বসন্ত মানেই প্রকৃতির বর্ণিল সাজ। প্রকৃতির সেই রঙের ছোঁয়া অবধারিতভাবেই এসে লাগে মানুষের মনে। ফাল্গুনের দোলপূর্ণিমায় নানা রঙের ছটায় হঠাৎ করেই যেন রঙিন হয়ে ওঠে চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠীর প্রাত্যহিক বিবর্ণ জীবন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সেই কালজয়ী গানের সুর, ‘পরানে লেগেছে ফাগুয়া…’ যেন এই সময়ে জীবন্ত হয়ে বাজে চা-বাগানের প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায়। দৈনন্দিন অভাব-অভিযোগ আর হাড়ভাঙা খাটুনির ক্লান্তি ভুলে প্রায় প্রতিটি বাগানেই হয় রঙের উৎসব–ফাগুয়া।
ফাগুয়া পর্বের এই প্রাণবন্ত আয়োজনে শামিল হতে সকাল বেলাতেই হাজির হয়েছিলাম শ্রীমঙ্গলের রাজঘাট বাগানে। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে এই বাগান। সঙ্গী হিসেবে ছিলেন সহকর্মী ঝুটন দেব। বাগানের পাড়ায় পাড়ায় ঢুকতেই চোখে পড়ল উৎসবের আসল চিত্র। যাদের সঙ্গেই দেখা হচ্ছে, প্রায় সবার শরীরেই নানা রঙের আবিরের প্রলেপ। কে কাকে কীভাবে রাঙিয়ে দেবে, চলছে তারই মিষ্টি প্রতিযোগিতা। কেউ কেউ আবার প্লাস্টিকের বোতলে যত্ন করে গুলছেন রঙিন জল। আট থেকে আশি বয়সের সব ভেদাভেদ ভুলে, ধনী-গরিবের ব্যবধান ঘুচিয়ে সবাই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে রঙের এই মহোৎসবে।
বাগানের ভেতরের একটি সরু গলি ধরে এগোতেই কানে ভেসে এলো মাদলের গুরুগম্ভীর ধ্বনি আর গানের মাতাল করা সুর। সেই সুর আর বাদ্যের সূত্র ধরে কয়েক কদম এগোতেই দেখা মিলল আট-দশজনের একটি গানের দলের। তাদের পরিবেশনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা। দলেরই দুজন সেজেছেন রাধা ও কৃষ্ণ। সঙ্গে আছেন ললিতা-বিশাখার রূপ ধারণ করা সখিরাও। বাদ্যের তালে তালে চলছে ঐতিহ্যবাহী ‘কাঠিনৃত্য’।
দলের নেতা হঠাৎ ‘জোড় ধর, জোড় ধর’ বলে গানে সুর তুললেন। তাঁর নির্দেশ পাওয়া মাত্রই জোড়ায় জোড়ায় বিভক্ত হয়ে হাতের কাঠি দিয়ে তাল বাজাতে শুরু করলেন নৃত্যশিল্পীরা। প্রত্যেকের হাতে ১৫-২০ ইঞ্চি লম্বা আবির-রাঙানো একটি করে কাঠি। একে অপরের কাঠিতে আঘাত করে অপূর্ব ছন্দে নেচে চলেছেন তারা। গানের তালের সঙ্গে কাঠির ঠকঠক শব্দে এগিয়ে চলছে এই নৃত্যগীত। মাদল, করতাল, বাঁশি আর কাঠির সম্মিলিত ধ্বনিতে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে চা-জনগোষ্ঠীর আদি আঙিনা।
এই গানগুলোর মূল উপজীব্য শ্রীকৃষ্ণ ও রাধা। ঝুমুর গানের তালেই মূলত পরিবেশিত হয় এগুলো। ছোট ছোট ছন্দে রচিত এই গানগুলো ধীর লয়ে শুরু হয়ে ক্রমশ দ্রুত লয়ে শেষ হয়। প্রেম, বিরহ আর মিলনের চিরন্তন কাহিনির পাশাপাশি এসব গানে খুব সাবলীলভাবেই উঠে আসে শ্রমিক জীবনের রূঢ় বাস্তবতা।
এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি, ঝুমুর ঝুমুর শব্দে মেতে ওঠে পুরো পাড়া। উৎসবের এই সুর কোথাও বাজে তিন দিন, কোথাও পাঁচ দিন, আবার কোথাও তারও বেশি সময় ধরে। অর্থাৎ, অন্তত দিন পনেরো ধরে ফাগুয়ার এই উৎসবমুখর আমেজ লেগে থাকে চা-বাগানগুলোতে।
উৎসবের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে কাঠিনৃত্যের যে বিপুল জনপ্রিয়তা রয়েছে, তা বাগানে পা রাখলেই বোঝা যায়। প্রায় প্রতিটি দলই এই নৃত্য পরিবেশন করে। কাঠিনাচের এই সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রাচীন। গবেষকদের মতে, প্রাচীন রাজা বা জমিদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর শারীরিক কসরত থেকেই এই কাঠিনাচের সূত্রপাত। পরবর্তীকালে নানা সম্প্রদায়ের মানুষ এটিকে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে এবং নিজেদের সংস্কৃতির নিজস্ব রূপ দান করে। ব্রতচারী আন্দোলনের স্রষ্টা গুরুসদয় দত্তও এই কাঠিনাচকে গভীরভাবে গ্রহণ করেছিলেন। দলবদ্ধভাবে পরিবেশিত এই নাচটি মূলত বীররসাত্মক এবং যথেষ্ট শারীরিক কসরতপূর্ণ।