ডিজিটাল সহিংসতা

‘বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ’ যাযাবর–এর এই পঙ্‌ক্তিটি এখন শতভাগ সত্য প্রমাণিত হচ্ছে। তথ্য প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার এর কল্যাণে মানুষের হাতের মুঠোয় গোটা বিশ্ব। একটি বাটন টিপেই বিশ্বের যাবতীয় ঘটনা মানুষ জেনে যাচ্ছে। এক পলকে দেশের টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, বিশ্বের উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু প্রযুক্তির কারণে মানুষের নখদর্পণে। কিন্তু এই প্রযুক্তি উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জন্য যতখানি ইতিবাচক, আমাদের দেশের জন্য ঠিকই ততখানি নেতিবাচক। নেতিবাচক বলার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। সেই বিষয়গুলো পরে আলাদা করে লিখবো। এখন শুধুমাত্র নারীরা এই সাইবার জগতে কতখানি অনিরাপদ সেটিই তুলে ধরবো। আমরা জানি, প্রযুক্তি আজ আমাদের প্রত্যেকের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ এই উন্নত প্রযুক্তিই আজ নারীর জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যা এখন ডিজিটাল সহিংসতা নামে পরিচিত। এই সহিংসতার ধরনও বহুমুখী। কারো সম্মতি ছাড়া অন্তরঙ্গ ছবি বা ভিডিও ছেড়ে দেয়া থেকে শুরু করে সাইবার বুলিং, অনলাইন ট্রলিং কিংবা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা এখন নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই–এর অপব্যবহার। যার মাধ্যমে ফেক পর্ণোগ্রাফি বা বিকৃত ছবি তৈরি করে নারীর সম্মানহানি করা হচ্ছে। এছাড়াও অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বানোয়াট গল্প বানিয়ে তা ফাঁস করে প্রচার করছে। সবসময় নজরদারিতে রাখা, যৌন হয়রানি এবং নারী বিদ্বেষী বিভিন্ন অনলাইন পেইজ–এর মাধ্যমে ঘৃণাত্মক বক্তব্য ছড়ানোর ঘটনাগুলো ডিজিটাল সহিংসতার অন্তর্ভুক্ত। এই অপরাধটি নিয়ে কিন্তু কঠোর আইন রয়েছে। এই পরিসংখ্যানে জানা গেছে, অনলাইন সহিংসতার শিকারদের মাঝে প্রায় ৭৫% থেকে ৮২% নারী। এই ধরনের অপরাধের মধ্যে রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায় হয়রানি, ছবি ম্যানিপুলেশন, পর্ণোগ্রাফি, ভুয়া প্রোফাইল তৈরি এবং ব্ল্যাকমেইলিং এর মাধ্যমে চাঁদা দাবি।

সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী ৬ অধ্যায়ের ২৫(২) ধারায় বলা অছে, যদি কোন ব্যক্তি উক্ত অপরাধ সংঘটনের সাথে জড়িত থাকে তবে অনধিক দুই বছর কারাদন্ড বা দশ লক্ষ টাকা অর্থদন্ডে দন্ডিত হবেন। এছাড়া ২৫(৩) ধারায় বিশেষভাবে বলা হয়েছে ভুক্তভোগী যদি কোনো নারী বা শিশু হন তবে অনধিক পাঁচ বছর কারাদন্ড বা দশ লক্ষ টাকা অর্থদন্ডে দন্ডিত হবেন।

সাইবার আইন কিংবা সাইবার ট্রাইব্যুনাল কতখানি সক্রিয় তা খতিয়ে দেখা জরুরি। এই আইনে কতগুলো মামলা হয়েছে, কতজন অপরাধী শাস্তির আওতায় এসেছে, কিংবা দণ্ড কার্যকর হয়েছে, সেই পরিসংখ্যান নিতে হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নারী আইনজীবী বলেন, আসলে নারীরা লোকলজ্জা কিংবা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হবে মনে করে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে চান না; এড়িয়ে যান, নিজেরাই ট্রমায় থাকে। কিন্তু এখন এই বিষয়গুলো নিয়ে মুখ খুলতে হবে। কথা বলতে হবে। আইনের আশ্রয়ও নিতে হবে। মনোবিশ্লেষক শেহেরিশ নিশাত বলেন, সাইবার ক্রাইমে আক্রান্ত নারী আমাদের সমাজে প্রথমে নারী বিদ্বেষী পুরুষ, এবং নারী ও পুরুষ বন্ধুদের দ্বারা বেশী ভাইরাল হয়।

