বাংলাদেশি পর্যটকের জন্য বিদেশ ভ্রমণ মানেই একসময় ছিল ভারত। তবে ভিসা জটিলতা এবং নতুন অভিজ্ঞতার খোঁজে এখন অনেকেই বিকল্প গন্তব্যের দিকে ঝুঁকছেন। অনেকেরই ধারণা, নেপাল, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা এবং ভিয়েতনাম ভ্রমণে অনেক খরচ হয়। একটু পরিকল্পনা করতে পারলে অল্প টাকায়ও ঘুরে আসা যায় দূর দেশে।
হিমালয়ের কোলে সবচেয়ে সাশ্রয়ী ভ্রমণ
নেপাল বাংলাদেশিদের জন্য আকাশপথে সবচেয়ে কাছের এবং কম খরচের গন্তব্য। এখানে বাংলাদেশি পর্যটকরা ‘সার্ক’ নাগরিক হিসেবে বিশেষ মর্যাদা ও ছাড় পেয়ে থাকেন।
ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু যাওয়ার জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এবং হিমালয় এয়ারলাইন্স সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করে। সময় লাগে মাত্র ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট। আগে থেকে টিকিট কাটলে রিটার্ন টিকিট ভাড়া সাধারণত ৩৩ থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে থাকে। তবে পিক সিজনে বা শেষ মুহূর্তে টিকিট কাটলে তা ৫৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
বাংলাদেশিদের জন্য নেপাল ভ্রমণের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ফ্রি ভিসা। বছরে প্রথমবার ভ্রমণে কোনো ভিসা ফি লাগে না। এস্তোনিয়া বা ভিয়েতনামের মতো দেশে যেখানে ভিসা ফি বাবদ ২৫-৫০ ডলার (তিন হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা) খরচ হয়, সেখানে নেপালে এই খরচ শূন্য। ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমেই ‘অন-অ্যারাইভাল’ ভিসা নেওয়া যায়।
কাঠমান্ডুর ‘থামেল’ এলাকা পর্যটকদের প্রধান কেন্দ্র। ব্যাকপ্যাকারদের জন্য ‘ইয়াকেটি ইয়াক’ বা ‘দ্য স্পার্কলিং টার্টল’-এর মতো হোস্টেলে প্রতি রাত মাত্র ৬-১৬ ডলারে (৭০০ থেকে ১,৯০০ টাকা) থাকার ব্যবস্থা আছে। পরিবারের জন্য তিনতারকা মানের হোটেল (যেমন–ম্যাগনিফিসেন্ট হোটেল) পাওয়া যায় রাতপ্রতি ২৮-৩৮ ডলারে (৩,৩০০ থেকে ৪,৫০০ টাকা)।
নেপালে বিদেশিদের জন্য টিকিটের দাম অনেক বেশি হলেও, সার্কভুক্ত দেশের নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশিরা বিশাল ছাড় পান। কাঠমান্ডু দরবার স্কয়ারে বিদেশিদের প্রবেশ মূল্য এক হাজার রুপি, কিন্তু বাংলাদেশিদের জন্য মাত্র ১৫০ রুপি (প্রায় ১৩৫ টাকা)। পতন দরবার স্কয়ারে বিদেশিদের প্রবেশ মূল্য এক হাজার রুপি, বাংলাদেশিদের ২৫০ রুপি। ভক্তপুর দরবার স্কয়ারে বিদেশিদের যেখানে এক হাজার ৮০০ রুপি দিয়ে টিকিট কাটতে হয়, সেখানে বাংলাদেশিদের ৫০০ রুপি খরচ করতে হয়।
চিকিৎসা ও শপিংয়ের স্বর্গরাজ্য
থাইল্যান্ড কেবল পর্যটন নয়, উন্নত চিকিৎসার জন্যও বাংলাদেশিদের প্রথম পছন্দ। ঢাকা থেকে ব্যাংকক রুটে থাই এয়ারওয়েজ, বিমান বাংলাদেশ, ইউএস-বাংলা এবং এয়ার এশিয়া ফ্লাইট পরিচালনা করে। প্রমোশন চলাকালে এয়ার এশিয়ার ভাড়া (রিটার্ন) ২৭ হাজার টাকার (২২৬ ডলার) নিচেও পাওয়া যেতে পারে।
ফুল সার্ভিসে ভাড়া ৩৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা। থাইল্যান্ডের হাসপাতালগুলোয় বাংলাদেশিদের জন্য দোভাষী এবং হালাল খাবারের ব্যবস্থা থাকে।
ব্যাংকক হসপিটালে ৩০ বছরের কম বয়সীদের জন্য ‘এসেন্স প্যাকেজ’ শুরু হয় ৫ হাজার ২০০ বাথ (প্রায় ১৮ হাজার টাকা) থেকে। ৪০-৫০ বছর বয়সীদের জন্য বিস্তারিত চেকআপ প্যাকেজ প্রায় ১৭ হাজার বাথ (৬০ হাজার টাকা)। বামরুনগ্রাদ হসপিটাল কিছুটা ব্যয়বহুল। এখানে বেসিক হেলথ স্ক্রিনিং প্যাকেজ শুরু হয় প্রায় ১২ হাজার বাথ থেকে। তবে জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য এটি এশিয়ার অন্যতম সেরা।
ব্যাংককের রাজপ্রাসাদ বা মন্দিরে প্রবেশের টিকিট বেশ চড়া এবং এখানে বাংলাদেশিদের জন্য কোনো ছাড় নেই। দ্য গ্র্যান্ড প্যালেসের প্রবেশ মূল্য ৫০০ বাথ (এক হাজার ৭৫০ টাকা)। ওয়াট ফো টিকিট ৩০০ বাথ (এক হাজার ৫০ টাকা)। ব্যাংককের শহরে ঘুরে দেখার মতো অনেক কিছু রয়েছে।
প্রকৃতির সান্নিধ্য ও সস্তায় চেকআপ
অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা কাটিয়ে শ্রীলঙ্কা এখন পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত সাশ্রয়ী। আবার অনেকেই জানেন না, শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে অবস্থিত ‘আসিরি হসপিটালস’ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সাশ্রয়ী ও উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্র। এখানে বেসিক হেলথ চেকআপ প্যাকেজ মাত্র ৩৯-৫৬ ডলারের (চার হাজার ৬০০ থেকে ছয় হাজার ৬০০ টাকা) মধ্যে পাওয়া যায়; যা থাইল্যান্ড বা ঢাকার অনেক হাসপাতালের চেয়েও কম।
নেপালের মতো শ্রীলঙ্কাও বাংলাদেশিদের টিকিটের দামে ছাড় দেয়। সিগিরিয়া রকে বিদেশিদের জন্য প্রবেশ মূল্য ৩৫ ডলার হলেও বাংলাদেশিদের জন্য ২০ ডলার (দুই হাজার ৪০০ টাকা)। আরও রয়েছে ক্যান্ডি টেম্পল; সেখানেও বাংলাদেশিদের জন্য রয়েছে বিশেষ ছাড়।
‘ফিটসএয়ার’ বর্তমানে ঢাকা-কলম্বো রুটে সবচেয়ে কম ভাড়ায় ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ভাড়া ৪০ হাজার টাকার আশপাশে থাকে।
ভিসা অনলাইনে সহজেই ‘ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশনে’ নেওয়া যায়। সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য ফি মাত্র ২০ ডলার (দুই হাজার ৪০০ টাকা)।
আধুনিক শহর ও পর্যটন
পরিবার নিয়ে ভ্রমণের জন্য মালয়েশিয়া খুবই আরামদায়ক। বিশেষ করে কুয়ালালামপুর শহরটি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও কেনাকাটার জন্য সেরা। চিকিৎসা খাতে মালয়েশিয়া এখন থাইল্যান্ডের শক্তিশালী প্রতিযোগী। গ্লেনিগেলস হাসপাতালে বেসিক হেলথ স্ক্রিনিং প্যাকেজ শুরু হয় মাত্র ৫৫১ রিঙ্গিত (প্রায় ১৪ হাজার টাকা) থেকে, যা ব্যাংককের তুলনায় বেশ সস্তা। কেপিজে হেলথকেয়ারে আরও কম খরচে মাত্র ১০০ রিঙ্গিত (দুই হাজার ৬০০ টাকা) থেকে সাধারণ স্ক্রিনিং শুরু হয়। পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের ৮৬ তলায় ওঠার জন্য টিকিট মূল্য প্রায় ৯৮-১২৭ রিঙ্গিত (দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার ৩০০ টাকা)। টিকিট দ্রুত শেষ হয়ে যায়। তাই অনলাইনে আগে কেনা বুদ্ধিমানের কাজ। এয়ার এশিয়া ঢাকা-কুয়ালালামপুর রুটে নিয়মিত ফ্লাইট চালায়। প্রমোশনে ভাড়া ৩০ হাজার টাকার নিচে পাওয়া সম্ভব।
কম খরচে রোমাঞ্চকর অভিযান
ভিয়েতনামে সরাসরি ফ্লাইট নেই। তবে সেখানে পৌঁছালে থাকা-খাওয়ার খরচ অবিশ্বাস্য রকমের কম। ঢাকা থেকে ব্যাংকক বা কুয়ালালামপুর হয়ে ভিয়েতনাম (হ্যানয় বা হো চি মিন) যেতে হয়। কানেক্টিং ফ্লাইটের কারণে ভাড়া সাধারণত ৫০ হাজার টাকার বেশি পড়ে। বাংলাদেশিরা অনলাইনে ২৫ ডলারে (তিন হাজার টাকা) ই-ভিসা করতে পারেন। এটি সাধারণত তিন থেকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে পাওয়া যায়।
ভিয়েতনামে রাস্তার পাশের সুস্বাদু খাবার (যেমন– ফো বা বান মি) মাত্র ১৫০-২৫০ টাকায় (১.৫-২.৫ ডলার) পাওয়া যায়।
বিশ্বখ্যাত হা লং বে-তে সারাদিনের ক্রুজ ট্রিপ (দুপুরের খাবারসহ) মাত্র ৪০-৫০ ডলারে (চার হাজার ৮০০ থেকে ছয় হাজার টাকা) উপভোগ করা যায়।
খরচের নিয়ম যখন সতর্কতা
ভুটান ভ্রমণে ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট ফি’ নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। ২০২৪ সালের নতুন নীতি অনুযায়ী, বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য এই ফি কমিয়ে প্রতি রাতে ১৫ ডলার (প্রায় এক হাজার ৮০০ টাকা) করা হয়েছে। অন্যান্য দেশের নাগরিকদের জন্য এটি ১০০ ডলার। তবে বছরে মাত্র ১৫ হাজার বাংলাদেশি পর্যটক এ সুবিধা পাবেন। ভ্রমণের আগে অবশ্যই অনুমোদিত হোটেলের মাধ্যমে আপনার কোটা এবং ফি নিশ্চিত হয়ে নিন। আকাশপথে (দ্রুক এয়ার) ভাড়া বেশি হওয়ায় বাই-রোডে ভারত হয়ে ভুটান ভ্রমণ অনেক সাশ্রয়ী।