নষ্ট পাপড়ি থেকে অর্গানিক শিল্প

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী গত কয়েক দশকে দেশ-বিদেশে পরিচিতি পেয়েছে ‘ফুলের রাজ্য’ বা ‘রাজধানী’ হিসেবে। বছরের বারো মাসেই এখানে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয় গোলাপ, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, টিউলিপ, জারবেরা, গাঁদাসহ অন্তত ২০ রকমের ফুল। ভ্যালেন্টাইনস ডে, ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, মহান স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস, পহেলা বৈশাখ বিশেষ দিন মানেই গদখালীর ফুলের ব্যস্ততা। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের প্রায় সব জেলায় ছড়িয়ে পড়ে এই অঞ্চলের রঙিন সুবাস।
তবে রঙের এই রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি বেদনার গল্পও ছিল। দেড় হাজার হেক্টর জমিতে যশোর জেলায় ফুলের চাষ হয়, যার মধ্যে প্র্রায় এক হাজার দুইশ’ হেক্টরই গদখালীতে। বছরে চারশ’ থেকে পাঁচশ’ কোটি টাকার ফুল কেনাবেচা হয় এই বাজারে। কিন্তু চাহিদা-জোগানের ওঠানামা, মৌসুমভিত্তিক অতিরিক্ত উৎপাদন, মহামারি বা রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিপুল পরিমাণ ফুল অবিক্রীত থেকে যেত। অক্টোবর থেকে মার্চ ভরা মৌসুমে যখন ফুলে ভরে যায় মাঠ, তখন দাম পড়ে যায় তলানিতে। অনেক সময় চাষিরা কষ্টে ফলানো ফুল গরু-ছাগলের খাদ্য হিসেবে দিয়ে দেন কিংবা ফেলে দিতে বাধ্য হন।

গড়ে বছরে এক থেকে দেড়শ’ কোটি টাকার ফুল নষ্ট হতো এ এক বিশাল অপচয়, একরাশ হতাশা। এই অপচয়ের ভেতর থেকেই জন্ম নেয় নতুন ভাবনা ফুল শুধু সাজসজ্জার জন্য নয়, হতে পারে শিল্পের কাঁচামালও। যশোর ফুল উৎপাদক ও বিপণন সমবায় সমিতির উদ্যোগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় গদখালীর পানিসারা গ্রামের তিন নারীকে পাঠানো হয় ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের ড. ওয়াইএসআর হর্টিকালচার বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাবেয়া খাতুন, নাসরিন নাহার আশা ও সাজেদা বেগম এই তিন নারীর হাত ধরেই শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়।
প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে তারা শুধু নিজেরাই কাজ শুরু করেননি, স্থানীয় আরও ২৭ জন নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ জনে। ফেলনা বা পরিত্যক্ত ফুলের পাপড়ি থেকে তারা তৈরি করছেন ২৫ থেকে ৩০ রকমের অর্গানিক পণ্য সুগন্ধি সাবান, নারিকেল তেল, রূপচর্চার ফেসপ্যাক, ব্যথানাশক তেল, আগরবাতি, প্রাকৃতিক রং, এমনকি অলংকারও। 
গোলাপের শুকনো পাপড়ি গুঁড়া হয়ে উঠছে প্রসাধনী; গাঁদা ও গোলাপের পাপড়ি জ্বাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে প্রাকৃতিক ডাই, যা দিয়ে কাপড়ে নকশা করা হচ্ছে। রজনীগন্ধার নির্যাস থেকে তৈরি হচ্ছে সুগন্ধি তেল ও গোলাপজল।
ফুলের শুকনো পাপড়ি দিয়ে তৈরি হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন ওয়ালম্যাট, চুড়ি, কানের দুল, চাবির রিং, ফটোফ্রেম, এমনকি কলম। সৌন্দর্য আর সৃজনশীলতার এমন মেলবন্ধন গদখালীর ফুলচাষে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আগে যে পাপড়ি পচে মাটিতে মিশে যেত, এখন তা রূপ নিচ্ছে মূল্যবান পণ্যে। সাজেদা বেগম জানান, তারা শহরের বিভিন্ন দোকানে এসব পণ্য বিক্রি করেন। প্রতিদিন শত শত মানুষ গদখালীর ফুল দেখতে আসেন তারাও কিনে নিয়ে যান এই অর্গানিক সামগ্রী। তবে এখনো সব কাজ সনাতন পদ্ধতিতে হচ্ছে বলে উৎপাদন সীমিত। 
একটি আধুনিক কারখানা গড়ে উঠলে বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ সম্ভব হবে।
নাসরিন নাহার আশার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস সংসারের কাজ সামলে তারা নিজেরা এসব পণ্য তৈরি করছেন, ব্যবহার করছেন, বিক্রি করছেন। এতে যেমন সংসারে বাড়তি আয় হচ্ছে, তেমনি আত্মমর্যাদাবোধও বেড়েছে। ফুলের সুবাস তাদের জীবনে এনে দিয়েছে আর্থিক স্বাবলম্বিতার ঘ্রাণ। সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিমের মতে, বিশ্ববাজারে অর্গানিক পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *