হাতির পাহাড়

সারাদিন অফিস করে, অফিসে বসের একগাদা মুখ ঝামটা খেয়ে ঝুম বৃষ্টির মধ্যে রিকশা–সিএনজি কিচ্ছু না পেয়ে রাস্তায় নালার কাদা–পানির মধ্যে ছপাৎ ছপাৎ পা ডুবিয়ে ঘিনঘিন শরীর নিয়ে বিল্ডিংয়ের ঢোকার সময় দেখি সিঁড়ির পাশে রোমানা দাঁড়িয়ে আছে। ভাগ্যিস বাড়িওয়ালাদের বাসার সামনে বেশকিছু বাগানবিলাস, মধুমঞ্জরী, হাস্নাহেনা গাছ বড় হয়ে জায়গাটায় কিছুটা আড়াল তৈরি করেছে। রোমানাকে দেখে আমার কলিজা ছ্যাঁৎ করে ওঠার অবস্থা হয়। হঠাৎই মনে হলো আজ বুঝি আর নিস্তার নেই। পড়বি তো পড়বি একেবারে মালীর ঘাড়ে’র মতো বেকায়দা অবস্থা আমার। আমি চোখের পলকেই গাছের পাশ দিয়ে ঘুরে দাঁড়াই যেন রোমানা কিছুতেই আমাকে দেখতে না পায়।

এতক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজে আসার সময় আমি স্বপ্ন দেখছিলাম বাসায় গিয়েই একটু খিচুড়ি রান্না করবো। ফ্রিজে ডিম আছে। বেগুন থাকলেও ভালো হতো। বয়ামে আমের আচার আছে। বাসার সামনে রুবেলের সবজির দোকান থেকে ক্ষিরা আর টমেটো কিনে নিয়ে বেশি করে কাঁচামরিচ দিয়ে ঝাল–ঝাল করে সালাদ বানাবো। খিচুড়ি খাওয়া শেষে আবার নতুন কেনা খয়েরি রঙা সিরামিকের মগটাতে ধোঁয়া ওঠা গরম চা নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বৃষ্টি বিলাস করবো।

মাসের বেতনের টাকাটা একাউন্টে জমা হওয়ার ম্যাসেজ পেয়ে ব্যাংকে গিয়ে লাইন ধরে সেই টাকা তুলে আনার আনন্দটা রোমানাকে দেখে পুরাই মাটি হয়ে যাওয়ার যোগাড়। কী পাগল একটা মেয়ে। সমাজ বদলে দেবে! সমাজ যেন বাচ্চার হাতে মুড়ির মোয়া। বেছে বেছে এরকম পাগলদের সাথে কেন আমার দেখা হয়, আমি বুঝি না। কোন জন্মের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছি তাও বুঝি না। টাকাগুলো ব্যাগেই আছে। আমি আরও সাবধানী হই যেন রোমানা আমাকে দেখতে না পায়। অনেকটা বিড়ালের মতো নিঃশব্দে লুকিয়ে থাকি আমি।

হঠাৎ কি হয় কে জানে আমার সামনে দিয়ে বিশাল এক হাতি হেঁটে চলে। ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে আসে। হাতির উপরের দিকে তাকাতেই দেখি মাহুতের জায়গায় রোমানা বসে আছে। তার বসার জায়গাটা বেশ রাজকীয়। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রোমানা কীভাবে আমাকে দেখতে পেল আমি জানি না, সে তারস্বরে চিৎকার করে ডাকতে লাগলো–মোনা, এই মোনা, এই যে আমি হাতির উপরে বসে আছি। তাকাও, দেখো আমাকে। আমি উপরে তাকাতে গিয়ে মনে মনে বলছিলাম, বদ মাইয়া, তোর অত্যাচারে আমি নিজের ঘরে পর্যন্ত ঢুকতে পারছি না, তুই আবার হাতির খেলা দেখাতে এসেছিস আমাকে।

মুখে অবশ্য কিছুই বলিনি। আসলে আমি বলতে পারি না। শুধু এক “না” বলতে পারার মাশুল যে আমাকে কতভাবে দিতে হয়েছে! এখনো দিতে হচ্ছে। আমি নিশ্চিত যে আগামীতেও দিতে হবে। আমি কিছু না বলে রোমানাকে দেখছিলাম। ভাবছিলাম ও অভিজ্ঞ মাহুতের মতো এত বড় হাতিটাকে সামলাচ্ছে কীভাবে! হাতি যদি বিগড়ে যায়!

ঠিক তখনই আকাশে তুমুল গর্জন করে আবার ঝরঝরিয়ে বৃষ্টি পড়া শুরু হলো। রোমানা আমাকে ডেকে বললো, মোনা, চলে আয়। আমার হাত ধর। উপরে উঠে আয়। তোকে নিয়ে আমি ভুটান যাবো।

আমি অবাক হচ্ছিলাম, হাতিতে চড়ে ভুটান যাবো! হাতিতে চড়ে ভুটান যাওয়া যায়! যদিও মুখে কিছু বলিনি।

বিরক্তও হচ্ছিলাম আমি। কারণ রোমানা আমাকে তুই তোকারি করছিল। ওর সাথে তুই তোকারি পর্যায়ের বন্ধুত্ব না। আসলে ওর সাথে আমার কোনো প্রকারেরই বন্ধুত্ব না। ও আমার বান্ধবী নিতুর পরিচিত। নিতুর মাধ্যমেই একদিন আমার সাথে পরিচয় হয়। সেই পরিচয় আমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইদানীং আমার অবস্থা এমন হয়েছে আমি চাকরির বেতনটা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রথমেই রোমানার কথা মনে পড়ে। কারণ ঠিক সেদিনই হয় রোমানা আমাকে ফোন দিবে। না হলে স্বশরীরে আমার অফিসে এসে উপস্থিত হবে। সে দেশ উদ্ধার করবে। সাথে আরও দু’চারজন পাগল জুটিয়ে ফেলেছে। আমাকেও পাগলের দলভুক্ত করতে অনেক কসরত করেছিল। কিন্তু পাগলের দলে যোগ না দিয়ে আমি যোগ দিয়েছি আহম্মকের দলে। মানুষ পাওনাদার দেখলে পালিয়ে–পালিয়ে বেড়ায়, আর আমার এমন কপাল আমি রোমানাকে দেখলে পালিয়ে বেড়াই। কারণ রোমানার কাছ থেকে আমি টাকা পাই। আমার ধারের টাকা তো শোধ করার কথা তার মনেই নাই। ইদানীং হয়েছে আমাকে দেখলেই তার মনে পড়ে তাকে সমাজসেবা করতে হবে এবং সমাজসেবার টাকা আমার থেকে খসাতে হবে।

এই ঘোর বৃষ্টির মধ্যে ও এখনো হাতির উপরে বসে আছে, হাতিটাও যেন ওর হাতের ইশারায় বশীভূত হয়ে গেছে। এই অবস্থায় বলছে, মোনা চল এখনই ভুটানে রওনা দেই। জানিস তো ভুটানে অন এ্যারাইভ্যাল ভিসা দেয়। তুই আজকে বেতন পেয়েছিস না, টাকাগুলো নিয়ে চল। জীবনে কী আর আছে বল, টাকা পয়সা নিয়ে কি মানুষ কবরে যাবে! টাকা আয় করার উদ্দেশ্যই হলো খরচ করা। কিন্তু খরচ করাটাই হচ্ছে কঠিন বিষয়। কারণ টাকাটা আসলে কীভাবে–কোথায় খরচ করলে টাকা উপার্জনের আসল উদ্দেশ্য সার্থক হবে এটাই সবাই জানে না।

আমি বৃষ্টির মধ্যে কাকভেজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ভাবি কীভাবে রোমানার চোখের সামনে থেকে হাওয়া হয়ে যাওয়া যায়। রোমানাকে রীতিমতো ভয় পাচ্ছি আমি। আমি আজ বেতন পেয়েছি। নিশ্চিত রোমানা ছোঁ মেরে আমার ব্যাগটা ছিনিয়ে নিবে।

রোমানা ডাকছে–মোনা, ভুটানের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটার নাম জানিস তো! পারো। পাহাড়ের রাজ্যে পারো। তোকে নিয়ে আমি পারোর পাহাড় জয় করবো। পাহাড়ের আসল সৌন্দর্য দেখা যায় বর্ষায়।

আমি ভাবছিলাম পাহাড় দেখার জন্য ভুটানে যাওয়ার কি দরকার! আমাদের বান্দরবান আর খাগড়াছড়ির পাহাড়ে গেলেই তো হয়। রোমানা বললো, তোকে আমি হাতির পাহাড় দেখাবো। হাতির পাহাড় দেখেছিস? পাহাড় জুড়ে সব হাতি। ওখানে হাতিরা ওড়ে, খায়, ঘুমায়…

আমি ভাবছিলাম, হাতি আবার উড়তেও পারে! আর হাতির পাহাড়টাই বা কোথায়! কিন্তু যথারীতি মুখে কোনো কথা ছিল না আমার।

রোমানা বললো, আমার চোখের ভেতর তাকা। ভালো করে দেখ। ওখানে একটা পাহাড় আছে। পাহাড়ে কত হাজার হাজার কলা গাছ, দেখেছিস! কলা হাতির প্রিয় খাবার তো, তাই পাহাড় জুড়ে সব কলা গাছ! কাঠ গাছও আছে। বুনো ফুলের ঘ্রাণ পাচ্ছিস! মাতাল করা ঘ্রাণ! গাছের সবুজের সাথে একাকার হয়ে পাহাড়টা কেমন সবুজের আধার হয়ে আছে, দেখ। ভালো করে দেখ ওখানে অনেকগুলো হাতি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য…

রোমানা আরও কি কি বলে যাচ্ছিলো আমি শুনতে পারছিলাম না।

আমার মনে হচ্ছিলো আমি পাগলের প্রলাপ শুনছি। অতি ভয়ে কালবিলম্ব না করে দিলাম আমি ভোঁ দৌড়।

আশ্চর্য, রোমানার হাতিটাও দৌড়াচ্ছে আমার পেছনে পেছনে। কলিজা কেঁপে ওঠে আমার। হঠাৎ আমার মনে হলো আমি হাতির পায়ের নিচে লেপ্টে গেছি। নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। আমি বোধহয় মারা যাচ্ছি।

চোখ মেলে দেখি ঘামে আমার সারা শরীর ভিজে চুপচুপ হয়ে আছে। মাথার উপর ফ্যান বন্ধ। মনে হচ্ছে কারেন্ট নেই অনেকক্ষণ ধরে। আইপিএসের চার্জও বোধহয় শেষ। এত গরম লাগছে! রাত ক’টা বাজে তাও বুঝতে পারছি না। মোবাইলটা হাতের কাছেই ছিল, এখন দরকারের সময় গায়েব। পুরা জীবনটাই আমার গায়েব হয়ে গেলে ভালো হতো। এরপর কখন ঘুম এলো আর মনে নেই।

সকালবেলা অফিস যাওয়ার আগেই রোমানার ফোন। কোনো সৌজন্যকথার ধারেকাছে না গিয়ে খুব নির্লিপ্তভাবে বললো–মোনা, অফিসে আসবো বিকালে, হাজার দশেক টাকা রেখো।

আমি একটা কথাও বলতে পারলাম না। রোমানা মোবাইলের লাইন কেটে দিতেই আমি ঠিক করলাম আজ অফিসেই যাবো না। অনেক ছুটি জমে আছে। আজ ছুটি কাটাবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *