মায়েরা কি সত্যিই শখ হারিয়ে ফেলেন?

একসময় তিনি নিয়মিত বই পড়তেন। হয়তো গান শিখতেন, ছবি আঁকতেন, ডায়েরি লিখতেন, বাগান করতেন কিংবা বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটতে বের হতেন। সন্তান হওয়ার পর ধীরে ধীরে সেসব বন্ধ হয়ে গেছে। প্রথমে ভেবেছিলেন, কয়েক মাসের বিরতি। সন্তান একটু বড় হলে আবার শুরু করবেন। কিন্তু কয়েক মাস গড়িয়ে কয়েক বছর হয়েছে। এখন কেউ তাঁর শখের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি একটু ভেবে বলেন, “আগে বই পড়তাম” অথবা “একসময় গান করতাম।” কথাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে লক্ষণীয় শব্দটি হলো-“আগে” মায়েরা কি সত্যিই নিজের শখ হারিয়ে ফেলেন, নাকি পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা তাঁদের শখ থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দেয়?

বাংলাদেশের বাস্তবতায় মাতৃত্ব শুধু সন্তানকে লালনপালনের একটি সম্পর্ক নয়; এর সঙ্গে রান্না, পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, স্কুলের সময়সূচি, পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের দেখাশোনা এবং ঘরের অসংখ্য ছোট–বড় দায়িত্ব যুক্ত থাকে। কর্মজীবী নারী অফিস থেকে ফিরেও এসব দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পান না। গৃহিণীর কাজের আবার নির্দিষ্ট শুরু বা শেষ নেই। ফলে নারীর দিন শেষ হয়ে যায় অন্যদের প্রয়োজন মেটাতে মেটাতে।

বাংলাদেশের সময়–ব্যবহার জরিপে দেখা গেছে, নারীরা পুরুষের তুলনায় অবৈতনিক গৃহস্থালি ও পরিচর্যার কাজে বহু গুণ বেশি সময় দেন। ২০২৫ সালে প্রকাশিত জাতীয় হিসাবেও দেখা যায়, দেশে অবৈতনিক গৃহস্থালি ও পরিচর্যামূলক শ্রমের আর্থিক মূল্যের ৮৫ শতাংশই নারীদের অবদান। আর এই কাজে নারীরা পুরুষের তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেশি সময় ব্যয় করেন। এই শ্রমের বড় একটি অংশ মায়েদের কাঁধে পড়ে। ফলে তাঁদের হাতে অবসর না থাকার বিষয়টি ব্যক্তিগত সময়–ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা নয়; এর পেছনে রয়েছে পারিবারিক দায়িত্বের অসম বণ্টন।

শখের অনুপস্থিতিকে আমরা সাধারণত খুব বড় সমস্যা মনে করি না। সংসার ঠিক চলছে, সন্তান ভালো আছে, চাকরি বজায় আছে–তাহলে গান গাওয়া বা ছবি আঁকা বন্ধ হয়েছে বলে এত কথা কেন? কিন্তু মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে শখ কেবল বিনোদন নয়। এটি মানসিক বিশ্রাম, আত্মপরিচয়, সৃজনশীলতা এবং নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণবোধের একটি উৎস। কাজের চাপ থেকে পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে বিশ্রাম, শরীরচর্চা এবং কোনো দক্ষতা বা শখে মন দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ বলে গবেষণায় দেখা গেছে। সৃজনশীল কাজ মনকে দৈনন্দিন দাবি থেকে সাময়িক বিরতি দিতে পারে।

মাতৃত্বের পর নারীর পরিচয়ে বড় পরিবর্তন আসে। তিনি তখন শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি “মা”। এই পরিচয় গভীর আনন্দ, ভালোবাসা ও অর্থবোধ এনে দিতে পারে। সমস্যা হয় তখন, যখন মাতৃত্ব তাঁর অন্যসব পরিচয়কে গ্রাস করে ফেলে। তিনি যে একজন পাঠক, শিল্পী, পেশাজীবী, বন্ধু, ভ্রমণপিপাসু বা নিছক নিজের মতো থাকতে ভালোবাসা মানুষ–সেসব পরিচয় ক্রমে গুরুত্ব হারায়। মায়েদের পরিচয় নিয়ে গবেষণায় দেখা যায়, একটি সুস্থ আত্মপরিচয় শুধু মাতৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; পেশাগত, সামাজিক ও ব্যক্তিগত ভূমিকাও তার অংশ।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় “ভালো মা” হওয়ার সামাজিক চাপ। ভালো মা নিজের আগে সন্তানকে রাখবেন, ক্লান্ত হলেও বিরক্ত হবেন না, সন্তানের কোনো প্রয়োজন উপেক্ষা করবেন না এবং নিজের আনন্দের জন্য সময় নিলে অপরাধবোধে ভুগবেন–এমন ধারণা আমাদের সমাজে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত। ফলে একজন মা এক ঘণ্টা গান শিখতে গেলে মনে করতে পারেন, ওই সময়টি সন্তানের পড়াশোনায় দেওয়া উচিত ছিল। বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেলে ভাবেন, ঘরে থেকে রান্না করাই কি বেশি দায়িত্বশীল কাজ হতো না? মনোবিজ্ঞানে একে অনেক সময় “গুড মাদার আইডিওলজি” বা আদর্শ মায়ের চাপ হিসেবে আলোচনা করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তানের সব প্রয়োজনকে নিজের সব প্রয়োজনের ওপরে রাখার এই ধারণা মানসিক চাপ, অপরাধবোধ, উদ্বেগ, বিষণ্নতার উপসর্গ এবং অভিভাবকত্বজনিত অবসাদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

অভিভাবকত্বজনিত অবসাদ বা প্যারেন্টাল বার্ন আউট সাধারণ ক্লান্তির চেয়ে আলাদা। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত দায়িত্ব, বিশ্রামের অভাব এবং পর্যাপ্ত সহায়তা না থাকলে মা বা বাবা মানসিক ও শারীরিকভাবে নিঃশেষ বোধ করতে পারেন। সন্তানের প্রতি ভালোবাসা থাকলেও দায়িত্ব পালনের শক্তি কমে যায়, বিরক্তি বাড়ে, নিজের পুরোনো জীবনকে হারিয়ে ফেলার অনুভূতি তৈরি হয়। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন বলছে, জমে থাকা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ থেকে প্যারেন্টাল বার্নআউট তৈরি হতে পারে, বিশেষত যখন দায়িত্বের তুলনায় সহায়তা কম থাকে।

এই জায়গায় শখ হারিয়ে যাওয়া একই সঙ্গে কারণ ও লক্ষণ হতে পারে। সময় না থাকায় শখ বন্ধ হয়; আবার শখ বন্ধ হওয়ায় মানসিক পুনরুদ্ধারের একটি পথও বন্ধ হয়ে যায়। মা তখন দায়িত্ব পালন করেন, কিন্তু নিজের ভেতরে আনন্দ বা প্রাণশক্তির জায়গাটি ক্রমে ছোট হতে থাকে। অনেক নারী চল্লিশের কাছাকাছি এসে হঠাৎ প্রশ্ন করেন–আমি আসলে কী করতে ভালোবাসতাম? সন্তান বড় হয়ে কিছুটা স্বাধীন হলে যে ফাঁকা সময় তৈরি হয়, সেখানে কখনো স্বস্তির বদলে শূন্যতা দেখা দেয়। কারণ বহু বছর ধরে তিনি নিজের ইচ্ছাকে স্থগিত রেখেছিলেন।

তবে শখে ফিরে যাওয়া মানেই বড় আয়োজন নয়। সপ্তাহে একদিন আধঘণ্টা গান করা, বারান্দায় কয়েকটি গাছের যত্ন নেওয়া, রাতে দশ পৃষ্ঠা বই পড়া, পুরোনো ক্যামেরা হাতে নেওয়া কিংবা একা হাঁটতে বের হওয়াও নিজের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের শুরু হতে পারে। সমস্যা হলো, এই সময়টুকুও অনেক নারীকে পরিবারের কাছ থেকে “চেয়ে” নিতে হয়। অথচ নিজের সময় কোনো পুরস্কার নয়, যা সব দায়িত্ব শেষ করার পর পাওয়া যাবে। দায়িত্ব তো কখনো পুরো শেষ হয় না।

পরিবারের অন্য সদস্যদের ভূমিকা তাই গুরুত্বপূর্ণ। স্বামী যদি সন্তান দেখাশোনাকে “সাহায্য” মনে করেন, তাহলে মূল দায়িত্বটি যে মায়ের–এই ধারণাই অটুট থাকে। বরং সন্তানের যত্ন ও ঘরের কাজকে যৌথ দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে। সন্তানদেরও ছোটবেলা থেকে শেখানো যায়, মায়ের বিশ্রাম, কাজ ও শখের সময়কে সম্মান করতে। একজন মা নিজের জন্য সময় নিলে তিনি দায়িত্বহীন হয়ে যান না; বরং মানসিকভাবে সুস্থ থাকার সুযোগ পান। আর পরিচর্যাকারীর মানসিক সুস্থতা সন্তানের সুস্থ বিকাশের সঙ্গেও সম্পর্কিত। UNICEF–ও অভিভাবকের নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নকে সুস্থ পরিচর্যার অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেয়।

মায়েরা আসলে শখ হারিয়ে ফেলেন না। বহু সময় তাঁদের শখ চাপা পড়ে দায়িত্ব, ক্লান্তি, অপরাধবোধ এবং সামাজিক প্রত্যাশার নিচে। সুযোগ পেলে সেই আগ্রহ আবার ফিরে আসতে পারে। প্রশ্নটি তাই শুধু একজন মা গান করছেন কি না, বই পড়ছেন কি না–এতটুকু নয়। প্রশ্ন হলো, মাতৃত্বের ভেতরেও একজন নারীর আলাদা ব্যক্তিসত্তা থাকার অধিকার আমরা স্বীকার করি কি না।

মা হওয়ার পর একজন নারী বদলে যান, কিন্তু তাঁর আগের মানুষটি মুছে যায় না। সেই মানুষটিরও বিশ্রাম দরকার, আনন্দ দরকার, নিজের মতো কিছু করার জায়গা দরকার। মায়ের শখকে বিলাসিতা না ভেবে তাঁর মানসিক সুস্থতা ও আত্মপরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখতে পারলেই পরিবারে একটি জরুরি পরিবর্তন শুরু হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *