আধুনিক ঢাকার অসমাপ্ত গল্প

ঢাকা একবিংশ শতাব্দীর নগর-বৈপরীত্যের বড় উদাহরণ– আধুনিকতার দিকে দ্রুত-ধাবমান শহরটির প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা অনানুষ্ঠানিকতা ও বিশৃঙ্খলায় ভরা। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, ঢাকা বিশ্বের বৃহত্তম নগরসমূহের একটি– যার অবকাঠামো ও শাসনব্যবস্থা কোনোভাবেই জনস্ফীতি ধারণ করতে পারছে না। তারা যা দেখেনি তা হলো ঢাকায় একই সঙ্গে বিরাজ করা বিশাল এক অনানুষ্ঠানিক খাত দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে। এ লেখা জনসংখ্যা, অর্থনীতি, অবকাঠামো, পরিবেশ এবং সামাজিক গবেষণার আলোকে কেন আধুনিকতার মাঝেও ঢাকা এত বিশৃঙ্খল তা দেখার চেষ্টা করছে– কেন রিকশার পাশাপাশি অ্যাপভিত্তিক রাইড-শেয়ারও চলে, কেন মেট্রোরেল থেকে নেমে কারওয়ান বাজারে আপনি নিজের পছন্দের মাছ কুটে নিতে পারেন এবং কীভাবে বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা উন্নত ভবিষ্যতের দিশা দিতে পারে।

ক্রিস্টালারের সেন্ট্রাল প্লেস থিওরির আলোকে ওয়েনডোভার প্রোডাকশনস এক গবেষণায় দেখিয়েছে, রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ঊহ্য রেখে পৃথিবীতে নগর গড়ার সর্বোপযোগী জায়গাগুলোর একটি হলো কয়েকটি বিশাল নদীর সংগমস্থল যেখানে ঢাকা দাঁড়িয়ে আছে। সোনারগাঁ আর বিক্রমপুরের মাঝামাঝি কয়েকটি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জনপদ থেকে বেড়ে ওঠা এই শহর একাধিকবার রাজধানীর মর্যাদা পেয়েছে, যার মতো উদাহরণ পৃথিবীতে বিরল। সপ্তদশ শতকে লন্ডনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও সমৃদ্ধ নগর ছিল ঢাকা। আজও তা নিঃশব্দে বিশ্বের শীর্ষ মহানগরের কাতারে উঠে এসেছে– কিন্তু দুঃখজনকভাবে তা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত ও নিকৃষ্ট বাসযোগ্য শহরের তালিকাতেও রয়ে গেছে। 
এই বর্ধিষ্ণু মহানগর বিশৃঙ্খলা, বৈপরীত্য, বিরোধ, সৃজনশীলতা ও প্রাণশক্তির এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। এখানে অতীত ও বর্তমান প্রতিনিয়ত ধাক্কা খায়; রিকশা ও রাইড-শেয়ার বাইক চলে বিএমডব্লিউর ফাঁকে ফাঁকে; টেক-স্টার্টআপ দাঁড়ায় মুদির দোকানের পাশে; ঔপনিবেশিক কালের জীর্ণ ভবনের পাশে উঠে যায় কাচের বাক্স। ঢাকা যেন ডিকেন্সের লন্ডন, বোদলেয়ারের প্যারিস আর জয়েসের ডাবলিনের এক যৌথ প্রতিচ্ছবি; গিন্সবার্গের ভাষায় “রোবটসম অ্যাপার্টমেন্ট! অদৃশ্য উপশহর! অস্থিচর্মসার সম্পদ! অন্ধ রাজধানী! দৈত্যাকার শিল্প! প্রেতাত্মা জাতি! অবিনশ্বর উন্মাদালয়!” আদনান মোরশেদ ঢাকার বৈচিত্র্যময় নগর-চিত্রের যে তালিকা দিয়েছেন– বৃহৎ শপিং আর্কেড, হাহাকারময় জনসমুদ্র, সংসদের স্থাপত্য-সৌম্য, হাতিরঝিলের স্বস্তি, নোবেলজয়ী বই বিক্রি করা ফুটপাতের হকার, ট্রাফিক সিগন্যালে ফুলওয়ালী কিশোরী, আর ভাসমান বস্তির মাথার ওপর উঠে যাওয়া বিশাল বিলবোর্ড আভাস দেয় এক গভীর নগর-বাস্তবতার।

চেহারা
মোগল আমলের সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রাদেশিক রাজধানী, খাল-নদীবিধৌত ঢাকা ছিল মসলিন, বণিক, কারিগর, শাঁখারির এক মিলনমেলা। সরু গলি, জনাকীর্ণ বাজার, নদীঘেঁষা বাগান, মসজিদ, মন্দির আর আলাদা পেশা ও পরিচয়ের একেকটি মহল্লাকে ঘিরে শহরটির একটি চেহারা গড়ে উঠেছিল। দেশ ভাগের পর কিছুটা আর একাত্তরের স্বাধীনতার পর শহরটি দ্রুত আর অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে থাকে– জলাশয় ভরাট, ধানিজমি দখল, বেপরোয়া নির্মাণ এবং এলোমেলো বিস্তৃতি ঢাকার আজকের চেহারা তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
প্রায় শতবর্ষ ধরে ঢাকা বিভিন্ন পরিকল্পনা পেলেও তার এক-চতুর্থাংশও বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ১৯৫৯ সালের মহাপরিকল্পনা ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা আন্দাজই করতে পারেনি; উপরন্তু ঢাকা যে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠবে, তা কে কল্পনা করেছিল! গ্রাম-নগর অভিভাসন, চরম দারিদ্র্য, আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রাম– ঢাকার বর্তমান নগররূপকে বহুতলে বেঁধে ফেলেছে। এর উপরতলে যেমন আছে চোখধাঁধানো সুরক্ষিত প্রাসাদ, আর নিচে ঘিঞ্জি মহল্লা, একদিকে তেজগাঁওয়ের গগনচুম্বী করপোরেট টাওয়ার, আর অন্যদিকে পুরান ঢাকার অন্ধকারময় খুদে কারখানা। ঢাকার আধুনিকতা মোটেও চকচকে নয়– এটি সংঘর্ষপূর্ণ, স্বতঃস্ফূর্ত, সৃজনশীল এবং কখনও বিশৃঙ্খল। তবুও এখানেই আছে বাঁচার উপায়, অর্থনৈতিক পুষ্টি এবং উদ্ভাবনের সুযোগ।

জনমেলা 
আঠারো শতকের গোড়ায় করতলব খাঁ ঢাকা ছাড়ার ফলে শহরটি রাজধানীর মর্যাদা হারায়। একশ বছরের মধ্যে এর জনসংখ্যা একেবারে তলানিতে ছাব্বিশ হাজারে গিয়ে ঠেকে। পরে পৌরসভা হয়ে এবং কিছু প্রশাসনিক গুরুত্ব ফিরে পেলে ঢাকার জনসংখ্যা ও অর্থনীতি আস্তে আস্তে বাড়তে শুরু করে। কিন্তু ১৯৭১-এর পর স্বাধীন বাংলাদেশের কেন্দ্র হয়ে শহরটি অস্বাভাবিক দ্রুততায় ফুলেফেঁপে ওঠে। গ্রামাঞ্চলের দারিদ্র্য, নদীভাঙন আর সামাজিক শোষণের জেরে, আর দুর্যোগ ও চাকরির সন্ধানে লাখো মানুষ ঢাকায় ঢুকে পড়ে। মাত্র কয়েক দশকে জনসংখ্যা ৫০ গুণ বেড়ে যাওয়া বিশ্বে বিরলই বটে। এই জনসংখ্যাই ঢাকার ‘বিশৃঙ্খলা’র প্রধান নিয়ামক: গাড়িঘোড়া আর গণপরিবহনের চাপ, ভিড়ে ঠাসা রাস্তা, পরিষেবার ঘাটতি, অনিয়ন্ত্রিত বস্তিবৃদ্ধি, আর সামগ্রিক হতাশাগ্রস্ততা– সবই হচ্ছে অতিরিক্ত জনসমাগমের ফলে।

অর্থনীতির ইঞ্জিন
ঢাকা সব সময় ছিল দেশের বাণিজ্য, শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের কেন্দ্র। মসলিন ও পাটের বাণিজ্য থেকে শুরু করে তৈরি পোশাক শিল্প– আজও অর্থনীতির হৃৎস্পন্দন এখানে। কিন্তু এর বৃহৎ অংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানে যুক্ত– ফেরিওয়ালা, ছোট কারখানা, দিনমজুর, কাজের লোক, রাস্তার ধারের পণ্য-পসারি সবাই শহরকে একই সঙ্গে প্রাণবন্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন করে তুলেছে। ঢাকার আধুনিকতা তাই দ্বিচারী– বহুতল অট্টালিকা আর অ্যাপভিত্তিক ব্যবসাও যেমন আছে, তেমনি আছে ফুটপাতের দোকান, গৃহকর্মী, রিকশাচালক, খোলাবাজার। এই অনানুষ্ঠানিকতা শহরের প্রতিদিনের ধুকধুকানি। বিকাশ-নগদ থেকে শুরু করে ই-কমার্স ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম– সবই এসেছে মানুষের সৃজনশীল বাঁচার কৌশল থেকে। শহরের আধুনিকতার শক্তি মূলত এখানেই।

অবকাঠামো ও বিশৃঙ্খলা
ঢাকা এমন এক বদ্বীপে গড়ে উঠেছে, যেখানে গাড়িভিত্তিক শহর স্বাভাবিক নয়। তবুও নির্মিত হয়েছে উড়ালসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রো। এর যে কোনো সুফল মেলেনি তা নয়, কিন্তু তা আংশিক; একই সাথে সমান্তরাল ভূমি-ব্যবস্থা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও চাহিদা নিয়ন্ত্রণ না করলে মেট্রোর সুফলও বিলীন হয়ে যাবে। বিজ্ঞান বলে রাস্তায় গাড়ি চলার সুযোগ বাড়লে যাতায়াতও বাড়বে। 

ফলে নতুন রাস্তা দ্রুতই অকিঞ্চিৎ হয়ে পড়ে। ভুল নকশার ওভারপাস, অকার্যকর সিগন্যাল, নিয়মভঙ্গ ও হাঁটার বিড়ম্বনা– সব মিলিয়ে জটের শেষ নেই। রিকশা, মিনিবাস, অ্যাপ-ভিত্তিক বাইক– সবই মানুষের প্রয়োজন, নিদেনপক্ষে মোড়ে গিয়ে গণপরিবহন ধরতে? এগুলো বাদ দিলে বিশৃঙ্খলা বাড়ত, আর তা নীতিতে একীভূত না করলে সমাধান অসম্ভব। একই সাথে পায়ে হাঁটার পথের সুযোগ বাড়ানো ও ‘১৫-মিনিটের হাঁটার রাস্তা’-র ধারণা বাস্তবায়ন জরুরি।

পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ 
ঢাকা দীর্ঘদিন উত্তর দিকে বেড়েছে মূলত মধুপুর মাটির উঁচু ভূমি থাকাতে। কিন্তু এখন তা হাত-পা ছড়িয়েছে সবদিকেই। যত্রতত্র জলা ভরাট হয়েই যাচ্ছে; গড়ে উঠছে নতুন নতুন দালানকোঠা, অফিস-আদালত– যা অপরিকল্পিত এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের ইঙ্গিত। ঢাকার প্রান্তের গ্রামীণ জমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে নাগরিক চাহিদার কাছে। জমির দাম অস্বাভাবিক, পরিকল্পিত আবাসন কম, ফলে বস্তি ও অনিয়ন্ত্রিত জমি ও বাড়ির ব্যবসায় কোনো কমতি নেই। অভিজাত পাড়ার পাশেই আছে আলো-বাতাসহীন কাঁচা ঘর– ঢাকার বৈপরীত্য এখানেই। কড়াইলের বাস্তুচ্যুত মানুষ থেকে গুলশানের তরুণ করপোরেট কর্মী– একই শহরে সমান্তরাল অভিজ্ঞতা, কিন্তু দুই পৃথিবীর মতোই আলাদা। ঢাকা, বিশ্বের ঘনতম নগরী, এক অসম আধুনিকতার শহর।  

জল ও জলবায়ু   
ঢাকার বায়ুদূষণ বিশ্বে নিকৃষ্টতম। যানবাহন, শিল্প, ধুলা, ইটভাটা– সব মিলে নগরবাসীর স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে। খাল-নদী ভরাট হওয়ায় বৃষ্টিতে পানি নামার জায়গা নেই। বুড়িগঙ্গা যেন তরল বিষ– বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নদীগুলোর একটি। শহরটি একটি নড়বড়ে ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে উদ্বাহু ঝাঁপাচ্ছে একটু শ্বাস নিতে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমশ নিচে নেমে যাচ্ছে, এবং এই কংক্রিট জঙ্গলে ভূমিকম্প একটি ভয়াবহ ঝুঁকি। কার্বন-নিবিড় ভাঙাগড়া শহরকে দাঁড় করিয়েছে অস্তিত্বের প্রশ্নের মুখোমুখি। ঢাকার এতসব পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ বিশৃঙ্খল আধুনিকতার সীমাবদ্ধতা এবং একটি টেকসই দৃষ্টান্ত তৈরির প্রয়োজনীয়তাই বুঝিয়ে দেয়। শহরটি তার বর্তমান পথ ধরে এগোতে পারে না; একে টিকে থাকতে নীল-সবুজের মেলবন্ধন গড়ে তুলতে হবে। হারিয়ে যাওয়া জলাধার আর প্রকৃতি পুনরুদ্ধার করে তাকে রক্ষা করতে হবে।

খণ্ড-শাসন, খণ্ড-পরিকল্পনা 
ঢাকায় রাজউক, সিটি করপোরেশন, মন্ত্রণালয়– সবাই আলাদা দায়িত্বে, কিন্তু কাজগুলো ওভারল্যাপ করে যা উন্নয়নকে ধীর করে, অনিয়ম বাড়ায়। বাস্তবায়নহীন পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ছাড়াই প্রবৃদ্ধি, কাঠামোগত ঘাটতির মধ্যেই উদ্ভাবন, দারিদ্র্যের পাশাপাশি সম্পদের পাহাড়, ভিড়ের পাশাপাশি ডিজিটাল সংযোগ এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতার পাশাপাশি পরিবেশগত দুর্বলতা। বরং এই বিশৃঙ্খলতা এক ধরনের শক্তি; যা মানুষকে নগর জীবনযাত্রার নতুন রূপকে অভিযোজিত, উদ্ভাবন এবং কল্পনা করতে বাধ্য করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *