দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার ভাদুরিয়া গ্রাম। ২০১৮ সালেও সেখানকার এক কিশোরীর জগৎ সীমাবদ্ধ ছিল ঘরকন্না আর কৃষিজমিতে। কৃষিকাজ আর কলেজে পড়ার ফাঁকে তাঁর মনে সুপ্ত বাসনা ছিল একবার ঢাকা শহর দেখার। সেই বাসনাই যে একদিন তাঁকে পেশাদার চালক হিসেবে ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় স্টিয়ারিং ধরার আত্মবিশ্বাস জোগাবে, তা ছিল কল্পনারও বাইরে। ব্র্যাকের ‘ফোর হুইলস টু ফ্রিডম’ উদ্যোগ গ্রামবাংলার বহু সুবিধাবঞ্চিত নারীর হাতে গাড়ির চাবি তুলে দিয়ে তৈরি করছে কর্মসংস্থানের নতুন এক দিগন্ত। লিখেছেন শাহেরীন আরাফাত ও সাজিদা ইসলাম পারুল
নারী চালক রেজিনা বর্ষার গল্পটা সিনেমার মতোই রোমাঞ্চকর। ব্র্যাকের কর্মীরা যখন তাঁর গ্রামে গিয়ে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের কথা জানান, তখন তিনি ভেবেছিলেন, ‘গাড়ি চালানো তো ছেলেদের কাজ, আমাকে দিয়ে কী হবে?’ কিন্তু প্রশিক্ষণের স্থান ‘ঢাকা’ শুনেই তিনি রাজি হয়ে যান। উদ্দেশ্য ছিল, ড্রাইভিং শেখা হোক বা না হোক, স্বপ্নের ঢাকা শহরটা তো দেখা হবে!
শুরুটা সহজ ছিল না। পরিবারের, বিশেষ করে বাবার ঘোর আপত্তি ছিল মেয়েকে একা ঢাকায় পাঠানো নিয়ে। মামাতো ভাইয়ের উৎসাহে তিনি ঢাকায় আসেন। স্টিয়ারিং হাতে নেওয়ার পর শুরু হয় নতুন বিপত্তি। ডানে ঘোরাতে বললে ভয়ে বামে ঘুরিয়ে দিতেন, মনে হতো–না, এসব তাঁকে দিয়ে হবে না। বেশ কয়েকবার হাল ছেড়ে বাড়িও চলে গিয়েছিলেন। প্রশিক্ষকদের ধৈর্য এবং অনুপ্রেরণায় তিনি ফিরে আসেন। তিন মাসের কঠোর প্রশিক্ষণ শেষে আজ তিনি ব্র্যাকের প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত। বর্তমানে তিনি মাসে ভালো বেতন পাচ্ছেন, সঙ্গে বোনাস ও ওভারটাইম। স্বামী-সন্তান নিয়ে ঢাকায় সংগ্রাম করলেও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তৃপ্তি তাঁর চোখেমুখে।
ব্র্যাক ২০১২ সালে তাদের ‘ড্রাইভিং স্কুল’ চালু করে। নারীদের বিশেষভাবে এই পেশায় অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে শুরু হয় ‘ফোর হুইলস টু ফ্রিডম’ প্রকল্পটি। মূলত দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত, ডিভোর্সড বা সেপারেটেড নারী এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নারীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই প্রকল্পের আওতায় আনা হয়।
ব্র্যাকের তথ্যমতে, ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে তাদের ড্রাইভিং স্কুলে দুই হাজার ২৬২ জন নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ‘ফোর হুইলস টু ফ্রিডম’ উদ্যোগের আওতায় প্রশিক্ষণ পেয়েছেন ৩৮৪ জন। ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার নারী গাড়ি চালানো শিখেছেন। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে তিন হাজার ৬৪৬ জন নারী ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক তথ্য হলো, প্রশিক্ষিত নারীর বেশির ভাগই বর্তমানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এনজিও, বহুজাতিক কোম্পানি, ব্যাংক, সরকারি দপ্তর ও কূটনৈতিক মিশনে কর্মরত। ব্র্যাকে নারী চালক আছেন ২০ জন।
রাস্তায় নারী চালকদের নিয়ে সমাজের নেতিবাচক ধারণা থাকলেও গবেষণার ফল ভিন্ন কথা বলছে। ব্র্যাক রোড সেফটি প্রোগ্রামের পরিচালক আহমেদ নাজমুল হোসাইন বলেন, ‘বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, নারী চালকরা সাধারণত বেশি ধৈর্যশীল ও নিরাপদভাবে গাড়ি চালান। তাদের দুর্ঘটনার হারও তুলনামূলক অনেক কম।’ এই বাস্তবতাকে পুঁজি করে ব্র্যাক নারী চালক তৈরির এই চ্যালেঞ্জিং উদ্যোগ গ্রহণ করে।
এ প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, নির্বাচিত নারীদের প্রশিক্ষণের জন্য কোনো অর্থ ব্যয় করতে হয় না। তিন মাসের আবাসিক প্রশিক্ষণ, থাকা-খাওয়া, লাইসেন্স ফিসহ সব খরচ বহন করে ব্র্যাক। প্রশিক্ষণ শেষে তারা অভিজ্ঞ চালকদের সঙ্গে ইন্টার্নশিপের সুযোগ পান, যা এই চালকদের বাস্তব ট্রাফিক পরিস্থিতিতে দক্ষ করে তোলে।
এতে চ্যালেঞ্জও কম নয়। নারী চালক বর্ষা জানান, রাস্তায় বের হলে এখনও কটুকথা শুনতে হয়। জ্যামে আটকা পড়লে পুরুষ চালক বা পথচারীরা উঁকি দিয়ে দেখেন, চালক নারী নাকি পুরুষ। ‘মেয়েদের কাজ রান্নাঘরে, রাস্তায় কেন?’–এমন মন্তব্য এখনও তাদের শুনতে হয়। তবে এসব এখন আর তাদের মনোবল ভাঙতে পারে না।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, নতুনদের কর্মসংস্থান। প্রশিক্ষণ থাকলেও অভিজ্ঞতার অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন নারী চালকদের নিয়োগ দিতে চায় না। ফলে অনেকেই হতাশ হয়ে পেশা ছেড়ে দেন। এ প্রসঙ্গে বর্ষা বলেন, ‘চাকরি না দিলে অভিজ্ঞতা হবে কীভাবে? আমাদের সুযোগ দিতে হবে। অন্তত এক বছর কোথাও কাজের সুযোগ করে দিলে প্রশিক্ষিত নারী চালক অনেকেই ঝরে পড়বেন না।’
এই প্রকল্পে অংশগ্রহণের জন্য নারীদের কঠোর বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। নির্দিষ্ট বয়সসীমা, শারীরিক সুস্থতা (মেডিক্যালি ফিট) এবং অভিভাবকদের লিখিত সম্মতি থাকা বাধ্যতামূলক। তবে যারা সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন বা ঝুঁকিতে আছেন, তাদের ক্ষেত্রে নিয়ম কিছুটা শিথিলযোগ্য।
ব্র্যাকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে–নারীদের মোটরসাইকেল কেনার জন্য স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা, নারীবান্ধব পরিবহন নীতি প্রণয়ন এবং নারী প্রশিক্ষক তৈরি করা। নির্বাচন কমিশনসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে নারী চালকের চাহিদা বাড়ছে, যা এই পেশার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়।
‘ফোর হুইলস টু ফ্রিডম’ শুধু নারীকে চালকের আসনে বসাচ্ছে না, এটি তাদের দিচ্ছে আত্মনির্ভরতা, চলাচলের স্বাধীনতা এবং একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। স্টিয়ারিং হাতে নারীরা প্রমাণ করছেন, সঠিক সমর্থন পেলে তারা শুধু গাড়ি নয়; নিজেদের জীবন এবং সমাজকেও সঠিক পথে চালিত করতে পারেন।