নির্বাচনী প্রচারে বড় পরিবর্তন

নির্বাচন মানেই পোস্টারের ছড়াছড়ি। দেয়ালে দেয়ালে, দড়িতে দড়িতে ঝুলন্ত পোস্টার। ভোটের মাঠের সেই চেনা ছবির খোলনলচে এবার বদলে গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টারের ব্যবহার একেবারেই নিষিদ্ধ। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিষেধাজ্ঞা ভেঙে ফাঁকফোকরে কিছু এলাকায় পোস্টারের অস্তিত্ব থাকলেও তা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে নেই। এবার ডিজিটাল প্রচারণায় ঝোঁক বেশি। এতে শীর্ষে রয়েছে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, এবার নির্বাচনী প্রচারণায় পোস্টার ছাড়াও বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে নির্বাচনে ডিজিটাল প্রচারণা বেশ লক্ষণীয়। একসময় দেদার ব্যবহার হতো রঙিন পোস্টার। বেশ কবছর আগেই তা বন্ধ করেছে ইসি। এবার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে রঙিন-সাদাকালো সব ধরনের পোস্টারের প্রচারণা। 

এদিকে স্থানীয় সরকার ও নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, বিশ্বের উন্নত অনেক দেশেই নির্বাচনে পোস্টার ব্যবহার হয় না। সেসব দেশে নির্বাচন কমিশনের তরফে সুনির্দিষ্ট জায়গা করে দেওয়া হয়। প্রার্থীরা সেখানে গিয়ে প্রচারণা ও সভা-সমাবেশ করেন।  

নির্বাচনী প্রচারণা ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের উপপ্রধান আমিনুল এহসান সমকালকে বলেন, এবার মাইকিং আগের চেয়ে কম মনে হচ্ছে। তবে বেশি যেটা চোখে পড়ছে, প্রার্থীরা ভোটারের ঘরে ঘরে যাচ্ছেন। এবার বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও তা শহরে কিছুটা দেখা যাচ্ছে, তবে গ্রামগঞ্জে কম। বেশি প্রচারণা হচ্ছে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্য কিছু মাধ্যমে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ আকতার মাহমুদ সমকালকে বলেন, অতীতে পোস্টার লেমিনেটিং করে প্রার্থীদের ঝুলাতে দেখা গেছে। তারও আগে দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার লাগানো হতো। এবার সেটা নেই। এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রচারণা চালানোর বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এবার পোস্টারের বদলে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে ইসি। একজন প্রার্থী তাঁর নির্বাচনী এলাকায় ৯ ফুট বাই ১৬ ফুট আয়তনের ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করে প্রচারণা চালাতে পারবেন। তবে শহরের প্রার্থীরা কিছু বিলবোর্ড ব্যবহার করলেও অনেক প্রার্থী নামসর্বস্ব ও দুর্বল বিলবোর্ড বানিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন বিলবোর্ড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, আশা করেছিলাম, প্রচারণায় বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগের ফলে ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন। সে আশার গুড়ে বালি। প্রার্থীর সমর্থকরা বাঁশ-কাঠ দিয়ে দুর্বল বিলবোর্ড বানিয়ে যেখানে সেখানে বসিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন; বরং কিছু এলইডি সাইন ব্যবহার করছেন প্রার্থীরা।

ঢাকা-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মিজানুর রহমান সমকালকে বলেন, পোস্টার না থাকায় পরিবেশের জন্য ভালো হয়েছে। তবে বিত্তশালী প্রার্থীরা নানাভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন। অনেকে নিজের বক্তব্য মোবাইল ফোনে অডিও মেসেজ পাঠাচ্ছেন। এতে অর্থ ব্যয় হচ্ছে। আমরা সেটা পারছি না। এ ছাড়া ব্যানারের ব্যবহার বেশি হচ্ছে।
ইসির পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিক বলেন, নির্বাচনী প্রচারণা কতটা ইতিবাচক করা যায়, তা আমরা চেষ্টা করছি।

প্রচারণায় আরও যেসব পরিবর্তন
এবার ব্যাপকভাবে বেড়েছে ডিজিটাল প্রচারণা। বিশেষ করে ফেসবুকে। প্রায় সাড়ে সাত কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর এক-চতুর্থাংশ কোনো না কোনোভাবে প্রার্থী বা দলীয় প্রচারণায় শেয়ার, লাইক বা কমেন্ট করছেন। কেউ কেউ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমালোচনাও করছেন। পাশাপাশি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলেও বিজ্ঞাপন দিয়ে দলীয়ভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চলছে। এ ছাড়া কেবল টিভি লাইনেও ডিশ ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন দল ও প্রার্থীর প্রচারণার সুযোগ করে দিয়েছেন। কোনো কোনো প্রার্থী মোবাইল ফোনে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠাচ্ছেন।

নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, এক প্রার্থী অন্য প্রার্থীর বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুনের ওপর তার প্রচারণার সামগ্রী ব্যবহার করতে পারবেন না। এবার এ ধরনের অভিযোগও তেমন নেই। তবে প্রচারণায় হ্যান্ডবিল ব্যবহার বেড়েছে।

কোনো প্রার্থী নির্বাচনী এলাকায় একক কোনো জনসভায় একসঙ্গে তিনটির বেশি মাইক্রোফোন বা লাউড স্পিকার ব্যবহার করতে পারবেন না। তবে এবার মাইকের ব্যবহার আগের নির্বাচনের চেয়ে কম। পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা সারোয়ার হোসেন বলেন, ‘আগে মাইকে উচ্চস্বরে প্রচারণার কারণে কান ঝালাপালা হয়ে যেত। এবার সেটা কম। অনেকে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করায় শব্দদূষণের মাত্রা কমেছে।’

ঘরে ঘরে যাচ্ছেন প্রার্থীরা
আগে প্রার্থীরা মানুষের ঘরে ঘরে ভোট চাইতে গেলেও সেটার মাত্রা ছিল কম, বিশেষ করে বড় নেতারা খুবই কম যেতেন। পোস্টারের ব্যবহার বন্ধ হওয়ায় নিজেকে পরিচিত করতে প্রার্থীকে ঘরে ঘরে যেতে ইসি অনেকটা বাধ্য করেছে। এ ছাড়া এবার অনেক তরুণ প্রার্থী থাকায় তারা ভোট চাইতে বেশি করে ঘরে ঘরে যাচ্ছেন। তাদের সঙ্গে প্রচারণায় টিকে থাকতে বাধ্য হয়ে বড় দল, বয়স্ক ও হেভিওয়েটের প্রার্থীরাও ভোটারের ঘরে যাচ্ছেন। এ ছাড়া নারীকর্মীদের ঘরে ঘরে যাওয়ার প্রবণতা অনেকটা বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর সংগ্রহের অভিযোগও উঠেছে।

লিফলেট-ফেস্টুন-ব্যানারের বাহার
এবার ব্যানার-ফেস্টুনের মাধ্যমে প্রচারণা বেশ বেড়েছে। লিফলেট ব্যবহার করে প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চলছে। এমনকি ক্ষমতায় গেলে কী কী করবেন, সেটার বর্ণনাসহ হ্যান্ডবিল ভোটারের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।

নেই চায়ের কাপে ঝড়!
একসময় নির্বাচন এলেই চায়ের কাপে ঝড় উঠত। এবার রাজধানীতে চায়ের দোকানে ভোট নিয়ে আলোচনা থাকলেও মাত্রা অনেকটাই কম। দোকানিরা বলছেন, চা পান করতে এসে রাজনীতি নিয়ে আলোচনার চেয়ে বেশি আলোচনা হয় নির্বাচন কতটা শান্তিপূর্ণ হবে। অনেকে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন। পশ্চিম আগারগাঁওয়ের চা বিক্রেতা রুস্তম আলী বলেন, ‘ঢাকা শহরের মানুষ ভীষণ ব্যস্ত। এ জন্য তারা চায়ের দোকানে কম বসে। যারা বসেন, তাদের মুখেও নির্বাচন নিয়ে আলোচনা কম।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *