এলিয়েন বিজ্ঞানের অমীমাংসিত প্রশ্ন

রাতের আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলজ্বল করে। সেই তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে মানুষের মনে যুগ যুগ ধরে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে পৃথিবীর বাইরে কি কোথাও প্রাণ আছে? আমরা কি মহাবিশ্বে একমাত্র বুদ্ধিমান সভ্যতা, নাকি কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরে কোনো গ্রহে আমাদের মতোই আরেকটি প্রাণী সভ্যতা গড়ে উঠেছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বিজ্ঞানীরা বহু দশক ধরে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। আর এই অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে ‘এলিয়েন’ বা ভিনগ্রহের প্রাণী।

এলিয়েন বলতে সাধারণত পৃথিবীর বাইরের কোনো গ্রহ, উপগ্রহ কিংবা মহাজাগতিক পরিবেশে বসবাসকারী প্রাণকে বোঝানো হয়। তবে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে এলিয়েনকে প্রায়ই বড় মাথা, বড় চোখ এবং অদ্ভুত আকৃতির প্রাণী হিসেবে দেখানো হলেও বিজ্ঞানীরা বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখেন। তাদের মতে, ভিনগ্রহের প্রাণ পৃথিবীর জীবের মতোও হতে পারে, আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন জৈব গঠনও ধারণ করতে পারে।

এলিয়েনের অস্তিত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই মহাবিশ্বের বিশালতার কথা বলতে হয়। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বে প্রায় দুই ট্রিলিয়নেরও বেশি গ্যালাক্সি থাকতে পারে। প্রতিটি গ্যালাক্সিতে আবার রয়েছে কোটি কোটি নক্ষত্র এবং তাদের চারপাশে ঘুরছে অসংখ্য গ্রহ।

আমাদের নিজস্ব গ্যালাক্সি মিল্কিওয়েতেই প্রায় ১০০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে। সামপ্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব নক্ষত্রের অধিকাংশেরই অন্তত একটি করে গ্রহ রয়েছে। ফলে মহাবিশ্বে পৃথিবীর মতো পরিবেশসম্পন্ন গ্রহের সংখ্যা খুবই বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, যদি পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব সম্ভব হয়ে থাকে, তবে একই ধরনের পরিবেশ অন্য কোথাও থাকলে সেখানেও প্রাণের বিকাশ ঘটতে পারে।

বর্তমান বিজ্ঞান অনুযায়ী জীবনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো তরল পানি। পৃথিবীর সব পরিচিত প্রাণই পানির ওপর নির্ভরশীল। তাই মহাকাশ গবেষণায় এমন স্থান খোঁজা হয়, যেখানে পানির অস্তিত্ব রয়েছে বা অতীতে ছিল। এ ছাড়া জীবনের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত তাপমাত্রা, শক্তির উৎস এবং জটিল রাসায়নিক যৌগ। কোনো গ্রহ তার নক্ষত্র থেকে এমন দূরত্বে অবস্থান করলে, যেখানে পানি তরল অবস্থায় থাকতে পারে, সেই অঞ্চলকে বলা হয় বাসযোগ্য অঞ্চল।

বর্তমানে বিজ্ঞানীরা হাজার হাজার বহির্গ্রহ বা এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কার করেছেন। এর মধ্যে অনেকগুলো পৃথিবীর আকারের এবং তাদের নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলে অবস্থান করছে। ফলে সেখানে প্রাণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সন্ধানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত গ্রহ হলো মঙ্গল। কয়েকশ কোটি বছর আগে মঙ্গলে নদী, হ্রদ এবং সমুদ্র থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বর্তমানে গ্রহটি শুষ্ক ও ঠান্ডা হলেও অতীতে সেখানে অণুজীব জাতীয় প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। মঙ্গলের মাটিতে জৈব যৌগ এবং মৌসুমি মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি বিজ্ঞানীদের আগ্রহ বাড়িয়েছে। যদিও এগুলো প্রাণের নিশ্চিত প্রমাণ নয়, তবে ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।

বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপা এবং শনির উপগ্রহ এনসেলাডাস বর্তমানে ভিনগ্রহের প্রাণ অনুসন্ধানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ইউরোপার বরফাচ্ছাদিত পৃষ্ঠের নিচে বিশাল তরল সমুদ্র থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে এনসেলাডাসের বরফ ফাটল থেকে পানি ও জৈব পদার্থ মহাশূন্যে বেরিয়ে আসতে দেখা গেছে। এসব তথ্য বিজ্ঞানীদের ধারণা দিয়েছে যে, এই উপগ্রহগুলোতে অণুজীব জাতীয় প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে।

১৯৬১ সালে মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্ক ড্রেক একটি সমীকরণ প্রস্তাব করেন, যা মহাবিশ্বে বুদ্ধিমান সভ্যতার সম্ভাব্য সংখ্যা নির্ণয়ের চেষ্টা করে। যদিও সমীকরণটির অনেক উপাদান এখনো অনিশ্চিত, তবুও এটি বিজ্ঞানীদের মধ্যে এলিয়েন অনুসন্ধানকে নতুন মাত্রা দেয়। অনেক গবেষক মনে করেন, মহাবিশ্বের বিশালতা বিবেচনায় কোথাও না কোথাও উন্নত সভ্যতা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের কোনো স্পষ্ট সংকেত পাওয়া যায়নি।

বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মি একবার প্রশ্ন করেছিলেন, “সবাই যদি থেকে থাকে, তাহলে তারা কোথায়?” এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় ‘ফার্মি প্যারাডক্স’। একদিকে মহাবিশ্বে প্রাণ থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি, অন্যদিকে এখন পর্যন্ত কোনো বুদ্ধিমান সভ্যতার নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে উন্নত সভ্যতা খুবই বিরল, তারা আমাদের থেকে অনেক দূরে, তারা যোগাযোগ করতে চায় না, অথবা আমরা এখনো তাদের সংকেত শনাক্ত করার প্রযুক্তি অর্জন করতে পারিনি।

বিশ্বজুড়ে বহু মানুষ আকাশে অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তু দেখার দাবি করেছেন। বর্তমানে এসব ঘটনাকে ইউএপি বলা হয়। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেন, কোনো উড়ন্ত বস্তুর পরিচয় জানা না গেলেই সেটি এলিয়েন মহাকাশযান এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অনেক সময় প্রযুক্তিগত ত্রুটি, আবহাওয়াজনিত ঘটনা কিংবা অপটিক্যাল বিভ্রমের কারণেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে। এখন পর্যন্ত কোনো ইউএফও ঘটনার সঙ্গেই ভিনগ্রহের প্রাণের সরাসরি সম্পর্ক বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি।

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান মহাকাশ থেকে আসা রেডিও সংকেত বিশ্লেষণ করছে। আধুনিক টেলিস্কোপ দূরবর্তী গ্রহের বায়ুমণ্ডল পরীক্ষা করে অক্সিজেন, মিথেন কিংবা অন্যান্য গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। এসব গ্যাস জীবনের সম্ভাব্য চিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়। আগামী কয়েক দশকে আরও উন্নত মহাকাশযান এবং টেলিস্কোপ ব্যবহারের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার আশা করছেন।

যদি কোনোদিন ভিনগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়, তবে সেটি হবে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলোর একটি। এটি শুধু জীববিজ্ঞান বা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ধারণাকেই বদলে দেবে না, বরং মানুষের নিজস্ব অস্তিত্ব সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিতেও আমূল পরিবর্তন আনবে। তখন হয়তো মানুষ বুঝতে পারবে যে পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, বরং অসংখ্য সম্ভাব্য প্রাণবাহী জগতের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র গ্রহ মাত্র।

এলিয়েন আজও রহস্য। তাদের অস্তিত্বের পক্ষে চূড়ান্ত প্রমাণ নেই, আবার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি অস্বীকার করার মতো তথ্যও নেই। বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত নতুন নতুন তথ্য সংগ্রহ করছে, নতুন গ্রহ আবিষ্কার করছে এবং মহাবিশ্বের গভীরে প্রাণের চিহ্ন খুঁজে বেড়াচ্ছে। হয়তো আগামী শতাব্দীতে, কিংবা তারও আগে, মানুষ এমন এক আবিষ্কারের মুখোমুখি হবে যা বদলে দেবে মানবজাতির ইতিহাস। ততদিন পর্যন্ত এলিয়েন থাকবে বিজ্ঞান, কৌতূহল এবং কল্পনার সবচেয়ে আকর্ষণীয় রহস্যগুলোর একটি হিসেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *