মধ্যে ৪৫০ কেজি ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ। ওয়াশিংটন চায় এই মজুত সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে। তারা প্রস্তাব দিয়েছে, ইরান তার সব পারমাণবিক উপাদান যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দিক। তবে তেহরান এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। একটি আপস প্রস্তাব হিসেবে এখন আলোচনা হচ্ছে–উচ্চমাত্রার কিছু ইউরেনিয়াম তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানো হবে এবং বাকি অংশ আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে ইরানের ভেতরেই কম সমৃদ্ধ করা হবে। এছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত রাখার সময়সীমা নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের প্রস্তাব দিলেও ইরান ৫ বছর চেয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। প্রায় ৪০ দিন ধরে চলা সংঘাতের পর ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। তবে যুদ্ধবিরতির মধ্যেও উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করে এবং ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে সামরিক অভিযান শুরু করে, যা পরে স্থগিত করা হয়। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, হুমকি বন্ধ হলে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হতে পারে।

সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির ইঙ্গিত পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড ও ওয়েস্ট টেঙাস ইন্টারমিডিয়েট–উভয় ধরনের তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি চুক্তি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং বৈশ্বিক বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসর এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। শিগগিরই ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানা গেছে। এছাড়া তুরস্কে একটি কূটনৈতিক সম্মেলনের ফাঁকে সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অংশগ্রহণে আরও বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *