ঢাকার গুলশান বা বনানীর অভিজাত রেস্তোরাঁগুলোর সামনে আজকাল প্রায়ই জটলা দেখা যায়। কারণ? ‘টার্কিশ আইসক্রিম’-এর জাদুকরী কসরত। ড্রয়িংরুমে ইউটিউব বা টিভিতে তুর্কি টিভি সিরিজ দেখার জন্য পুরো পরিবার যখন একসঙ্গে বসে, তখন মনে হতে পারে বাংলাদেশের মানুষের এই তুরস্কপ্রীতি বুঝি হালের কোনো হুজুগ বা ফ্যাশন। তবে ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে তাকালে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। আজ থেকে প্রায় ৮০০ বছর আগে বাংলার মাটিতে ঘোড়ার খুরের ধুলো উড়িয়ে যে তুর্কিরা এসেছিলেন, তারা শুধু শাসনদণ্ড হাতে নেননি; আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাসে মিশিয়ে দিয়ে গেছেন তাদের অস্তিত্বের ছাপ।
১২০৪ সাল। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি নামে এক তুর্কি সেনাপতি মাত্র ১৮ জন ঘোড়সওয়ার নিয়ে নদীয়া জয় করেছিলেন। ইতিহাসের পাতায় আমরা একে নিছক একটি ‘বিজয়’ হিসেবে পড়ি; কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীদের চোখে এটি ছিল বাংলার সংস্কৃতির জন্য এক বিশাল পরিবর্তনের শুরু।
ভাষায় তুর্কি ছাপ
সেন আমলে বাংলা ছিল ‘পাখির ভাষা’ বা লৌকিক ভাষা, আর সংস্কৃত ছিল রাজভাষা। তুর্কি সুলতানরাই প্রথম বাংলা ভাষাকে রাজদরবারে স্থান দেন এবং কৃত্তিবাস ও মালাধর বসুর মতো কবিদের দিয়ে রামায়ণ-মহাভারত বাংলায় অনুবাদের ব্যবস্থা করেন।
সবচেয়ে বড় বিপ্লব ঘটে শব্দভান্ডারে। তুর্কিরা ফারসি ভাষার মোড়কে হাজার হাজার তুর্কি শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবেশ করান। এই পরিবর্তন আমাদের ভাষাকে দিয়েছিল এক নতুন গঠনশৈলী।
‘দো-ভাষী’ রীতির জন্ম ও বাংলা সাহিত্য
তুর্কি আমলের সবচেয়ে বড় ভাষাতাত্ত্বিক বিপ্লব হলো ‘দো-ভাষী’ বা ‘মুসলমানি বাংলা’র উদ্ভব। তুর্কি শাসকরা জাতিতে তুর্কি হলেও সাংস্কৃতিকভাবে ছিলেন ফারসি-ঘেঁষা। তাদের প্রভাবে বাংলা সাহিত্যে দেব-দেবী নির্ভরতার বাইরে গিয়ে মানুষের গল্প, রোমান্টিক প্রণয় উপাখ্যান রচিত হতে থাকে। পুঁথি সাহিত্যে আমরা এই মিশ্র ভাষার জয়জয়কার দেখি, যা বাংলা ভাষাকে ‘সেক্যুলার’ বা সর্বজনীন হতে সাহায্য করেছিল।
সাধারণত এক ভাষা অন্য ভাষা থেকে শব্দ ধার করে, কিন্তু ব্যাকরণ বা প্রত্যয় ধার করা বিরল। তুর্কি প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে বাংলা ভাষায় ‘চি’ প্রত্যয়টি স্থায়ী আসন গেড়েছে। যেমন– বাবুর্চি তুর্কি শব্দ ‘বাওয়ার’ (বিশ্বাস) + ‘চি’। সুলতানি আমলে রাজকীয় রান্নাঘরে বিষ মেশানোর ভয়ে কেবল সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তিকেই রাঁধুনি নিয়োগ করা হতো। কালের বিবর্তনে সেই ‘বিশ্বাসভাজন’ শব্দটিই হয়ে গেল ‘রাঁধুনি’। তুর্কিরা বাংলায় যে পুলিশি ও বিচার ব্যবস্থা চালু করেছিলেন, ৮০০ বছর পরেও আমাদের আদালত ও থানা সেই ভাষাতেই কথা বলছে–‘দারোগা’ মঙ্গোল-তুর্কি শব্দ ‘দারুঘা’ থেকে এসেছে। মধ্য এশিয়ায় যারা ছিলেন প্রাদেশিক গভর্নর, বাংলায় তারা হলেন থানার প্রধান। ‘মুচলেকা’ শব্দটি তুর্কি ‘মুচালকা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ আইনি বন্ড।
বাঙালির পারিবারিক সম্পর্কেও তুর্কি প্রভাব স্পষ্ট। ‘আপা’–বড় বোনকে ডাকার শব্দটি তুর্কি ‘আবা’ বা ‘আবলা’ (বড় বোন/মা) থেকে এসেছে। নানি-নানা, খালা ও মামা; অর্থাৎ তুর্কি ও মধ্যএশীয় রীতি অনুযায়ী মায়ের দিকের এবং বাবার দিকের আত্মীয়দের আলাদা নাম ধরে ডাকার যে প্রথা, তা এই তুর্কি-ফারসি সংমিশ্রণের ফল।
ভাষার বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকে ইতিহাস। আমরা কাউকে বোকা বা একগুঁয়ে বলতে ‘উজবুক’ বলি। অথচ ঐতিহাসিকভাবে এটি মধ্য এশিয়ার দুর্ধর্ষ ‘উজবেক’ তুর্কি জাতির নাম। মোগল আমলে অভিজাতরা উজবেক সৈন্যদের একটু অমার্জিত মনে করতেন, সেই থেকে একটি জাতির নাম বাংলায় গালিতে পরিণত হয়েছে।
অটোমান সাম্রাজ্য ও চট্টগ্রামের জাহাজ
তুর্কিদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেবল স্থলযুদ্ধে সীমাবদ্ধ ছিল না। ষোলো ও সতেরো শতকে যখন অটোমান (ওসমানীয়) সাম্রাজ্য বিশ্বের পরাশক্তি, তখন তাদের নৌশক্তির এক বড় রসদ আসত আমাদের চট্টগ্রাম থেকে। ১৫৫৪ সালে অটোমান অ্যাডমিরাল সিদি আলি রইস ঝড়ের কবলে পড়ে ভারতে আসেন। তাঁর ভ্রমণকাহিনি ‘মিরাত-উল-মেমালিক’-এ এই অঞ্চলের গুরুত্ব উঠে এসেছে। চট্টগ্রামের কথ্য ভাষায় আজও প্রচুর আরবি-তুর্কি শব্দের মিশ্রণ দেখা যায়, যা সেই আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সাক্ষী।
১৯২১ সালে মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক যখন তুরস্ককে নতুন করে গড়ছেন, নজরুল তখন লিখলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘কামাল পাশা’। ‘ওই ক্ষেপেছে পাগলী মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই…’ আতাতুর্ককে ‘ভাই’ ডাকার মাধ্যমে নজরুল তুরস্কের নেতাকে বাংলার ঘরের মানুষে পরিণত করলেন। আজও বাংলাদেশে ছেলেদের নাম ‘কামাল’ রাখার যে ধুম, তার পেছনে এই ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক প্রভাব অনস্বীকার্য।
বাকরখানি থেকে কুর্তা
পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বাকরখানির নাম শোনেননি এমন ভোজনরসিক খুঁজে পাওয়া ভার। এই রুটির নাম এসেছে তুর্কি বংশোদ্ভূত জমিদার আগা বাকের খানের নাম থেকে। মধ্য এশিয়ার ‘তন্দুর’ সংস্কৃতি আর মোগলাই খানার সংমিশ্রণে তৈরি বাকরখানি আজ ঢাকার ট্রেডমার্ক।
একইভাবে আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠানে যে ‘কোরমা’ বা পোলাও ছাড়া চলেই না, তা মূলত তুর্কি ‘কাভুরমা’ থেকেই বিবর্তিত। এমনকি আমরা যে লম্বা কোর্তা বা শেরওয়ানি পরি, তার উৎসও মধ্য এশিয়ার তুর্কিদের ‘কাফতান’ বা আলখাল্লা জাতীয় পোশাক।
ইতিহাসের সেই পুরোনো সম্পর্ক আজ নতুন মোড়কে ফিরে এসেছে ডিজিটাল যুগে। বাংলাদেশে এখন রীতিমতো একটি ‘টার্কিশ ওয়েভ’ বা তুর্কি জোয়ার চলছে।
বাংলাদেশের ড্রয়িংরুমে একঘেয়ে সিরিয়ালের রাজত্ব ভেঙে দিয়েছে তুর্কি ড্রামা। ‘দিরিলিস আরতুগ্রুল’ বা ‘কুরুলাস উসমান’ এখন তরুণ প্রজন্মের কাছে সাহসিকতা আর ইসলামী ঐতিহ্যের প্রতীক। অন্যদিকে ‘সুলতান সুলেমান’-এর হুররাম সুলতান হয়ে উঠেছেন ফ্যাশন আইকন।