ঈদ সালামি

শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখার জন্য সবাই উদগ্রীব থাকে। শাওয়াল মাসের প্রথম দিন মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। ঈদ কবে উদযাপিত হবে, শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। ঈদ মানেই আনন্দ, উল্লাস আর উৎফুল্লতা। শাওয়ালের চাঁদ মানেই ঈদের চাঁদ। সেজন্য ঈদের আগের দিন রাতকে বলা হয় ‘চাঁদরাত’। চাঁদ দেখাকে কেন্দ্র করেই মূলত শুরু হয় আমাদের ঈদ উদযাপনের পালা। চাঁদের বাঁকা রেখা ফুটে ওঠা মাত্রই সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দের ফল্গুধারা। ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে/ এলো খুশির ঈদ/ তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে/ শোন আসমানি তাগিদ।’ নজরুলের সেই গান ধ্বনিত হতে থাকে সবার হৃদয়ে।

চাঁদ দেখাকে কেন্দ্র করে এই আনন্দ–উত্তেজনা আজকের নতুন নয়, বরং বহু পুরোনো রীতি। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে, মীর্জা নাথান রচিত ইতিহাসগ্রন্থ ‘বাহারিস্তান–ই গায়বী’তে পাওয়া যায় এই রীতির কথা। সেখানে উল্লেখ আছে –দিনের শেষে সন্ধ্যায় নতুন চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে রাজকীয় নাকারা বেজে ওঠে এবং গোলন্দাজ সেনাদলের আগ্নেয়াস্ত্র থেকে ক্রমাগত তোপ দাগানো হয়।’ অর্থাৎ, সেনাদলের বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে নগরবাসীকে বুঝিয়ে দেওয়া হতো, শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেছে।

নওবাহার–ই–মুর্শিদকুলী খান গ্রন্থের লেখক আজাদ হোসেন বিলগ্রামীর বর্ণনায় এর উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন যে, নবাব সুজাউদ্দিনের অধীনে ঢাকার সহকারী শাসনকর্তা ‘ঈদগাহ’ ময়দানের দিকে শোভাযাত্রা করে যাওয়ার সময় দুর্গ থেকে এক ক্রোশপথে প্রচুর পরিমাণে টাকাপয়সা ছড়িয়ে যেতেন। এক বড় জামাতে মুসলমানগণ তাদের নামাজ পড়ত এবং আনন্দ আবেগে একে অন্যকে উৎসাহের সঙ্গে অভিবাদন জানাতো। গোলাম হোসেন তাবাতাবাঈয়ের বর্ণনায় ঈদ উৎসবে মুসলমানদের খুশি ও আনন্দফূর্তির বিষয় প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেন, প্রত্যেকেই এই দিনে উৎকৃষ্ট পোশাকে সজ্জিত হতো।

শিশুদের আগ্রহ ঈদ সালামি নিয়ে। ঈদ সালামির প্রচলন কোথায় প্রথম চালু হলো, কবে থেকে এর যাত্রা, কারা এর শুরুটা করেছেন, এমন সূচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ঈদের দিনে সালামির রেওয়াজও ছিল ব্রিটিশ আমলের বাংলায়। মুস্তাফা নূরউল ইসলাম লিখেছেন– ‘আমার সেই শৈশব–বাল্যের ঈদের দিনের ছবি আঁকি। এর মধ্যে কাছে–পিছের থেকে, নানান ফ্ল্যাট থেকে আব্বার বন্ধু–বান্ধব, স্বজন, সহকর্মী সবাই এসে গেছেন, নিচের ব্যারাক থেকে এসেছেন হাবিলদার সেপাই এঁরা। বড়দের সালাম করবার পর তখনকার দিনেও ছিল সালামি উপহার দেওয়ার রেওয়াজ। এখন বেশ মজাই লাগে ভাবতে–পুলিশের নিচের পদের হাবিলদার সাবেরা সালামি দিতেন ডবল পয়সা। মাথায় মুকুট কুইন ভিক্টোরিয়ার অথবা সম্রাট পঞ্চম জর্জের ছাপঅলা তামার ডবল পয়সা। সেই যে কত ছিল!’ (ইসলাম : ২০১৯, ২৬)

অনেকে ফাতিমীয় খেলাফতের যুগে এর শুরু বলে জানান। অটোমান সাম্রাজ্যেও ঈদ সালামির প্রচলন ছিল। হিন্দি ভাষার জনপ্রিয় লেখক মুনশি প্রেমচাঁদ ‘ঈদগাহ’ নামে একটি গল্প লিখেছেন। গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র এতিম বালক হামিদ ও তার দাদী আমেনা। আমেনা ঈদের দিন খাবার কেনার জন্য হামিদকে ৩ পয়সা উপহার দেয়। কিন্তু হামিদ ওই ৩ পয়সা দিয়ে খাবারের পরিবর্তে একটি চিমটা সংগ্রহ করে। বাড়ি ফিরে আমেনার হাতে চিমটাটি তুলে দিতেই সে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, ‘ওরে ও হতভাগা, খাবারের জন্য এই কটা পয়সা দিয়েছি, কে তোকে চিমটা কিনতে বলল!’ হামিদ নমিত কণ্ঠে বলে, ‘রুটি সেঁকতে গিয়ে রোজ তোমার হাত পুড়ে যায়, চিমটা দিয়ে রুটি সেঁকলে আর হাত পুড়বে না, এ জন্যই তো এটা কিনে আনলাম।’ তবে দশম শতাব্দীতে ফাতিমীয় খেলাফতের যুগে মিসরে সালামি প্রথার সূচনা ঘটে। এ সময় ঈদের দিন বড়রা ছোটদের হাতে কিছু পরিমাণ পয়সা তুলে দিতেন। এই প্রথা তখন ‘ঈদি’, ‘হাদিয়া’ প্রভৃতি নামে পরিচিত ছিল। ক্রমে অটোমান সাম্রাজ্য ও আরবেও ঈদি বিনিময়ের রীতি সমপ্রসারিত হয়। কেবল নগদ অর্থ নয়, রুচিভেদে কেউ কেউ নতুন কাপড়, মিষ্টিও ঈদির তালিকায় যুক্ত করেন।

বাংলায় ঈদ সালামি প্রচলনের পেছনে রয়েছে –এক. গ্রামবাংলার মুসলমানরা ছিলেন দরিদ্র, দুই. মুসলমানের মধ্যে স্বতন্ত্র কমিউনিটির বোধ তখনো প্রবল হয়নি। ফলে ধর্মীয় উৎসবকে একটি সামাজিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সহজ ছিল না। নবাব–বাদশাহরা ঈদ করতেন, তবে তা সীমিত ছিল অভিজাত উচ্চবিত্তের মধ্যে, উৎসব হিসেবে ঈদের তাৎপর্য জনসাধারণের নাগালের বাইরে ছিল। তবে ঊনিশ শতক ধরে চলা ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের প্রভাবে গ্রামীণ ও নগরজীবনের উৎসবে নতুনত্বের ছোঁয়া লাগে। আর বিশ শতকের চতুর্থ দশক থেকেই ঈদ উৎসব সর্বব্যাপী ছড়িয়ে যেতে শুরু করে।

ঈদ সালামি আর ঈদ উৎসব একই সূত্রে গাথা। খুশির আমেজে ঈদের দিন ছোটদের হাতে তুলে দেয় কড়কড়ে নতুন টাকা। আর এভাবেই সালামি শহর থেকে পৌঁছে গেছে লোকালয়ে, উচ্চশ্রেণি থেকে সাধারণ্যে। সালামির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো সেই অর্থের পরিমাণ যা–ই হোক না কেন, সেটা চকচকে নতুন নোট হতে হবে। ঈদ সালামি প্রদানের ক্ষেত্রে অর্থ মুখ্য নয়, বরং সবাই মিলে উৎসবে শামিল হওয়ার আনন্দই মুখ্য। ডিজিটাল যুগেও ঈদ সালামি আদান–প্রদানের এই রীতি শুধু শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তবে এই সময়ে এসে সালামি প্রদান খানিকটা আনুষ্ঠানিকতার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার একটি অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। ‘ওরে ও নতুন ঈদের চাঁদ/ তোমায় হেরে হৃদয় সাগর আনন্দে উন্মাদ/ তোমার রাঙা তশতরিতে ফিরদৌসের পরী/ খুশির শিরনি বিলায় রে ভাই নিখিল ভুবন ভরি/ খোদার রহম পড়ছে তোমার চাঁদনি রূপে ঝরি/ দুখ ও শোক সব ভুলিয়ে দিতে তুমি মায়ার ফাঁদ।’

সবার মাঝে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে ঈদ সালামি অন্যতম মাধ্যম। ঈদ সবার জন্য খুশির বার্তা নিয়ে আসে। ধনী–গরিব সবাই মিলে এক কাতারে ঈদের নামাজ আদায় করে। সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধনে ঈদ হয়ে ওঠে আনন্দময়। আনন্দের বন্যায় ভেসে যাক সবার অন্তর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *