স্বর্ণকন্যা রূপকথার বিশ্বজয় রাশিয়ার মঞ্চে মুন্সিগঞ্জ থেকে মস্কো

আন্তর্জাতিক মঞ্চে আবারও সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াল বাংলাদেশ। লাল–সবুজের পতাকাকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেলেন মুন্সিগঞ্জের এক অদম্য মেধাবী তরুণী রূপকথা রায়। সুদূর রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত মর্যাদাপূর্ণ ‘ওপেন ইন্টারন্যাশনাল বায়োলজি অলিম্পিয়াড (ঙওইঙ)-২০২৬’–এ বিশ্বের নানা প্রান্তের বাঘা–বাঘা প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে স্বর্ণপদক ছিনিয়ে এনেছেন বাংলার এই দুরন্ত মেয়ে। রূপকথার এই বিশ্বজয় কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং এটি সমগ্র বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের অদম্য মেধা ও সম্ভাবনার এক জ্বলন্ত দলিল।

মুন্সিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সরকারি হরগঙ্গা কলেজের একাদশ শ্রেণির এই শিক্ষার্থী প্রমাণ করেছে, মেধা আর প্রবল ইচ্ছেশক্তি থাকলে যেকোনো অসাধ্যকেই সাধন করা যায়। গত ১৫ থেকে ২২ মে পর্যন্ত রাশিয়ার সিরিয়াস ফেডারেল টেরিটরিতে অনুষ্ঠিত এই মেগা প্রতিযোগিতায় জীববিজ্ঞানের জটিল সব তাত্ত্বিক গবেষণা, ল্যাব পরীক্ষা ও বায়োইনফরমেটিক্সে নিজের অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রেখেছে ।

​নাম তার রূপকথা। কিন্তু সে কোনো কল্পকাহিনীর রাজকন্যা নয়, বরং বাস্তব পৃথিবীর এক লড়াকু সৈনিক। যে নিজের মেধা আর শ্রম দিয়ে বাস্তবেই এক রূপকথা সৃষ্টি করেছে। রাশিয়ার তীব্র শীত আর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার স্নায়ুচাপ কোনো কিছুই দমাতে পারেনি এই মফস্বল থেকে উঠে আসা মেয়েটিকে। জীববিজ্ঞানের জটিল সব সমীকরণ আর ল্যাবরেটরির গবেষণায় নিজের মেধার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে সে বিশ্বমঞ্চে ছিনিয়ে এনেছে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট।

​মুন্সিগঞ্জের এক সাধারণ পরিবার থেকে বিশ্বমঞ্চের এই যাত্রাটা মোটেও সহজ ছিল না। পর্যাপ্ত সুযোগ–সুবিধার অভাব, আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরির অনুপস্থিতি কিংবা নানাবিধ সীমাবদ্ধতা, কোনো কিছুই রূপকথার স্বপ্নের পরিধিকে ছোট করতে পারেনি। দিন–রাত এক করে মোটা মোটা জীববিজ্ঞানের বইয়ের পাতায় বুঁদ হয়ে থাকা, অচেনা সব বৈজ্ঞানিক শব্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকা রহস্য উন্মোচনের যে তাড়না রূপকথার মধ্যে ছিল, আজ তারই চূড়ান্ত স্বীকৃতি মিলল এই স্বর্ণপদকের মাধ্যমে।

তবে রূপকথার সাফল্যের গল্পটা শুধুই ল্যাব বা বইয়ের পাতায় আটকে নেই! সে এক সত্যিকারের ‘অলরাউন্ডার’। সমপ্রতি জাপানে অনুষ্ঠিত মর্যাদাপূর্ণ ‘ইয়ুথ সামিট’–এ ফুল স্কলারশিপ নিয়ে বিশ্বের শীর্ষ ৩০ জন যুব প্রতিনিধির মধ্যে নিজের জায়গা করে নিয়েছে সে। এছাড়া মডেল ইউনাইটেড নেশনস (গটঘ)-এ ‘বেস্ট ডেলিগেট’ সহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার ঝুলিতে ইতিমধ্যেই জমা হয়েছে ৭টিরও বেশি পুরস্কার!

​যখন রাশিয়ার অলিম্পিয়াড মঞ্চে বাংলাদেশের নাম ঘোষণা করা হচ্ছিল এবং রূপকথা রায়ের গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হচ্ছিল সোনালী পদক, তখন কেবল একটি পদকই অর্জিত হয়নি, বরং বিশ্বের দরবারে আরও একবার প্রমাণিত হয়েছে, সুযোগ ও সঠিক পরিবেশ পেলে বাংলাদেশের তরুণরা যেকোনো বিশ্বমঞ্চ জয় করতে সক্ষম। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই যুগে রূপকথার এই সাফল্য দেশের হাজারো তরুণ–তরুণী, বিশেষ করে বিজ্ঞানমনস্ক মেয়েদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।

বিজ্ঞানের এই তুখোড় শিক্ষার্থী আবার সংস্কৃতির মঞ্চেও সমান উজ্জ্বল। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে উচ্চাঙ্গ সংগীত, নজরুল সংগীত, দেশাত্মবোধক গান এবং আবৃত্তিতে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। পড়াশোনার পাশাপাশি সে তার স্কুলের স্টুডেন্ট পার্লামেন্টের সভাপতি হিসেবেও সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছে।

​একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ তার খনিজ বা অর্থ নয়, বরং তার তরুণ প্রজন্মের মেধা। রূপকথা রায় আমাদের সেই অমূল্য সম্পদেরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মুন্সিগঞ্জের ধুলোবালি থেকে রাশিয়ার অলিম্পিয়াডের মঞ্চ, রূপকথার এই জয়যাত্রা প্রতিটি বাঙালির বুকে গর্বের হিল্লোল বয়ে এনেছে।

কৃষিবিদ প্রমিতা শিখা রায় এবং ব্যবসায়ী নবীন কুমার রায়ের সুযোগ্য কন্যা এই রূপকথা।

​অভিনন্দন রূপকথা রায়!

তোমার এই স্বর্ণালী সাফল্য বাংলাদেশের বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করুক। তোমার হাত ধরে বিশ্বমঞ্চে বারবার ধ্বনিত হোক বাংলাদেশের নাম, সগৌরবে উড়ুক লাল–সবুজের পতাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *