রং রেখায় বহুস্বর

৭ মার্চ থেকে উত্তরার গ্যালারি কায়ায় শুরু হয়েছে নতুন চিত্রপ্রদর্শনী, ‘কলেকশন্স— নট ওয়ার্ডস’। এতে স্থান পেয়েছে আটজন শিল্পীর কাজ। হামিদুজ্জামান খান (১৯৪৬-২০২৫), চন্দ্রশেখর দে (জ. ১৯৫১), রতন মজুমদার (জ. ১৯৫৪), রনজিৎ দাস (জ. ১৯৫৬), আহমেদ শামসুদ্দোহা (জ. ১৯৫৮), শেখ আফজাল হোসেন (জ. ১৯৬০), কনকচাঁপা চাকমা (জ. ১৯৬৩) ও মোহাম্মদ ইকবাল (জ. ১৯৬৭)। উল্লিখিত শিল্পীদের ভেতর কিংবদন্তিতুল্য হামিদুজ্জামান খান প্রয়াত হয়েছেন। প্রদর্শনীর নামের দিকে তাকালে বোঝা যায়, এখানে অক্ষরের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা চিত্রমালাতে গল্পগুলো বাঙ্ময়। কথায় আছে— একটি ছবি হাজার কথা বলে। ছবি সরাসরি আমাদের অন্তরে, অন্দরে সঙ্গে আলাপ করে। প্রতিটি রঙের সঙ্গে রয়েছে মানুষের জন্মান্তরের স্মৃতি-ইতিহাস। লাখো বছর ধরে প্রকৃতির রূপ ও আলো-ছায়া মানুষের সঙ্গে কথা বলে এসেছে। ভাব বিনিময় করে এসেছে, তার আশ্রয় হয়েছে। হামিদুজ্জামান খানের পার্বত্য চট্টলা কিংবা হ্রদের জলে হেমন্ত নামে ছবিগুলোর দিকে যখন তাকাই, বুকের ভেতর একটা আদিম উচ্ছ্বাস ছলকে ওঠে, মনে হয় এই জল এই আলো আমি দেখেছি আগেও। জন্মান্তরে দেখে দেখে এই অবধি এসেছি। আমাদের সৌভাগ্য, এই সময়ে আমাদের চিত্রশিল্পের বলয়ে কিংবদন্তীতুল্য অনেক শিল্পীকে পেয়েছি। বিশ্বে যদি আমাদের দেশের অভিমতের মূল্য থাকত; রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণে, শিক্ষা-দীক্ষা-সততা ও অর্থনীতিতে; তাহলে আমাদের চিত্রশিল্পীরা বৃহত্তর এশিয়া, ইউরোপ, জাপান, আফ্রিকার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বশাসন করতে পারতেন। হামিদুজ্জামান খানের পরই চলে যাচ্ছি চন্দ্রশেখর দে’র কাছে। একে একে যখন অপর শিল্পীদের কাছেও যাই, দেখতে পাই, স্বকীয়তায় প্রত্যেকে কী অসামান্য! চন্দ্রশেখর দে যেমন উত্তম উজ্জ্বল রঙে রাঙান, তেমনই কালো কালির পুরু আঁচড়ে জ্যামিতিক সজ্জায় অনুভূতি, অভিব্যক্তি, পরিবার, ভালোবাসাময় বিশেষ কোনো মুহূর্ত আঁকেন।  রতন মজুমদারের কিছু ছাপচিত্র আমরা দেখেছি এ প্রদর্শনীতে। তাঁর ছাপচিত্রে জড়জীবনের পেছনের জৈবিক গল্পগুলো আসে। এখানে নিছকে আলোছায়ার রূপ এসেছে, প্রতীকের সঙ্গে লোক-সম্বন্ধ উঠে এসেছে। অনুপম, নান্দনিক। 
রনজিৎ দাস তাঁর নির্জন বাসে বিশেষ করে চরিত্র-নির্ভর ছবি আঁকেন। চরিত্রগুলো পরিবেশ-নির্ধারিত। কখনও প্রকৃতির ছবিও আঁকেন। সেখানে আনন্দময় উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার থাকে। বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে আঁকা। যেন কোনো প্রাকৃতিক ওয়াইড-অ্যাঙ্গেল লেন্স দিয়ে দেখা হচ্ছে। আহমেদ শামসুদ্দোহা প্রাকৃতিক বিশালতার সঙ্গে মিলিয়ে দেন মানুষের ব্যাপকতা। অনেকটাই বাস্তবানুগ ভঙ্গিতে। আলো ছায়ার খেলা এতো সুন্দর! গ্রাম এসেছে, সুন্দরবন এসেছে তাঁর ছবিতে। সুন্দরবন এর বন্যরূপ আসেনি। বনের বাইরে অরণ্যঘেঁষা জনপদ হিসেবে এসেছে। কনকচাঁপা চাকমা পাহাড়ি স্বপ্নের কাছে নিয়ে যান আমাদের।  ধরা পড়ে পাহাড়ি মানুষ— বিশেষত নারী— তার স্বপ্ন ও সৌন্দর্যসহ। মৌলিক উজ্জ্বল রঙের প্রতি কনচাঁপার অনুরাগ রয়েছে। বাস্তব চরিত্রকেই তিনি এক ধরনের পরাবাস্তব আড়াল দিতে পারেন। মোহাম্মদ ইকবাল হচ্ছে অভিব্যক্তির দেবদূত। তাঁর ছবিতে স্বপ্ন ও বিষাদী-আনন্দমাখা মানবমুখ, জীবন্ত চোখ বরাবর আসে। শিশুমুখ, কিশোরীর মুখ, বৃদ্ধের মুখ। পরিবারপ্রিয় মানুষ কিছু মুখচ্ছবি-তাড়িত, সবসময়ই। ইকবাল সেই মুখকে পরিপার্শ্বের অংশ ও শিকার হিসেবে ধারণ করেন। অনবদ্য এই প্রদর্শনী ১৬ মার্চ পর্যন্ত চলবে। সময়, প্রতিদিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *