আরেকটু দেখি বা আরেকটু থাকি এমন ভাবনা আমাদের তরুণদের সামাজিক মাধ্যমে আটকে রাখছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সামাজিক মাধ্যম এখন আর শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি হয়ে উঠেছে একটি সমান্তরাল জগৎ, যেখানে ভিউ, লাইক আর ফলোয়ার নির্ধারণ করছে একজন মানুষের মূল্য। এই মূল্যায়নের ফাঁদে পড়ে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে একটি প্রজন্ম। গবেষণা ও বাস্তবতায় উত্তরণের পথ খুঁজে লিখেছেন আলাউদ্দিন আলাদিন
রাত ২টা। ১৯ বছর বয়সী রাফি হাসান তখনও জেগে আছেন। হাতে স্মার্টফোন, চোখ স্ক্রিনে আটকানো। কখনও টিকটক, কখনও ইউটিউব, কখনও ইনস্টাগ্রাম। পরদিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস; তা জানেন। তবুও থামতে পারছেন না। ‘আরেকটু দেখি’, এই ভাবনাই তাঁকে আটকে রাখছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। রাফির এই গল্প কেবল তাঁর একার নয়, দেশের লাখো তরুণের প্রতিদিনের বাস্তবতা। সামাজিক মাধ্যম এখন আর শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি হয়ে উঠেছে একটি সমান্তরাল জগৎ, যেখানে ভিউ, লাইক আর ফলোয়ার নির্ধারণ করছে একজন মানুষের মূল্য। এই মূল্যায়নের ফাঁদে পড়ে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে একটি প্রজন্ম।
ভিউ কালচার, প্রজন্মের নীরব সংকট
মাত্র এক দশক আগেও ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ বলে কোনো পরিচয় ছিল না। আজ এটি লাখো তরুণের স্বপ্নের পেশা। ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া, ইউটিউবে লক্ষাধিক সাবস্ক্রাইবার পাওয়া কিংবা টিকটকে ট্রেন্ড তৈরি করা। এই লক্ষ্যগুলোকে ঘিরে গড়ে উঠছে একটি নতুন সংস্কৃতি, যার নাম ‘ভিউ কালচার’। কিন্তু এই সংস্কৃতির গভীরে লুকিয়ে আছে এক ভয়ানক সত্য। ভাইরাল হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তরুণদের একটি বড় অংশকে ঠেলে দিচ্ছে নৈতিকতার সীমানা পেরিয়ে। রাস্তায় অপরিচিত মানুষকে বিব্রত করে ভিডিও বানানো, পরিবারের গোপন মুহূর্ত ক্যামেরায় ধরা, ধর্ম ও সমাজের সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে উস্কানিমূলক কনটেন্ট তৈরি–এসব এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি ধারায় পরিণত হয়েছে।
এর পেছনে কাজ করছে মস্তিষ্কের একটি সূক্ষ্ম রাসায়নিক প্রক্রিয়া। প্রতিটি লাইক বা কমেন্ট মস্তিষ্কে ডোপামিন নামের একটি রাসায়নিক নিঃসরণ ঘটায়, যা তাৎক্ষণিক আনন্দের অনুভূতি দেয়। এই অনুভূতি পেতে বারবার ফিরে আসতে থাকে মানুষ, ঠিক যেভাবে মাদকাসক্ত ব্যক্তি মাদকের দিকে ফিরে যায়। মনোবিজ্ঞানীরা এই চক্রকে বলছেন ‘ডোপামিন লুপ’, যা একবার তৈরি হলে ভাঙা অত্যন্ত কঠিন।
সংখ্যায় উদ্বেগের চিত্র–গবেষণা কী বলছে?
বৈশ্বিক গবেষণাগুলো এই উদ্বেগকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে কিশোর-তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে অতিরিক্ত সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব কিশোর-কিশোরী দিনে তিন ঘণ্টার বেশি সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার হার অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন আরও উদ্বেগজনক তথ্য দিচ্ছে। যারা নিজেরা কনটেন্ট তৈরি করেন এবং ভিউ ও ফলোয়ার নিয়ে অতিরিক্ত সচেতন থাকেন, তাদের মধ্যে আত্মপরিচয়ের সংকট, একাকীত্ব এবং ‘ইম্পোস্টার সিনড্রোম’ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এই সিনড্রোমে আক্রান্ত মানুষ নিজের সাফল্যকে বিশ্বাস করতে পারেন না এবং সর্বদা একটি ব্যর্থতার ভয়ে থাকেন।
দেশের তরুণদের চিত্র
বাংলাদেশের চিত্র আলাদা নয়। টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২ কোটির বেশি, যার একটি বড় অংশ ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ। গড়ে একজন বাংলাদেশি তরুণ দিনে ছয় থেকে আট ঘণ্টা সামাজিক মাধ্যমে সময় কাটাচ্ছেন; যা একটি পূর্ণ কর্মদিবসের সমান। এই সময়ের একটি বড় অংশই যাচ্ছে নিষ্ক্রিয়ভাবে অন্যের কনটেন্ট দেখতে বা নিজের কনটেন্টের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে। অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক মাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানো তরুণদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে। টানা কোনো কাজ করার সক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে, যা পড়াশোনা ও পেশাদার জীবনে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করছে।
সম্পর্ক ও সমাজে প্রভাব: যা চোখে পড়ে না
ভিউ কালচারের ক্ষতি শুধু ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রভাব পড়ছে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কেও। অনেক তরুণ এখন পরিবারের সঙ্গে একই টেবিলে বসে খাবার খাওয়ার সময়ও ফোন থেকে চোখ সরাতে পারছেন না। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় সরাসরি কথোপকথনের চেয়ে সেই মুহূর্তটিকে ‘কনটেন্ট’ বানানোর চিন্তা মাথায় ঘুরছে। এর চেয়েও উদ্বেগজনক হলো ‘সোশ্যাল কম্পেরিজন’ বা সামাজিক তুলনার প্রবণতা। অন্যের সাজানো, সম্পাদনা করা জীবনের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবন তুলনা করতে গিয়ে তরুণরা পড়ছেন হীনম্মন্যতায়। কেউ হারাচ্ছেন আত্মবিশ্বাস, কেউ ছুটছেন অর্থহীন বস্তুবাদের পেছনে শুধু অনলাইনে ‘ভালো দেখানো’র জন্য।
সমাধান ‘মিডিয়া ডায়েট’
খাবারে যেমন পুষ্টির ভারসাম্য দরকার, ঠিক তেমনই মানসিক সুস্থতার জন্য দরকার ‘মিডিয়া ডায়েট’ অর্থাৎ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে সচেতন ও পরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণ। এটি সামাজিক মাধ্যম সম্পূর্ণ ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে না, বরং এর ব্যবহারকে অর্থবহ ও নিয়ন্ত্রণের কথা বলে।
বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু কার্যকর পদ্ধতির কথা বলছেন–প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করা। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম আধঘণ্টা এবং রাতে ঘুমানোর আগে এক ঘণ্টা স্ক্রিন থেকে বিরতি নেওয়া উচিত।
–সপ্তাহে একদিন ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ পালন, যেদিন সামাজিক মাধ্যম সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।
–স্মার্টফোনে ‘স্ক্রিন টাইম’ ট্র্যাকিং অ্যাপ ব্যবহার করে দৈনিক ব্যবহার পর্যবেক্ষণ ও সীমা নির্ধারণ।
–অনুসরণ করা অ্যাকাউন্টগুলো নিয়মিত যাচাই করা যেসব কনটেন্ট নেতিবাচক অনুভূতি তৈরি করে, সেগুলো আনফলো করা।
সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র দুই সপ্তাহ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার অর্ধেকে নামিয়ে আনলে অংশগ্রহণকারীদের ঘুমের মান উন্নত হয়েছে, উদ্বেগ কমেছে এবং মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
রাষ্ট্র, সমাজ ও অভিভাবকের দায়িত্ব
এই সংকট মোকাবিলায় শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা যথেষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ডিজিটাল লিটারেসি’ বা ডিজিটাল সাক্ষরতা বাধ্যতামূলক পাঠ্যক্রমের অংশ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদম কীভাবে কাজ করে, কনটেন্ট কীভাবে তাদের মনোযোগ ধরে রাখে এবং কীভাবে সচেতনভাবে এই প্রভাব থেকে বের হওয়া যায়। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। সন্তানের হাতে স্মার্টফোন দেওয়ার আগে তার ব্যবহার সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা করা, বাড়িতে ‘ফোন-ফ্রি’ সময় নির্ধারণ করা এবং নিজেরাও আদর্শ অনুসরণ করা। এটাই হতে পারে পরিবার থেকে প্রতিরোধের শুরু।
আপনি তরুণ, উত্তর আপনাকেই দিতে হবে
সামাজিক মাধ্যম নিজে সমস্যা নয়। সমস্যা হলো এর অসচেতন, লাগামহীন ব্যবহার এবং ভিউয়ের পেছনে ছোটার এই অন্ধ প্রতিযোগিতা। একটি ভাইরাল ভিডিও হয়তো এক রাতেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়, কিন্তু যে ঘুম হারায়, যে মনোযোগ নষ্ট হয়, যে সম্পর্ক দূরে সরে যায়, সেটির ক্ষতিপূরণ কোনো অ্যালগরিদম করতে পারে না। তরুণ প্রজন্মকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জীবনটা কি স্ক্রিনের ফ্রেমে বন্দি থাকবে, নাকি স্ক্রিনকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আরও বড় জীবন গড়া হবে? উত্তর তরুণদেরই দিতে হবে। তবে যত দ্রুত দেওয়া যায়, ততই মঙ্গল!