কর্ণফুলী : যে নদী একটি শহর তৈরি করেছিল

চট্টগ্রাম থেকে কর্ণফুলীকে সরিয়ে নিলে শহরটির ইতিহাসের বড় অংশই আর থাকে না। বন্দর থাকে না তার পরিচিত ভূগোলে, প্রাচীন নৌবাণিজ্যের পথ বদলে যায়, সদরঘাট–চাক্তাইয়ের মতো বাণিজ্যকেন্দ্রের বিকাশের ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শিল্পাঞ্চল থেকে মাঝি, জেলে, নাবিকের জীবন–সবকিছুর মানচিত্রও অন্যরকম হয়ে যায়। পাহাড় আর সমুদ্রের মাঝখানে একটি নদী তাই শুধু চট্টগ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়নি; শত শত বছর ধরে নদীটিই শহরটির অর্থনীতি, বসতি ও সংস্কৃতির গতিপথ তৈরি করেছে।

ভারতের মিজোরামের লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন কর্ণফুলী পার্বত্য চট্টগ্রামের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গার কাছে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৭০ কিলোমিটার। পাহাড় থেকে সমুদ্রে নেমে আসার এই পথই কর্ণফুলীকে দিয়েছে বিশেষ ভৌগোলিক গুরুত্ব। এর মোহনা প্রাকৃতিক পোতাশ্রয়ের সুবিধা তৈরি করেছে, আর উজানের জলপথ চট্টগ্রামকে পার্বত্য অঞ্চল ও বৃহত্তর পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

চট্টগ্রামের বন্দর হিসেবে উত্থানের ইতিহাস বহু পুরোনো। ইতিহাসবিদ রিলা মুখার্জিও গবেষণায় চট্টগ্রামকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথের সংযোগস্থল হিসেবে দেখা হয়েছে। কর্ণফুলী ছিল সেই যোগাযোগব্যবস্থার কেন্দ্রে। ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যপথের সঙ্গে নদী ও স্থলপথ ধরে ব্রহ্মপুত্র অঞ্চল, হিমালয়, তিব্বত, ইউনান এবং আরাকানের যোগাযোগ ঘটত চট্টগ্রামের। চাল, লবণ, তুলাসহ নানা পণ্যের আঞ্চলিক ও দূরপাল্লার বাণিজ্যে বন্দরটির ভূমিকা ছিল।

ষোড়শ শতকের শুরুতে পর্তুগিজ পর্যটক ও লেখক দুয়ার্তে বারবোসা চট্টগ্রামের পোতাশ্রয়ের উৎকর্ষের কথা লিখেছিলেন। পর্তুগিজদের কাছে চট্টগ্রাম পরে Porto Grande বা বড় বন্দর নামে পরিচিতি পায়। এর পেছনে কর্ণফুলীর ভূগোল ছিল নির্ধারক। বঙ্গোপসাগর থেকে নদীপথে নিরাপদে ভেতরে ঢুকে নোঙর করার সুবিধা চট্টগ্রামকে সমুদ্রবাণিজ্যের উপযোগী করে তুলেছিল।

নদী ও বন্দরের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠতে থাকে বসতি ও বাজার। সদরঘাট, মাঝিরঘাট, চাক্তাই–এ ধরনের এলাকার নাম ও বিকাশের সঙ্গেই জলপথের সম্পর্ক স্পষ্ট। নদীতে আসা নৌযান থেকে পণ্য নামত, গুদামে জমা হতো, সেখান থেকে শহর ও দেশের অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ত। চাক্তাই–খাতুনগঞ্জ পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যতম বড় পাইকারি বাজারে পরিণত হয়। অন্যদিকে বন্দরসংলগ্ন এলাকা ঘিরে গড়ে ওঠে শ্রমিক, মাঝি, ব্যবসায়ী, নাবিক ও বিভিন্ন পেশাজীবীর বসতি। অর্থাৎ নদী শুধু পণ্য বহন করেনি; মানুষের চলাচল এবং নগরের সামাজিক ভূগোলও তৈরি করেছে।

আধুনিক চট্টগ্রামের শিল্পায়নেও কর্ণফুলীর ভূমিকা একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান আমল থেকে কালুরঘাট অঞ্চল শিল্পকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে শুরু করে। নদীপথে কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহনের সুবিধা স্থানীয় ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের সেখানে শিল্প স্থাপনে আকৃষ্ট করেছিল। পরে কালুরঘাট, মোহরা ও বোয়ালখালী ঘিরে বড় শিল্পবলয় তৈরি হয়। নদীর আরও উজানে চন্দ্রঘোনায় ১৯৫০–এর দশকের শুরুতে কর্ণফুলী পেপার মিল গড়ে ওঠে। পার্বত্য অঞ্চলের বাঁশ ও কাঠের মতো কাঁচামাল এবং নদীপথ–দুটিই এ শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

চট্টগ্রামের জাহাজ নির্মাণের ইতিহাসও কর্ণফুলীর তীরের সঙ্গে যুক্ত। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ঔপনিবেশিক যুগেও কর্ণফুলীর তীরে জাহাজ নির্মাণের কাজ চলত এবং বিদেশি বণিকেরা এখান থেকে জাহাজ কিনতেন। ১৮১৮ সালে চট্টগ্রামে নির্মিত Frigate Deutschland–এর উল্লেখ পাওয়া যায়। অর্থাৎ নদীটি শুধু বিদেশি জাহাজকে আশ্রয় দেয়নি, জাহাজ নির্মাণের স্থানীয় দক্ষতারও ক্ষেত্র তৈরি করেছিল।

কিন্তু অর্থনীতি দিয়ে কর্ণফুলীর পুরো গল্প বলা যায় না। নদীকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে আলাদা জীবন ও সংস্কৃতি। এর সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক সাম্পান। একসময় নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে মানুষ ও পণ্য পরিবহনে সাম্পান ছিল অপরিহার্য। মাঝি, জেলে এবং ঘাটকেন্দ্রিক অসংখ্য মানুষের জীবিকা নদীর ওপর নির্ভর করত। কর্ণফুলী, সাম্পান আর মাঝিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আঞ্চলিক গান, ছড়া ও লোকস্মৃতি। গবেষকদের মতে, নদীকেন্দ্রিক এই জীবন চট্টগ্রামের স্থানীয় সংস্কৃতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে।

যোগাযোগব্যবস্থা বদলের সঙ্গে সেই জীবনও বদলেছে। ১৯৩১ সালে কালুরঘাটে রেলসেতু নির্মিত হয়; পরে সেটিকে রেল ও সড়ক চলাচলের উপযোগী করা হয়। পরবর্তী সময়ে কর্ণফুলীর ওপর আরও সেতু নির্মিত হয়েছে। নদী পার হওয়ার জন্য মানুষকে আর আগের মতো নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয় না। সড়ক পরিবহন বাড়ার সঙ্গে অনেক পুরোনো ঘাটের গুরুত্বও কমেছে। তবু নদীটি চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক অস্তিত্বের কেন্দ্রেই রয়ে গেছে।

এই দীর্ঘ ইতিহাসের বিপরীতে আজ কর্ণফুলীর সামনে বড় সংকটও আছে। শিল্পবর্জ্য, নগরের আবর্জনা, পলি জমা এবং নদীতীর দখল নিয়ে বহু বছর ধরে উদ্বেগ রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের তথ্য উদ্ধৃত করে বিভিন্ন সময়ে নদীর নাব্যতা ও প্রস্থ কমে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। যে নদীর নাব্যতা একটি বন্দরনগরীর জন্ম দিয়েছিল, সেই নাব্যতার ক্ষতি তাই শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; চট্টগ্রামের অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের প্রশ্নও।

শহর সাধারণত রাস্তা, ভবন ও মানুষের সমষ্টি হিসেবে আমাদের চোখে ধরা পড়ে। কিন্তু চট্টগ্রামের ইতিহাস অন্য একটি সত্য মনে করিয়ে দেয়–কখনো কখনো একটি শহরের জন্মের আগেই তার প্রধান সড়কটি তৈরি থাকে। চট্টগ্রামর সেই প্রাচীন সড়ক ছিল কর্ণফুলী।

এই পথ ধরে এসেছে বণিকের জাহাজ, পাহাড়ের পণ্য, মাঝির সাম্পান ও দূরদেশের মানুষ। তার তীরে বাজার বসেছে, বসতি হয়েছে, কারখানা উঠেছে, বন্দর বড় হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এসব পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই নদীর পাশে একটি জনপদ ক্রমে বন্দরনগরীতে পরিণত হয়েছে।

তাই কর্ণফুলী চট্টগ্রামের একটি নদীর নামমাত্র নয়। চট্টগ্রাম শহর কীভাবে তৈরি হলো–তার সবচেয়ে দীর্ঘ এবং জীবন্ত দলিলটির নাম কর্ণফুলী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *