কোরবানি : একাল-সেকাল

পিতা হযরত ইব্রাহীম (আলাইহিস্‌ সালাম) যখন আরবের মাটিতে আল্লাহর তৌহিদের বাণী প্রচার করতেন, তখন তাকে সহ্য করতে না পেরে ইহুদী–মুশরেকরা অবর্ণনীয় কষ্ট দেয়া শুরু করলো। মুশরেকরা সিদ্ধান্ত নিলো তাঁকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপে পুড়িয়ে মারবে, নাউযুবিল্লাহ)। একসময় মুশরেকের দল হযরত ইব্রাহীম (আলাইহিস সালাম)’কে বলল, আপনি যদি আল্লাহর নবী হন, তাহলে পরীক্ষা দিতে হবে। তিনি তাতে রাজী হলেন এবং তাঁকে অগ্নিকুণ্ডে ফেলে দেয়া হলো। তখন আল্লাহর তরফ হতে এক আয়াত নাযিল হলো যার অর্থ ‘হে আগুন ইব্রাহীমের জন্য শান্তিদায়ক হয়ে যাও। সাথে সাথে অগ্নিকুণ্ডের স্থানটি ফুলের বাগানে পরিণত হলো। আল্লাহর ইচ্ছায় পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হলেন। বৃদ্ধ অবস্থায় তাঁর ঔরশে হযরত ইসমাইল (আলাইহিস সালাম)’র জন্ম। যখন তিনি বুঝদার কিশোর হন। তখন তাঁর পিতা ইব্রাহীম (আলাইহিস সালাম) কে আল্লহর তরফ হতে তিনবার স্বপ্ন দেখানো হয়। পিতা পুত্রকে বলেন, ‘আমি স্বপ্নে দেখেছি কোরবানি দিচ্ছি, সুতরাং আপনার মতামত পেশ করবেন।’ এ কথা শুনে পুত্র ইসমাইল (আলাইহিস সালাম) খুশি হয়ে মুহূর্তের মধ্যে রাজি হয়ে যান। এরপর পিতাকে বিনয়ী অনুরোধে বললেন, আব্বাজান আপনি যখন আমাকে কোরবানি দিতে শেষ প্রস্তুতি নেবেন, তখন আমার হাত–পা বেঁধে দেবেন। এ কারণে গলায় ছুরি দেবার পর যখন ছটপট করবো হাত–পা নাড়াবো, হয়তো আপনার শরীর মোবারকে লাগতেও পারে যেটা বেয়াদবি হবে এবং হাশর ময়দানে লজ্জিত হবো। আর আমার চোখ বেঁধে উপুর করে শোয়াবেন। যাতে আমার চেহারাটা দেখে বা চোখাচোখির কারণে আপনার মায়া হবার সুযোগ না থাকে। তারপর যখন গলায় ছুরি বসানোর পালা–তখন আল্লাহর ইচ্ছায় হঠাৎ মেঘ হয়ে উড়ে আসে কোরবানীর জন্য এক দুম্বা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ নবীর উপর খুব খুশি হলেন এবং তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আলাইহিস সালাম) –এর পরিবর্তে কোরবানি হলো দুম্বা। সে সময় থেকে সমর্থবান মুসলিমদের জন্য প্রতিবছর কোরবানি দেয়া ওয়াজিব হয়েছে। উল্লেখ্য, হযরত আদম (আঃ) এর জামানায় তাঁদের ঔরশজাত সন্তানদের ( ছেলে/মেয়ে) মধ্যে শাদী (বিয়ে) হতো। তেমনি বাবা আদমের দুই ছেলে ‘হাবিল’ ও ‘কাবিল’ এর সাথে আল্লাহ পাকের ইশারায় আদম (আঃ) এর নির্দেশে হাবিল এর জন্য আকলিমা ও কাবিলের জন্য লেউদা কে বিয়ের সিদ্ধান্ত্ত চুড়ান্ত হয়। হাবিল এর জন্য নির্ধারিত আকলিমা সুন্দরী ছিলেন এবং কাবিলের জন্য লেউদা কুৎসিত ছিলেন। কাবিল আকলিমাকেই বিয়ে করতে জোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তখন আদম (আঃ) পুনঃ নির্দেশ দিলেন তোমাদেরকে কোরবানি দিতে হবে, যার কোরবানি আল্লাহর দরবারে কবুল হবে সেই আকলিমাকে বিয়ে করবে। দুজনেই কোরবানি সম্পন্ন করেন। হাবিলের কোরবানি কবুল হয়। কাবিলের কোরবানি কবুল হয় নি। এটাই ছিল প্রথম কোরবানি।

কোরবানির সেকাল: প্রায় তিপ্পান্ন বছর আগে দেখা। তখন কোরবানি ঈদ আসার ১৫/২০ দিন আগে থেকে গৃহকর্তা হাট বাজার হতে মরিচ, হলুদ, ধনিয়া, ঝিরা, গরম মসলা ক্রয় করে মজুত রাখতো। চাউলের রুটি তৈরির জন্য চাউল ধুয়ে শুকায়ে কল হতে মিলিং করে রাখতো। প্রায় ১০ দিন আগে দা, ছুরি, বটি কামারের দোকানে সান দেয়া হতো। জিলহজ্জ্ব মাসের চাঁদ দেখার পর হতে গরু ছাগলের বিভিন্ন হাট বাজারে সখের বশে বা সুবিধা দরে কেনার জন্য মানুষের আনাগোনা বেশ দেখা যেতো। কিছু পরিবারের শিশু–কিশোরদের হাটে যাবার বায়না থাকতো। কিছু শিশু হারিয়ে গেলে মাইকিং–এর ৪/৫ ঘণ্টা পর আবার পাওয়াও যেতো। তখন এলাকা ভিত্তিক নির্ধারিত কিছু গরু–ছাগলের হাট বসতো। কেউ চারদিন আগে কেউ দুদিন আগে কোরবানির পশু কেনার কাজ সেরে ফেলতো। সে সময় গ্রাম বাদে শহরের প্রাণকেন্দ্রের সকলের ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ ছিলো না। সামর্থবান কিছু মানুষের বাড়িতেই বিদ্যুৎ ব্যবহার হতো। চন্দ্র মাসের নয় তারিখ দিবাগত রাতে ময়দার রুটি পরটা বানানোর জন্য (১নম্বর ডালডা সহকারে) নিজ পরিবারের সদস্য ছাড়াও পাড়ার সক্ষম পুরুষরা বাড়ির উঠানে সারারাত জেগে পরটা তৈরির কাজ শেষ করতো। পুরো বাড়ি ছাড়াও ১০০ ওয়ার্টের দুটি বাল্বের আলোতে পাড়া আলোকিত থাকতো। কোরবানী দাতা–হুজুর বা নিজে পশুর গলায় ছুরি দেয়ার আগ পর্যন্ত কোন আহার করতো না। পশু জবাইয়ের সাথে সাথে ছটফট করা অবস্থায় লোটা (বদনা)/ বালতি দ্বারা মাথায় পানি ঢালা হতো। মাংস কাটা শেষে তিন ভাগ করে এক ভাগ আত্মীয়, এক ভাগ কোরবানিদাতা অপর ভাগ গরীব, দুঃখী পরিবারের জন্য। এর কিছু সময় আগে পশুর সকল অংশ থেকে অল্প অল্প মাংস নিয়ে ফাতেহার জন্য রান্না শেষে মেহনতকারীসহ পরিবারের লোকজন দুপুরের খাবার সেরে মেহনতকারীর হাতে সাধ্যমত কিছু টাকা প্রদান করা হতো। কোরবানির একাল: আগের মত আর্থিক অনটন আছে তেমন বলা যাবে না। প্রতি পাড়ার অধিকাংশ মানুষ কোরবানি দিতে সক্ষম হয়। প্রায় প্রতিদিনই নগর– গঞ্জের কোন না কোন স্থানে কোরবানির পশুর হাট বসে। বাড়িতে পরটা তৈরি হয় না বললেই চলে। চা–দোকান বা বেকারীতে দুদিন আগে বাকরখানি, নানরুটি, পরটার অর্ডার করা হয়। তবে কিছু কিছু পরিবারে অন্তত ৫/১০ কেজি চাউলের রুটি তৈরি হয়। বর্তমানে যে হারে হার্টের অসুখ বা অধিক কোলেস্ট্রেরল দেহে জন্ম নিয়েছে, সে হারে কোরবানি দাতাদের মাংসের পরিমাণ কম খেতে দেখা যায়। তাড়াহুড়া করে দা, বটি, ছুরি মাত্র দুদিন আগেই সান দেয়া হয়। জবাইকৃত পশুর চামড়া ক্রেতার সংখ্যাও প্রচুর ছিল। অনেক সময় ক্রেতা–বিক্রেতার মনোমালিন্য হয়। বর্তমানে এমনও দেখা যায়– শিশুদের সান্তনা ও সামাজিক লজ্জার কারণে সামর্থ না থাকলেও ধার–কর্জ করে আমরা কোরবানি দিই ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *