চট্টগ্রামে নজরুল আগমনের শতবর্ষ

আজ থেকে ঠিক একশ বছর আগে চট্টগ্রামে প্রথম এসেছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯২৬ সালের জুলাই মাসে কবি প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামে এসেছিলেন চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্র সংসদের সে–সময়কার নেতা কবির বন্ধু হাবিবুল্লাহ বাহারের আমন্ত্রণে। কলেজের এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কবি সভাপতিত্ব করেছিলেন। তিনি সে–সময় ৪৭ দিন অবস্থান করেন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। আন্দরকিল্লাহ শাহী জামে মসজিদ, সীতাকুণ্ডের জেএম সেন স্কুলে তিনি অতিথি হয়েছিলেন। আন্দরকিল্লাহ শাহী জামে মসজিদের সংবর্ধনা সভায় কবিকে ‘সম্রাট’ উপাধি দেয়া হয়েছিল। কবি সরাসরি কোলকাতা থেকে চট্টগ্রামে এসে জেলা প্রশাসকের ডাক বাংলোতে উঠেছিলেন। পরে সাহিত্য প্রেমিক জুটি ভাই বোন বাহার–নাহার (হাবিবউল্লাহ বাহার ও বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ) কবিকে উনাদের বাসায় নিয়ে যান। প্রথমবারের মতো কবি চট্টগ্রামে এসে চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং চট্টগ্রামের মানুষের আন্তরিকতা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। বিশেষ করে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী আর সীতকুণ্ডের পাহাড় মালা কবির কাব্যমনকে আলোড়িত করে। তিনি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘সাম্পান’– এ চড়ে নদীভ্রমণ করেছিলেন। এই নদীর মোহনায় সাগর আর নদীর মিলন স্থল দেখে কবি অসম্ভব প্রীত হন। ‘সিন্ধুহিন্দোল’ কাব্যগ্রন্থের অনেক কবিতায় কবির নদী ও সাগর সঙ্গমের অভিজ্ঞতা পেয়েছে যথাযথ কাব্যমর্যাদা। প্রথমবার চট্টগ্রাম ভ্রমণের অভিজ্ঞতা কবি বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদকে লিখিত এক পত্রে এভাবেই বর্ণনা করেছিলেন– “ফুল যদি কোথাও ফুটে, আলো কোথাও হাসে, সেখানেই আমার গান গাওয়া শোভা পায়, গান গাই। সেই আলো, সেই ফুল পেয়েছিলাম একবার চট্টলায়। তাই গেয়েছি গান। কবিকে খুশি করতে হয়, দিতে হয় অমূল্য মনের সওগাত।” ১৯২৯ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে কবি নজরুল দ্বিতীয়বারের মতো চট্টগ্রামে আসেন। চট্টগ্রাম এডুকেশন সোসাইটির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তিনি আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন। তিনি সভাপতির বক্তব্য রেখেছিলেন। তাঁর বক্তব্যে সমকালীন মুসলমান সমাজের শিক্ষা দীক্ষা, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অনগ্রসরতার কথা বিশেষ প্রাধান্য পায়। এসময়ও কবি বেশ কয়েকটি সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অতিথি হয়েছিলেন। বুলবুল সমিতির অনুষ্ঠানে কবিকে ‘বাংলার শেলী’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। কবিকে তখন ফতেয়াবাদেও (সাহিত্য পরিবার) আলম পরিবারে আমন্ত্রণ জানান নজরুল সখা কবি দিদারুল আলম। এই পরিবারে আতিথ্য গ্রহণ করে কবি অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। কবিকে পরিবারের পক্ষ থেকে একটি মানপত্র দেয়া হয়, যেটি কবি বন্ধু দিদারুল আলম নিজেই লিখেছিলেন। সেই পত্রের কিছু অংশ এখানে তুলে ধরতে পারলে ভালো হতো। কবির আগমনে কেবল এই বাড়ি নয়, পুরো এলাকা মেতে উঠে উৎসব–এর আমেজে। দূর–দুরান্ত থেকে আবাল বৃদ্ধ বনিতা কবিকে এক নজর দেখার জন্য ছুটে আসেন এই বাড়িতে। বাড়ির কর্ত্রী মুরুব্বি দিদারুল আলমের মা আজিমুন্নেছা তার পালা শখের মোরগ কবির জন্য জবাই করে রান্না করেন। কবি এই বাড়ির সারি–সারি সুপারি বাগান দেখে আপ্লুত হন। সারারাত হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান আর পান খেয়ে তিনি এলাকায় সাড়া জাগান। কবির কণ্ঠে দরাজ গলায় গান আর কবিতা শুনে এলাকার যুবকরা দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হন। কবি এই বাড়িতেই বসে লিখেছিলেন ‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’ কবিতাটি। নজরুলের পদচিহ্ন খ্যাত এই বাড়িতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সন তারিখ দিয়ে একটি নামফলক নির্মিত করা হয়। যা ইতিহাসের অংশ হয়ে সাক্ষ্য দেবে যুগে যুগে। এই ঐতিহাসিক স্মৃতি রক্ষার্থে এই পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে নানা কর্মসূচি পালন করা হয়। কবির জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকীতে এই স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক প্রদান ছাড়াও ২০০৫ সালে একবার বেশ বড় আকারের নজরুল উৎসব ও মিলনমেলার আয়োজন করা হয়েছিল। নগরীর বিশিষ্ট নজরুল গবেষকরা উৎসবে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা ছাড়াও কবিতা আবৃত্তি ও গান পরিবেশন করে আলম পরিবারের সদস্যরা।

১৯৪৯ সালের ৫ জুন চট্টগ্রাম তমদ্দুন মজলিসের কর্মীরা নজরুল জয়ন্তী পালন করে জুবিলী সিনেমা হলে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছিলেন কথা শিল্পী শওকত ওসমান। অনুষ্ঠানে সুচরিত চৌধুরী প্রযোজিত ঐকতান বাদন অত্যন্ত শ্রুতিমধুর ও উপভোগ্য হয়। আনোয়ারা, মনোয়ারা ও শিখার ঝুমুর নৃত্য সেদিন দর্শক শ্রোতাদের আলোড়িত করে। এই অনুষ্ঠান নিয়ে স্থানীয় দৈনিক পয়গাম এর মন্তব্য ছিল: “এই ধরনের অনুষ্ঠান চট্টগ্রামে প্রথম এবং মুসলমান মেয়েরা নাচে গানে এই রকম কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছে, যা শুধু চট্টগ্রামে নয়, সারাদেশের কোথাও আছে কিনা সন্দেহ। ১৯৩৩ সালে কবি তৃতীয়বারের মতো চট্টগ্রামে আসেন। এই সফরে কবি রাউজানে দুদিনব্যাপী তরুণ ও শিক্ষা সম্মিলনীতে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন। এই সফরে কবিকে রাউজান–এর হাজি বাড়ির সন্নিকটে বিলের মাঝে সামিয়ানা টাঙ্গিয়ে রাখার ব্যবস্থা হয়েছিল। আয়োজকরা বেশ কয়েকদিন ধরেই পরিশ্রম করে উক্ত আয়োজন করেছিলেন। পরে মানুষের ভিড় এড়াতে কবি দর্শনে টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ২০০৫ সালে জেলা প্রশাসন–এর উদ্যোগে হাজিবাড়িতেও কবির স্মৃতি রক্ষার্থে একটি স্মৃতিফলক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সেসময় হাজী বাড়ির প্রাণপুরুষ, শিক্ষানুরাগী, এই অঞ্চলের আধুনিক জাতীয় পত্রিকা দৈনিক পূর্বকোণের প্রতিষ্ঠাতা ইউসুফ চৌধুরী হাজিবাড়িতে নজরুল উৎসবের আয়োজন করেছিলেন। জমকালো ও বর্ণাঢ্য এই উৎসবে কবির পৌত্রী খিলখিল কাজী এবং দেশের জনপ্রিয় নজরুল গীতি শিল্পী ফাতেমা তুজ জোহরা গান পরিবেশন করেছিলেন। কবি চতুর্থবারের মতো চট্টগ্রামে আসেন ১৯৭৩ সালে। কবির বয়স তখন ৭৫। তিনি অসুস্থ, বাকশক্তি রহিত। ফলে একদিন পরেই কবিকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। চট্টগ্রামকে নিয়ে কবির সৃষ্টি অনেক। তিনি এমনই সৃজনশীল এক ক্ষ্যাপা বাউল ছিলেন, যখনই যেখানেই গিয়েছিলেন, সেখানেই বসে গান কবিতাসহ সাহিত্যের নানাসৃষ্টির মাধ্যমে এই অঙ্গনকে সমৃদ্ব করেছেন। চট্টগ্রামকেও নিয়ে অনেক গান, কবিতা রয়েছে কবির। চক্রবাক, শীতের সিন্ধু, শিশু যাদুকর, সাতভাই চম্পার অধিকাংশ কবিতা, মধুমালা, আমার সাম্পান যাত্রী লয়, ওরে মাঝি ভাই, কি দুঃখ পেয়ে কুল হারালি অকূল দরিয়ায় সহ অনেক গান আর কবিতা। চট্টগ্রামের ডিসি হিলের নজরুল স্কয়ার কবির স্মৃতিকে ধরে রেখেছে। এখানে ২০০৫ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এটি নির্মিত হয়। একই সাথে স্থাপিত হয় নজরুল মঞ্চ। কবির স্মৃতিকে ধরে রাখতে ছবি আর কবিতা সম্বলিত এই স্কয়ার আর মঞ্চ এখানে কবিকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে বলে মনে করছি। যেহেতু প্রথমবার যখন কবি ১৯২৬ সালে চট্টগ্রামে আসেন, তখন তিনি এই বাংলোতেই উঠেছিলেন। তবে কেবল স্মৃতিফলক, স্কয়ার আর মঞ্চ নির্মাণ করলেই হবেনা। জাতীয় কবিকে সম্মান দেখাতে হবে তাঁর সৃষ্টিকর্মের চর্চার মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে এই বড়মাপের কবি ও তাঁর সৃষ্টি কর্মকে ছড়িয়ে দিতে হবে। এই গুরুদায়িত্ব সুশীল সমাজের বলে মনে করি।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *