অসহায় শৈশব, মহামারি আর পাশবিকতার যাঁতাকলে সমাজ কি তবে পচে গেছে?

​বাংলাদেশে সামপ্রতিক সময়ে সংবাদপত্রের পাতা খুললেই বুক কেঁপে ওঠে। একদিকে হাম আর নিউমোনিয়ার মতো ঘাতক ব্যাধি কেড়ে নিচ্ছে অগণিত শিশুর প্রাণ। হাসপাতালের বারান্দায় অক্সিজেনের জন্য শিশুদের হাঁসফাঁস আর মা–বাবার আর্তনাদে আকাশ–বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে নিউমোনিয়ার প্রকোপ এতটাই বেড়েছে যে, অনেক হাসপাতালে শয্যা সংকটে মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে শিশুদের। চিকিৎসকরা বলছেন, সময়মতো টিকা না নেওয়া এবং পুষ্টির অভাব এই মৃত্যুহার বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণ।

নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত আইসিইউ বা ভেন্টিলেশন সুবিধা এখনো প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। প্রাথমিক অবস্থায় সর্দি–কাশিকে অবহেলা করায় অনেক শিশু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছে। নেবুলাইজেশন আর অ্যান্টিবায়োটিকের লড়াইয়ে যখন একটি শিশু মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই সমাজকে গ্রাস করছে আরেক ভয়ঙ্কর মরণব্যাধি।

সেই ব্যাধিটি হলো পাশবিক লালসা এবং পৈশাচিক জিঘাংসা। যে শিশুটিকে আমরা নিউমোনিয়া বা পক্সের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করছি, রাত জেগে সেবা করছি, সেই শিশুটিই অকালে প্রাণ হারাচ্ছে কোনো এক কামোন্মত্ত পশুর হাতে। একদিকে ভাইরাস–ব্যাকটেরিয়ার সাথে লড়াই, আর অন্যদিকে সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা পিশাচদের ভয়াল থাবা।

এ আমােেদর জাতীয় লজ্জা।

​পরিসংখ্যান বলছে, দেশে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা। এমনকী এক বছরের অবুঝ শিশুটিও রেহাই পাচ্ছে না। প্রশ্ন জাগে, এই বিকৃত মানসিকতার মূল কোথায়। কেউ কেউ নারীর পোশাক বা চলনবলনকে দায়ী করে দায় এড়াতে চান। কিন্তু সমাজের কাছে প্রশ্ন, সেই এক বছরের শিশু বা বোরকাআবৃত নারীটি যখন লাঞ্ছিত হয়, তখন কোন অজুহাত দেবেন? মূলত শালীনতা বা পোশাক নয়, বরং বিকারগ্রস্ত মনমানসিকতা, মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় এবং সুস্থ দৃষ্টিভঙ্গির অভাবই এই অপরাধের প্রধান কারণ। ​এর সাথে যুক্ত হয়েছে ইন্টারনেটের অপব্যবহার। অবাধ পর্নোগ্রাফি, ইউটিউবে শরীর উত্তেজক বিজ্ঞাপনের রমরমা ব্যবসা এবং পর্নো সাইটগুলোর সহজলভ্যতা তরুণ ও যুবসমাজকে ধ্বংসের কিনারে ঠেলে দিচ্ছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়া। অপরাধীরা যখন দেখে ক্ষমতার দাপটে বা আইনি ফাঁকফোকরে পার পাওয়া সম্ভব, তখন তাদের আস্পর্ধা আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে।

​একটি বিষয় আজ গুরুত্বের সাথে ভাববার সময় এসেছে। অতীতে আমাদের সমাজে আরিচা ঘাট, দৌলতদিয়া, কান্দুপট্টি বা টানবাজারের মতো নির্দিষ্ট কিছু জায়গা বা রেড লাইট ডিস্ট্রিক্ট ছিল। সেখানে পেশাদার যৌনকর্মীরা কাজ করতেন। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর একটি দিক ছিল এই যে, যাদের তীব্র যৌন চাহিদা বা বিকৃতি থাকতো, তারা নির্দিষ্ট সেই জায়গাগুলোতে যেত। ফলে সাধারণ নারী বা শিশুদের ওপর আক্রমণের ঝুঁকি কিছুটা হলেও কম থাকতো। বর্তমানের এই অরাজক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে পুনরায় এই বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখার আহ্বান জানাই। কারণ অনেকে চাকরির কারণে ছুটিছাটা কম পান। তাঁরা সময় কাটায় নানারকম পর্ণ ভিডিও দেখে। এদের শরীরেরও চাহিদার দাবি রাখে। নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক এই ব্যবস্থা পুনরায় চালু করলে হয়তো সাধারণ মানুষ এই লম্পট ও কামার্তদের হাত থেকে কিছুটা নিষ্কৃতি পেতে পারে।

​আজকের বাংলাদেশে অনাহারে, দুর্ঘটনায় যত মানুষ মারা যায়, তার চেয়ে ঢের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে চলন্ত বাসে বা নির্জনে পাশবিকতার শিকার হয়ে। একটি ধর্ষণের বিচার শেষ হতে না হতেই আরেকটি লোমহর্ষক খবর সামনে আসছে। মাদ্রাসা থেকে শুরু করে পরিবহন খাত, কোথাও আজ আমাদের কন্যারা নিরাপদ নয়। শুধু কন্যা নয়, ৫০/৬০ বছরের নারীও রেহাই পাচ্ছে না। বাবা–ভাই কাছের লোকজনের দ্বারাই অনেকে এই ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। প্রতিদিনের পত্রিকার পাতায় এই ভয়াবহতার খোঁজ মেলে।

শিশুরাই আমাদের আগামীর ভবিষ্যৎ এবং একটি সুন্দর সমাজের ভিত্তি। তাদের সরল শৈশবকে ক্ষতবিক্ষত করার অধিকার কারো নেই। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, পবিত্র আমানত হিসেবে যাদের কাছে শিশুদের সোপর্দ করা হয়, সেই মানুষরূপী কিছু পশুর হাতেই আজ কোমলমতি কন্যাশিশুরা লালসার শিকার হচ্ছে।

​মাদ্রাসার এক কন্যা শিশুর সাথে সমপ্রতি ঘটে যাওয়া এই পাশবিক এবং অমানবিক ঘটনা আমাদের স্তব্ধ করে দিয়েছে। যে নৈতিকতা ও ধর্মীয় শিক্ষার কথা বলে তাকে সেখানে পাঠানো হয়েছিল, তার বিপরীতে এমন ঘৃণ্য অপরাধ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

​সরকারের প্রতি আকুল আবেদন, কেবল রোগমুক্ত করলেই হবে না, আমাদের সন্তানদের এই মানুষরূপী পশুদের হাত থেকেও বাঁচাতে হবে। প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মাধ্যমে বিকল্প সংস্থানের কথা ভাবুন, তবুও যেন কোনো মাদ্রাসার শিক্ষক, বাসের ড্রাইভার, হেলপার, দারোয়ান কিংবা কোনো প্রভাবশালী নেতার লালসার শিকার হয়ে আর কোনো বোন বা সন্তানের নিথর দেহ রাস্তায় পড়ে না থাকে। এই পচনশীল সমাজকে রক্ষা করতে কঠোর আইন এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই।

অপরাধীকে দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, সেটি মাদ্রাসা হোক কিংবা স্কুল আমাদের শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ, ভীতিহীন এবং মর্যাদাশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

​আমাদের শিশুরা আজ কোথাও নিরাপদ নয়, না হাসপাতালের বিছানায়, না নিজের চেনা আঙিনায়। এই দ্বিমুখী মরণব্যাধি থেকে আমাদের শৈশবকে রক্ষা করার দায় এখন কার?

আর কোনো শিশুর শৈশব যেন এভাবে অন্ধকারের অতলে হারিয়ে না যায়। সকল প্রকার অমানবিকতার বিরুদ্ধে আমাদের এই সোচ্চার অবস্থান জারি থাকবে।​ শিশুরাই আমাদের আগামীর ভবিষ্যৎ। তাদের শৈশবকে ক্ষতবিক্ষত করার অধিকার কারো নেই।

​আসুন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই। কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় আওয়াজ তুলি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *