অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রায় নিয়েছিলেন নরওয়েজিয়ান অভিনেত্রী রেনাটা রেইনসভে। সে সময় তাঁর মনে হয়েছিল, শিল্পের এই অনিশ্চিত পেশা ছেড়ে হয়তো একেবারে ভিন্ন জীবনে পা রাখা উচিত। তাই তিনি চিন্তা করলেন ইতালিতে গিয়ে কাঠমিস্ত্রির কাজ শিখবেন, হাতের কাজে ভবিষ্যৎ গড়বেন। ঠিক তখনই আসে একটি ফোনকল। ওপাশে ছিলেন নরওয়ের নির্মাতা ইওয়াকিম ট্রিয়ার।
তিনি জানালেন, নতুন একটি সিনেমার চিত্রনাট্য লিখছেন। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রের নাম জুলি। এক অস্থির, অনুসন্ধিৎসু, জীবনের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণী। আর চরিত্রটি তিনি কল্পনা করেছেন রেইনসভেকে সামনে রেখে। সিনেমার নাম ‘দ্য ওয়ার্স্ট পারসন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’। এই এক ফোনকলই যেন বদলে দেয় রেইনসভের জীবনরেখা। জুলি হয়ে তিনি শুধু অভিনয় করেননি; এক প্রজন্মের দোটানা, প্রেম, পেশা, আত্মপরিচয় আর স্বাধীনতার প্রশ্নকে অসাধারণ করে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর অভিনয়ে ছিল স্বতঃস্ফূর্ততা, যা চরিত্রটিকে করে তোলে জীবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য।
‘দ্য ওয়ার্স্ট পারসন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ এর জুলি চরিত্রটি যেন রেনাটার ব্যক্তিগত জীবনেও এক গভীর পরিবর্তনের সূচনা করে। এর আগে তিনি নিজেকে ভাবতেন সংযত, লাজুক, ভেতরে ভেতরে আবেগ জমিয়ে রাখা মানুষ। যে নিজের দুর্বলতা বা অস্বস্তিকর অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে দ্বিধাবোধ করে। কিন্তু জুলি হয়ে তিনি সেই চেপে রাখা আবেগের মুখোমুখি দাঁড়ান। চরিত্রটির দ্বিধা, অনিশ্চয়তা, প্রেম ও অপরাধবোধ। সব খোলামেলাভাবে প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করেন নিজের ভেতরের অচেনা স্তরগুলো। রেইনসভের ভাষায়, ‘হঠাৎ বুঝলাম, যেসব অনুভূতিকে আমি নিজের মধ্যে কুৎসিত ভাবতাম, সেগুলো নিয়ে আমি একা নই।’ ২০২১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য ওয়ার্স্ট পারসন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ আন্তর্জাতিক বিনোদন অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়, আর সেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেন রেনাটা। ছবিটি বছরসেরা চলচ্চিত্রের একাধিক তালিকায় স্থান পায়; সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ানোর পাশাপাশি দর্শকমনেও তৈরি করে গভীর সাড়া। এমনকি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও তাঁর পছন্দের চলচ্চিত্রের তালিকায় ছবিটির নাম উল্লেখ করে প্রশংসা জানান। একই বছরে কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতে রেইনসভে হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ইউরোপীয় ঘরানার সিনেমার পরিমণ্ডল পেরিয়ে তাঁর নাম উচ্চারিত হতে থাকে বৈশ্বিক চলচ্চিত্র মহলে। তবে এই সাফল্যকে তিনি ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখেন না; বরং নরওয়ের চলচ্চিত্রশিল্পের বিকাশমান যাত্রার অংশ হিসেবেই দেখেন। তাঁর ভাষায়, ‘নরওয়ের চলচ্চিত্রের ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়। আমরা এখন কিছু গড়ে তুলছি। সেই নির্মাণপ্রক্রিয়ার অংশ হতে পারা আমার জন্য রোমাঞ্চকর এবং আনন্দের।’
পাঁচ বছর পর আবারও ট্রিয়ারের সঙ্গে তাঁর পুনর্মিলন। এবারের সিনেমার নাম ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’। এতে রেইনসভে অভিনয় করেছেন নোরা নামের এক অভিনেত্রী চরিত্রে, যিনি বহু বছর পর বাবার মুখোমুখি হন। তাঁর বাবা গুস্তাভ, একজন প্রবীণ চলচ্চিত্র নির্মাতা, নিজের মায়ের আত্মহত্যাকে ঘিরে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চান। ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিকে শিল্পে রূপ দেওয়ার এই সিদ্ধান্তই বাবা-মেয়ের সম্পর্কের ভেতরে জমে থাকা অমীমাংসিত ক্ষতকে উসকে দেয়। নোরা চরিত্রে রেইনসভে ফুটিয়ে তুলেছেন দীর্ঘদিনের দমন করা ক্ষোভ, অনিশ্চয়তা এবং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া মানসিক ভার। এক ধরনের ট্রমা, যা স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশিত না হলেও আচরণ ও নীরবতায় প্রতিফলিত হয়। চরিত্রটির জটিলতা এখানেই: সে নিজের ভেতরের ভার পুরোপুরি অনুধাবনই করতে পারে না, তবু সেই অদৃশ্য বোঝা বয়ে বেড়ায় প্রতিদিন। রেইনসভের ভাষায়, ‘প্রতিবার ইওয়াকিমের সঙ্গে কাজ করলে আমি মানুষ হিসেবে নতুন কিছু শিখি। এই সিনেমার মাধ্যমেও আমি অনেক কিছু শিখেছি।’
‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ মুক্তির পর সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, শিল্পীসত্তার অনিশ্চয়তা এবং অসমাপ্ত আবেগের যে নির্মোহ উপস্থাপনা রেইনসভে করেছেন, তা অনেকের মতে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সংযত ও গভীর অভিনয়। আর সে কারণেই এবারের অস্কারের দৌড়ে স্থান পেয়েছেন রেইনসভে। নোরার চরিত্রে অভিনয়ই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের মঞ্চে। একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের সেরা অভিনেত্রী বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছেন রেনাটা। ইউরোপীয় আর্টহাউস ঘরানার কোনো অভিনেত্রীর জন্য এটি নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। শুধু মনোনয়নেই থেমে নেই আলোচনা; পুরস্কার দৌড়েও তাঁকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শিল্পসমালোচকদের একাংশ মনে করছেন, অতিনাটকীয়তার বদলে সংযত, বুদ্ধিদীপ্ত এবং অভিনয়শক্তির জন্যই এবার অস্কার তাঁর ঝুলিতে যেতে পারে। গোল্ডেন গ্লোব মনোনয়ন ও একাধিক সমালোচকের স্বীকৃতি তাঁর সম্ভাবনাকে আরও দৃঢ় করেছে। তবে প্রতিযোগিতা সহজ নয়। অস্কারের মঞ্চে প্রায়ই জোরালো চরিত্র ও দৃশ্যমান পরিবর্তন বেশি নজর কাড়ে। রেইনসভের অভিনয় তার ঠিক বিপরীত। নীরব কিন্তু গভীর। আর অনেক সময় ইতিহাস গড়ে এ ধরনের অভিনয়ই।
তবে রেনাটা রেইনসভে শুরুর গল্প কিন্তু একেবারেই আলাদা। ছোটবেলায় তিনি ছিলেন অস্থির, নিয়মের গণ্ডিতে আটকে থাকতে না-পারা এক মেয়ে। গার্ল স্কাউটসে টিকেননি। পরিবারের হার্ডওয়্যার দোকানের কাজেও মন বসেনি। তাঁর ভাষায়, ‘আমাকে প্রায় সব জায়গা থেকেই বের করে দেওয়া হয়েছে। অভিনয় ছাড়া। একমাত্র সেখানেই আমি নিজেকে খুঁজে পাই।’ স্কুল নাটকে একদিন তাঁকে শেয়ালের চরিত্রে অভিনয় করতে দেওয়া হয়েছিল। অন্য বাচ্চারা যখন মজা করে নেচে বেড়াচ্ছে, রেইনসভে তখন গম্ভীর। শেয়ালটি কী খেয়েছে, কোথা থেকে এসেছে–এসব নিয়ে তিনি ভাবছিলেন। কেউ তাঁকে শেখায়নি, তবু তিনি চরিত্রের ভিতরে ঢুকে পড়েছিলেন। সেই মুহূর্তটিই যেন তাঁর শিল্পীজন্ম। শেয়ালের পোশাক পরে মঞ্চে ওঠার স্মৃতি আজও তাঁর স্পষ্ট মনে আছে। নরওয়ের ছোট এক গ্রামে তাঁর বেড়ে ওঠা, যেখানে একটি দোকান আর একটি পেট্রোলপাম্প ছিল তাদের বসতি। সেখান থেকে অসলো শহরে এসে থিয়েটারে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন তিনি। আজ তাঁর নাম উচ্চারিত হচ্ছে বিশ্বমঞ্চে।
হলিউডের উজ্জ্বল আলোর নিচে দাঁড়িয়েও নরওয়ে থেকে স্থায়ীভাবে লস অ্যাঞ্জেলেসে পাড়ি জমানোর ইচ্ছে নেই এই অভিনেত্রীর। তাঁর ভাষায়, নিজের ভাষা, সংস্কৃতির ভেতরেই তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। এক সাক্ষাৎকারে রেইনসভে বলেছিলেন, যেখানে তিনি বড় হয়েছেন, সেখানে হলিউড ছিল এতটাই দূরের যে, সে স্বপ্ন দেখার সাহসই পাননি। আজ তিনি সেই জগতেরই অংশ এবং সম্ভবত তাঁর শীর্ষ স্বীকৃতির দোরগোড়ায়। রেনাটা রেইনসভের যাত্রা তাই কেবল একজন অভিনেত্রীর সাফল্যের গল্প নয়; এটি শিল্পের প্রতি আস্থার গল্প। অস্কারের রাতে মঞ্চে তাঁর নাম ঘোষণা হোক বা না হোক, একটি বিষয় নিশ্চিত। রেইনসভে এখন আন্তর্জাতিক সিনেমার সবচেয়ে মনোযোগী ও প্রভাবশালী সমসাময়িক মুখগুলোর একটি। আর যদি সোনালি মূর্তিটি তাঁর হাতেই ওঠে, সেটি হবে এক নীরব বিপ্লবের স্বীকৃতি।