ভুক্তভোগী এক নারী অভিযোগ করে বলেন, আমি এতকাল যাদের আপন ভেবেছি, তারাই ভাইরাল,অপপ্রচার ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যকে নিয়ে অন্য এক খেলায় মেতেছে। অথচ একটিবারের জন্যও ফোন করে সমবেদনা জানানো তো দূরের কথা, বরং সেই অপবাদ আর কুৎসাকে কেউবা লাইক,কমেন্ট, শেয়ার এমনকি কপি করে পাঠাচ্ছে বিভিন্ন মানুষের কাছে। তাহলে কেবল পুরুষরা নয়, এক শ্রেণির নারীও শক্তভাবে যুক্ত এই ডিজিটাল ক্রাইমের সাথে।

২০২৫ সালের এক পরিসংখ্যানে জাতিসংঘ বলেছে, আরব অঞ্চলে ৬০ ভাগ নেট ব্যবহারকারী নারী অনলাইন ভায়োলেন্স–এর শিকার। পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার ১২ দেশে ৫০ ভাগ নারী প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার শিকার হচ্ছে। সাব সাহারান এলাকায় ৫ টি দেশের ২৮ ভাগ নারী অনলাইন ভায়োলেন্সের মুখে পড়েছেন। ডেনমার্ক, ইতালি, নিউজিল্যান্ড, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ থেকে ৫ বছরের ২৩ শতাংশ নারী অনলাইন হেরাজমেন্টের শিকার হন। সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, ভুয়া প্রোফাইল তৈরি করে মানহানি, ব্যক্তিগত ছবি বিকৃতি ও অশালীন কনটেন্ট ছড়িয়ে দেয়া এবং ব্ল্যাকমেইলিং করে রিভেঞ্জ পর্ণো বানানোর অপচেষ্টা। ফলে নারীর গোপনীয়তা ও আতত্মসম্মান দুটোই এখন প্রযুক্তির হুমকিতে বলা যায়। কাজেই বিষয়টিকে এখন সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা জরুরী। অন্যদিকে নারীর অনলাইন নিরাপত্তা কেবল আইনের বিষয় নয়, এটি ডিজিটাল লিটারেসি এবং সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তনের বিষয়ও। এক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন স্কুল কলেজে ডিজিটাল সেফটি শিক্ষা প্রদান এবং নারীদের সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। এছাড়া আইনগুলোও নারীদের জানা থাকা প্রয়োজন। প্রথম কথা হলো মানহানিকর তথ্য ছড়ানোর মতো গুরুতর অপরাধ এর জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা যায়। মানহানিকর তথ্য প্রকাশের জন্য ২৪, অপপ্রচার ও গুজবের জন্য ২৫, মান হানিকর ডিজিটাল কনটেন্ট ছড়ানোর জন্য ২৯ এবং নৈতিক অবক্ষয় ও ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য ৩১ ধারায় মামলা করা যায়। আর মামলার জন্য প্রথমেই লাগবে উপযুক্ত প্রমাণ। তাই এই জাতীয় ঘটনার তথ্য ও প্রমাণ সংরক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আইনি লড়াইয়ে প্রমাণই মুখ্য অস্ত্র। সেজন্য ঘটনার স্ক্রিনশট এবং ভিডিও রেকর্ড করে আলামত সংগ্রহে রাখতে হবে। বিশেষ করে তারিখ, সময়কাল, হ্যারাসমেন্টের স্ক্রিনশট, অপরাধীর প্রোফাইল লিঙ্ক, যেসব পেজ বা মন্তব্যে হয়রানি করা হয়েছে সেগুলোর ইউআরএল সংরক্ষণ জরুরি। সবশেষে বলতে চাই, লাইভে এসে কান্না করা, পোস্টে গিয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করা প্রতিবাদ নয়, প্রতিবাদ মানে আইনকে হাতিয়ার করে অপরাধীর বিরুদ্ধে জোরালোভাবে রুখে দাঁড়ানো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *