চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথ

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ শুধু সাহিত্য ও গান রচনার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। চিত্রকলায় তাঁর অনবদ্য ছাপ লক্ষণীয়। অনেকে বলে থাকেন, চিত্রশিল্পী হিসাবে তাঁর পরিচয় গৌণ। কিন্তু তাঁর আঁকা ছবির ভাণ্ডার বিশাল।

জীবন সায়াহ্নে কবিতার কাটাকুটি করতে গিয়ে আঁকা শুরু করলেন চিত্রকলা। ১৯২৪ থেকে ১৯৪১ সালে মৃত্যু অবধি প্রায় আড়াই হাজার ছবি এঁকে তিনি এক বিস্ময়কর শিল্প প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ পুরোদস্তুর ছবি আঁকা শুরু করেন ১৯২৮ সাল থেকে। রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা বলতে আমরা যা বুঝি তা হলো– সেই সময় থেকে পরবর্তী দশ–বারো বছরে আঁকা তাঁর আড়াই হাজারের ওপর ছবি। নিজের আঁকা ছবি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ঐগুলি কেবল রেখাই নয়, ঐগুলি তার থেকেও কিছু বেশি। আমার চিত্রাঙ্কিত স্বপ্ন এক কাব্যিক কল্পনার দর্শন।’ বেশিরভাগ ছবিই এঁকেছেন। ছোটবেলার আঁকা–আঁকি শেখা পরবর্তীতে শান্তিনিকেতনে চিত্রশিল্প শিক্ষা প্রচলন–এগুলো তো ছিলই। এ ছাড়া পারিবারিকভাবে অগ্রজ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, পুত্র রথীন্দ্রনাথ, পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী –এঁরাও চিত্রচর্চা করতেন। ভ্রাতুষ্পুত্র গগনেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথের মতো আধুনিক ভারতীয় চিত্রশিল্পের পথিকৃতজনদের সার্বক্ষণিক সান্নিধ্য, আলাপ–আলোচনা এবং শিল্প পরিবেশ ইত্যাদির মধ্যে তাঁর ছিল বসবাস। জোড়াসাঁকোয় ঠাকুর পরিবারে প্রিন্স দ্বারকানাথের পুত্র গিরীন্দ্রনাথ এবং তার পুত্র এবং রবীন্দ্রনাথের জ্ঞাতিভাই গুণেন্দ্রনাথ মূলত ছবিই আঁকতেন। আর গুণেন্দ্রনাথের তিন পুত্র গগনেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ তো ভারতের চিত্রকলা জগতে দিকপাল। শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত তাঁদের দুই বোন বিনয়িনী ও সুনয়ানী দেবীকেও বাদ রাখা যাবে না।

শিল্পকলা রবীন্দ্রনাথকে আশৈশব খুব টানতো। তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল রেখা ও রঙের সমন্বয়ে যে ছবি নির্মিত হয় তার মধ্যে প্রাণ ও বাণী সঞ্চারণের ব্যাপারটি। কিন্তু তিনি জীবনের প্রথমভাগে মেনে নিয়েছিলেন যে ছবি আঁকার ব্যাপারটি তাঁর নয়। শৈশবেই খেলার ছলেই তিনি আঁকতে শুরু করেছিলেন, তারপর একসময় তা নেশা হয়ে দাঁড়ায়। কার্যত তা কার্যত রেখা ও রং থেকে ছবি ফুটিয়ে তোলার স্বীয় শক্তির দৈনিক পরীক্ষায় পরিণত হয়। চিত্রকলায় রবীন্দ্রনাথের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না। আঁকতে আঁকতে তিনি আঁকিয়ে। একসময় হয়ে উঠেন দক্ষ। আর ছবির সংখ্যা যখন আড়াই হাজার ছাড়িয়ে যায়, তখন তা’ আর নিছক খেলা থাকে না, তাকে চিত্রসাধনা বলেই স্বীকার করে নিতে হয়।

‘রবীন্দ্র চিত্রকলা জগতের অভিনব সৃষ্টি– অনন্য সাধারণ। তাঁর চিত্রকলা একান্তরূপে তাঁর নিজস্ব, তাঁর ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যের দ্বারা চিহ্নিত। এ চিত্রকলার হুবহু অনুকরণ কারো পক্ষেই যেমন সম্ভবপর নয়, তেমনি মনের মতো করে সমুচিত ব্যাখ্যা দেওয়াও অসম্ভব। কোনো কলা সমালোচক যে একে কোনো বিশিষ্ট কলারীতির অন্তর্ভুক্ত করে দেখাবেন কিংবা তাঁর নিজস্ব কোনো ধরাবাধা তত্ত্বের সঙ্গে মিলিয়ে এর ব্যাখ্যা দেবেন তারও কোনো সম্ভাবনা নেই।’-(অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’–বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত, যার রচিয়তা রবীন্দ্রনাথ। এটি বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের বিভিন্ন ছবিতে ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষ করে জহির রায়হানের অনবদ্য সৃষ্টি ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবির উল্লেখ করা যেতে পারে। শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে গানটির ব্যবহার অন্য দ্যোতনার সৃষ্টি করে। ‘ও আমার দেশের মাটি’ গানটিও অনেক উদ্দীপনামূলক ছবিতে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। নন্দিত সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তাঁর প্রায় নাটক–সিনেমায় রবীন্দ্রনাথের গান সংযোজনে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। নিজের ছবি প্রসঙ্গে রানী চন্দকে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘তুমি জান আমি চিত্রশিল্পী নই। যাই আঁকি না জেনেশুনেই আঁকি। ভেবেচিন্তে আঁকা বা কোনো সুনির্দিষ্ট রূপ দেবার অভিপ্রায়ে সচেতনভাবে আঁকা, আমার পক্ষে অসম্ভব। আমার কাজে নানান ইতস্তত আঁকাআঁকি থেকে কোনো এক পর্যায়ে একটা অবয়ব রূপ ধারণ করে। এমন লোককে কি শিল্পী বলা চলে? নিশ্চয়ই বলা চলে, যদি এই কথা আমরা মনে রাখি যে এই শিল্পী কোনো রকম খোঁজ ছাড়াই পাওয়ার আশায় আঁকেন, ফলে তার প্রাপ্তিতে ভালোমন্দের বেশ বড়ো হেরফের রয়েছে।’ রবীন্দ্রনাথের আঁকা নর–নারীর মুখের ছবিতে যেমন বিশিষ্ট মনের আকৃতি, তেমনি প্রতিকৃতিতে পাওয়া যায় তাদের স্বভাবের বৈশিষ্ট্য। তাঁর চিত্রকলায় অপরূপকে সন্ধানের কোনো আকুলতা নেই। আছে শুধু রূপকে অপরূপ করার সাধনা। তাঁর ছবিতে যে রহস্য, তা অরূপের রহস্য নয়, অপরূপের রহস্য। তাঁর কাব্যের এবং চিত্রকলার পার্থক্য এইখানে। সৃজনশীলতা প্রকাশের যতগুলো মাধ্যম রয়েছে, তার মধ্যে চিত্রকর্ম একটি অন্যতম মাধ্যম। বৈষয়িক জীবনে রবিঠাকুরের মনে যে ভাবাবেগ, আবেগ, উদ্দীপনা, হৃদয়–বেদনা, শক্তির উপলব্ধি ও সৌন্দর্যবোধের উদয় হতো তা তার চিত্রে প্রতিফলিত হতো। ‘পূরবী’ ছবিটি তাঁর আঁকা অন্যতম ছবি। লাতিন আমেরিকার নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সহযোগিতায় ১৯৩০ সালে প্যারিস শহরের পিগ্যাল আর্ট গ্যালারিতে রবীন্দ্রনাথের প্রথম শিল্প প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিভিন্ন দেশে এসব প্রদর্শনী চলে। চিত্রকলার ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্মগুলো এখনো প্রাসঙ্গিক। শিলাইদহ বা শাহজাদপুরে কবির আঁকা চিত্রকর্ম দেখা যাবে। কলকাতার জোড়াসাঁকো বা শান্তিনিকেতনে এ শিল্পকর্ম লক্ষ্য করা যাবে। সময়ের অক্ষর পটে কবি ভাসিয়েছেন ভেলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *