মার্থা গেলারহর্ন: যে সাংবাদিক নিজের পরিচয় নিজেই লিখেছিলেন

যুদ্ধের সংবাদ মানেই ধ্বংসস্তূপ, পরিসংখ্যান, নিহতের সংখ্যা কিংবা সামরিক কৌশল–এমন ধারণা বহুদিনের। কিন্তু একজন সাংবাদিক দেখিয়েছিলেন, যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গল্পটি আসলে মানুষের। সেই সাংবাদিকের নাম মার্থা গেলারহর্ন।

বিশ্বসাহিত্যে অনেকেই তাঁকে একসময় আরেকটি পরিচয়ে চিনতেন–খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের স্ত্রী হিসেবে। কিন্তু গেলারহর্ন নিজেই এই পরিচয়ের বিরুদ্ধে ছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তিনি লেখক ছিলেন, সাংবাদিক ছিলেন; কারও স্ত্রী হওয়াই তাঁর পরিচয়ের কেন্দ্র হতে পারে না। এই দৃঢ় অবস্থানই তাঁর জীবনকে আলাদা করে।

বিশ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ–সংবাদদাতা হিসেবে মার্থা গেলারহর্ন স্পেনের গৃহযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ফিনল্যান্ড, চীন, ভিয়েতনাম, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য আমেরিকাসহ পৃথিবীর নানা সংঘাত নিজের চোখে দেখেছেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু বছর পরও তিনি থেমে থাকেননি। আশির দশকেও তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে গেছেন, মানুষের জীবন দেখেছেন, লিখেছেন।

তবে তাঁর লেখার বিশেষত্ব ছিল অন্য জায়গায়। তিনি যুদ্ধের নায়কদের নয়, সাধারণ মানুষকে খুঁজতেন। একটি শহর ধ্বংস হলে সেনাপতির ভাষণের চেয়ে তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেই মায়ের গল্প, যিনি সন্তানকে নিয়ে আশ্রয় খুঁজছেন; কিংবা সেই বৃদ্ধ, যিনি নিজের বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে রাজি নন। গেলারহর্ন বিশ্বাস করতেন, ইতিহাস কেবল রাষ্ট্রনায়কেরা লেখেন না; সাধারণ মানুষের জীবনও ইতিহাসের অংশ।

এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে অন্যদেও থেকে আলাদা করেছে। তিনি যুদ্ধকে কখনো রোমাঞ্চকর করে তোলেননি। বরং যুদ্ধের মূল্য যে সাধারণ মানুষকে দিতে হয়, তাঁর লেখায় বারবার সেই সত্য ফিরে এসেছে। যুদ্ধের খবরকে তিনি মানবিক অভিজ্ঞতায় রূপ দিয়েছিলেন।

১৯৪৪ সালে নরম্যান্ডি অভিযানের সময় নারী সাংবাদিকদের অনেক সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়েছিল। গেলারহর্ন সেই বাধা মেনে নেননি। একটি হাসপাতাল জাহাজে লুকিয়ে তিনি ইউরোপে পৌঁছান এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রতিবেদন পাঠান। ঘটনাটি আজও সাংবাদিকতার ইতিহাসে সাহসিকতার এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে স্মরণ করা হয়। তাঁর কাছে নিয়ম ভাঙার উদ্দেশ্য ছিল না আলোচনায় আসা; উদ্দেশ্য ছিল ঘটনাস্থলে পৌঁছে সত্যকে প্রত্যক্ষ করা।

মার্থা গেলারহর্নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো স্বাধীনতা। তিনি কখনোই চাননি তাঁর কাজ কোনো বিখ্যাত মানুষের পরিচয়ের আড়ালে ঢাকা পড়ুক। হেমিংওয়ের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পরও তিনি একই নিষ্ঠায় লিখে গেছেন। বরং সময়ের সঙ্গে তাঁর সাংবাদিক পরিচয়ই আরও উজ্জ্বল হয়েছে।

আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধক্ষেত্র শুধু বন্দুকের নয়; শরণার্থী সংকট, জলবায়ু বিপর্যয়, দুর্ভিক্ষ কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও সাংবাদিকদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। গেলারহর্নের কাজ মনে করিয়ে দেয়, সংবাদ কেবল ঘটনার বিবরণ নয়; মানুষের অভিজ্ঞতাকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরারও দায়িত্ব।

তাঁর লেখার ভাষা ছিল সংযত। অতিনাটকীয়তা ছিল না, অপ্রয়োজনীয় আবেগও নয়। কিন্তু সেই সংযমের মধ্যেই পাঠক বুঝতে পারতেন যুদ্ধের নির্মমতা। একজন দক্ষ সাংবাদিক কীভাবে তথ্য, পর্যবেক্ষণ এবং মানবিক সংবেদনশীলতার ভারসাম্য বজায় রাখেন, গেলারহর্ন তার উজ্জ্বল উদাহরণ।

ডিজিটাল যুগে আমরা প্রতিদিন অসংখ্য ছবি, ভিডিও এবং তাৎক্ষণিক খবর দেখি। তবু প্রশ্ন থেকে যায়–ঘটনার ভেতরের মানুষটিকে আমরা কতটা দেখি? মার্থা গেলারহর্নের সাংবাদিকতা সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে আনেন। তিনি শিখিয়েছেন, একজন প্রতিবেদকের সবচেয়ে বড় শক্তি কেবল দ্রুত খবর পাঠানো নয়; বরং যাদের কণ্ঠস্বর সাধারণত শোনা যায় না, তাদের গল্প বিশ্বকে শোনানো।

নারীর ক্ষমতায়নের আলোচনায় মার্থা গেলারহর্নের নাম গুরুত্বপূর্ণ শুধু এই কারণে নয় যে তিনি একজন সফল নারী সাংবাদিক ছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে তিনি নিজের পেশাগত পরিচয়কে কখনো আপস করতে দেননি। প্রচলিত প্রত্যাশার বাইরে গিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, সাহসের কোনো লিঙ্গ নেই, আর সত্যেরও নয়।

আজ, তাঁর জীবন ফিরে দেখলে মনে হয়–মার্থা গেলারহর্ন যুদ্ধ নিয়ে লেখেননি; তিনি লিখেছেন মানুষের বেঁচে থাকার ইতিহাস। সেই কারণেই তাঁর সাংবাদিকতা আজও প্রাসঙ্গিক, আর তাঁর জীবন নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার এক শক্তিশালী উৎস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *