শত উপায়ে জ্বালাই তোমায়!

মানুষের সুখ লাভের তরিকা অন্য সব প্রাণীদের সাথে ঠিক কতটা মিল জানা নেই, তবে মানুষের ভিন্ন তরিকার শেষ নেই। কেউ অন্যকে সুখে দেখতে ভালোবাসে আবার কেউ অন্যকে জ্বালাতন করে। ধরুন, যে ফুল দেখতে খুব সুন্দর তাকে ছিঁড়ে ফেললো। যে শিশুকে খুব আদর লাগছে তাকে দেখেই নাকি আদরে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছা করে। কেউ সুখ পায় কুকুরের গায়ে গরম পানি ঠেলে, কেউ সুখ খুঁজে পাগলকে উত্ত্যক্ত করে। তবে নারী বনাম পুরুষের সুখের তরিকা এই উপমহাদেশে বিচিত্র।

নারীদের উত্ত্যক্ত করে যেসকল পুরুষেরা সুখ খোঁজন তাদের কি বলব? তারা কি এসব নিছক সুখের আশায় করেন? এই সুখ লাভ কি স্বাভাবিক? সারা পৃথিবী জুড়ে নারীদের প্রতি নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন তুলনামূলক বেড়েছে। এই দশায় তুচ্ছ বলে কি আর কোনো ঘটনা রইলো? নারীদের উত্ত্যক্ত বা হয়রানি করা পুরুষদের সরাসরি মানসিক রোগী না বললেও গভীর মানসিক বিকারগ্রস্ত তো বলতে হয়। কোনো সুস্থ–স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে নিশ্চয় এসব কাজ করা স্বাভাবিক নয়?

কল্পনা করুন তো–আপনি খুব পরিপাটি করে চুল বেঁধে বা ছেড়ে দিয়ে বাসা থেকে বেরোলেন। বাসে বা লেগুনায় উঠলেন, গন্তব্যে পৌঁছানোর পর অবিন্যস্ত চুলে হাত দিতেই আপনার শরীর হিম হয়ে গেল। আপনার সেই প্রিয় লম্বা বেণীটি নেই! কেউ একজন আপনার অগোচরে, আপনার অজান্তেই আপনার শরীরের একটি অংশ কেটে নিয়ে গেছে। কোনো ছিনতাই নয়, কোনো গয়না চুরি নয়, স্রেফ আপনার চুলটা কেটে নিয়ে যাওয়া।

সমপ্রতি চট্টগ্রামে এই শিউরে ওঠার মতো ঘটনাটি ঘটেছে। এক বিকৃত মস্তিস্কের ব্যক্তিকে হাতেনাতে ধরা হয়েছে, যার ব্যাগে পাওয়া গেছে আরও তিনটি বিচ্ছিন্ন বেণী। অর্থাৎ, আপনার–আমার চোখের সামনেই কেউ পকেটে কাঁচি নিয়ে ঘুরছে কেবল নারীদের ক্ষতি করার নেশায়। আমরা মেয়েরা যখন ঘর থেকে বের হই, আমাদের সচেতনতার অভাব থাকে না। ব্যাগটা বুকের ওপর জাপ্টে ধরি, ওড়না সামলাই, চারদিকের লোলুপ দৃষ্টি এড়িয়ে চলার আপ্রাণ চেষ্টা করি। কিন্তু কেউ যে পেছন থেকে এসে হুট করে চুল কেটে নিতে পারে, এই অদ্ভুত আর বীভৎস চিন্তা কি কারোর মাথায় আসা সম্ভব?

এই বিকৃতি অবশ্য নতুন কিছু নয়। কয়েক বছর আগের সেই ‘ব্লেড আতঙ্ক’ কি আমরা ভুলে গেছি? ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ কোনো মেয়ে টের পেত তার শরীর জ্বলছে, পরক্ষণেই দেখত গলগল করে রক্ত ঝরছে। কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই স্রেফ একটা মেয়েকে রক্তাক্ত করার পৈশাচিক আনন্দই ছিল সেই অপরাধীদের লক্ষ্য। এর সাথে যোগ হয়েছিল ‘সিরিঞ্জ আতঙ্ক’– যেখানে সিরিঞ্জে বীর্য ভরে মেয়েদের গায়ে ছিটিয়ে দেওয়া হতো। চিন্তা করুন, একটা মানুষের মানসিকতা কতটা নিচ হলে এমন জঘন্য কাজ করতে পারে!

একজন নারীর পক্ষে কি ২৪ ঘণ্টা চারদিকে চোখ রাখা সম্ভব? সামনে থেকে আসা ধাক্কা হয়তো আমরা সামলাতে পারি, কিন্তু পেছন থেকে আসা এই ‘অদৃশ্য’ হামলাগুলো ঠেকানোর শক্তি আমাদের নেই। আমরা ক্লান্ত, আমরা প্রতিনিয়ত শঙ্কিত। ড্রেস কাটা, ব্লেড মারা কিংবা চুল কেটে নেওয়ার এই ভয়ংকর ট্রেন্ডগুলো আমাদের ঘর থেকে বের হওয়াকে এক প্রকার অসম্ভব করে তুলছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা একে ‘স্যাডিজম’ বা পরপীড়নকামী মানসিকতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। যখন কোনো পুরুষ তার পৌরষের দম্ভ বা অবদমিত ক্ষোভ মেটানোর স্বাভাবিক পথ পায় না, তখন সে নারীর ওপর এই ধরনের প্রতীকী আক্রমণ চালায়। চুল কাটা বা কাপড় কেটে ফেলা কেবল বস্তুগত ক্ষতি নয়, এটি নারীর ব্যক্তিত্ব এবং তার শারীরিক স্বকীয়তার ওপর এক চরম আঘাত। এটি তাকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার একটি কৌশল। একজন অপরাধী যখন জনসমক্ষে একটি মেয়ের বেণী কেটে নিয়ে বুক পকেটে ভরে রাখে, তখন সে আসলে একটি ট্রফি জয়ের উল্লাস পায়। এই উল্লাস একজন সুস্থ মানুষের হতে পারে না; এটি গভীর মানসিক বিকারগ্রস্ততার লক্ষণ।

চট্টগ্রামের সেই ঘটনাটি যখন গণমাধ্যমে আসে, তখন অনেকে হেসেই উড়িয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ হয়তো মন্তব্য করেছেন, ‘চুলই তো কেটেছে, প্রাণ তো নেয়নি!’ এই যে ‘প্রাণের’ সাথে ‘সম্মান’ বা ‘মানসিক আঘাতের’ তুলনা করা–এটাই আমাদের সমাজের আসল অসুখ। দন্ডবিধির ৩৫৪ ধারা অনুযায়ী কোনো নারীর শ্লীলতাহানির শাস্তির বিধান থাকলেও, এই ‘চুল কাটা’ বা ‘পোশাক কাটা’র মতো সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর অপরাধগুলোকে আইনি কাঠামোতে শক্তভাবে ধরা হয় না। অপরাধীরা জানে, ভিড়ের মধ্যে একটা কাঁচি বা ব্লেড চালানো যতটা সহজ, তাকে শনাক্ত করা বা প্রমাণ করা ততটাই কঠিন। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই তাদের আরও সাহসী করে তোলে।

এই শহর, এই রাজপথ–সবই নাগরিক সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু যখন নিরাপত্তা কেবল এক বিলাসিতায় পরিণত হয়, তখন সভ্যতার খোলসটি খসে পড়ে। এই বিকৃতি কেবল একক কোনো ব্যক্তির মস্তিষ্কপ্রসূত নয়, বরং এটি সেই বিষাক্ত সামাজিক কাঠামোর প্রতিফলন, যা নারীকে মানুষ হিসেবে দেখার আগে কেবল একটি ‘ভোগ্য বস্তু’ বা ‘আঘাতের লক্ষ্য’ হিসেবে চেনে।

এই বিভীষিকা থেকে মুক্তি কেবল সচেতনতায় নয়, বরং মানসিকতার আমূল পরিবর্তনে নিহিত। যে হাত আজ কাঁচি চালায়, সেই হাতকে থামানোর জন্য প্রয়োজন এক সম্মিলিত প্রতিরোধের দেয়াল। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে আতঙ্কিত হওয়ার দিনগুলো ফুরিয়ে আসুক। একটি দীর্ঘ বেণী বা অবিন্যস্ত চুল যেন আর কারো ট্রফি না হয়, বরং তা হোক নারীর আপন সত্তার এক স্বাধীন প্রকাশ। অন্ধকারের এই চাদর ছিঁড়ে আলোকোজ্জ্বল এক রাজপথের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে প্রতিটি নারী, যেখানে পেছন ফিরে তাকানোর ভয় থাকবে না, থাকবে কেবল গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চিন্ত আনন্দ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *