গভীর সাগরে নতুন জগৎ

অস্ট্রেলিয়ার উপকূলীয় শহর কুইন্সল্যান্ডের কোরাল সাগরে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ প্রবাল প্রাচীর গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের সৌন্দর্য আর বিস্ময়কর বাস্তুতন্ত্র দেখে অবাক হননি– এমন সমুদ্রবিজ্ঞানী কমই আছেন। কীভাবে এই বিশাল প্রবাল প্রাচীর গড়ে উঠেছে, সে রহস্য আজও অজানা। এবার সামুদ্রিক বিজ্ঞানীরা দক্ষিণ ইতালির নেপলস উপসাগরের নিচে ১,৬৪০ ফুট (৫০০ মিটার) গভীরে সন্ধান পেয়েছেন এমনই আরেক বিস্ময়কর প্রবাল প্রাচীরের। চমকপ্রদ ও সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্রের অধিকারী এই প্রবাল প্রাচীর দেখে তাই বিজ্ঞানীদের বিস্ময় কাটছে না। তারা বলছেন, এই আবিষ্কারটি দেখায় ভূমধ্যসাগরের অন্যতম পরিচিত উপকূলরেখার নিচেও এমন একটি গভীর বাস্তুতন্ত্র লুকিয়ে আছে, যা এতটাই সমৃদ্ধ যে, সমুদ্রতলের ধারণা ও সংরক্ষণ পদ্ধতি বদলে দিতে পারে।

আর্থ ডটকমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, নেপলসের উপকূলের কাছেই পানির নিচের উপত্যকা ডোর্ন ক্যানিয়নের ভেতরে এই প্রবাল প্রাচীরটি ২৬২ ফুট (৮০ মিটার) উঁচু একটি খাড়া দেয়াল বেয়ে উঠে গেছে। ডাইভিং ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সিএনআর ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেসের জর্জিও ক্যাস্তেল্লান ৬ ফুটের (১ দশমিক ৮ মিটার) চেয়েও বেশি চওড়া প্রবালের গঠন শনাক্ত করেন। সেই দেয়ালজুড়ে ‘ডেসমোফিলুম পারতুসুম’ এবং ‘মাদ্রিপোরা ওকুলাটা’ প্রজাতির ফ্যাকাসে প্রবালগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে না থেকে বিস্তৃত স্তরের মতো গড়ে উঠেছে। এসব প্রবালের এত বড় আকারে বিস্তৃত হওয়া থেকে বোঝা যায়, এই ক্যানিয়নে আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি প্রাণের ধারাবাহিক বাসস্থান রয়েছে; যা ভবিষ্যতে পুনরুদ্ধার কাজ কোথায় করা হবে, তা নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করবে।
খবরে আরও বলা হয়, সূর্যালোক পৌঁছায় না, এমন গভীর অঞ্চলে ঠান্ডা পানির প্রবালগুলো শৈবালের সাহায্যে নয়, বরং স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসা খাদ্য সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে। ক্যানিয়নের খাড়া দেয়াল পানির প্রবাহকে সংকুচিত করে। ফলে খাদ্য সহজে ধরা যায় এবং ঢিলা পলিমাটি সরে যায়, যা নতুন প্রবালের বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারত। তবে একটি সমুদ্র মডেল দেখিয়েছে, খাড়া ঢাল ও শক্তিশালী তলদেশীয় স্রোতই এ ধরনের প্রবাল খুঁজে পাওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। 

ডাইভাররা জানিয়েছেন, এই প্রবাল প্রাচীরের গায়ে কালো প্রবাল, একক প্রবাল, স্পঞ্জ, শামুক-ঝিনুকসহ নানা প্রাণী একই সঙ্গে ভিড় করে বসবাস করছে। একই সঙ্গে এখানে ‘আসেস্তা এক্সকাভাটা’ এবং ‘নিওপাইক্নোডোন্টে জিব্রোই’ নামে সামুদ্রিক দ্বিপাটযুক্ত শামুক প্রজাতির উপস্থিতিও পাওয়া গেছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা প্রবালসদৃশ কাঠামোর অংশ।

গবেষক ক্যাস্তেল্লান বলেন, ইতালির সমুদ্রের জন্য এটি একটি অসাধারণ আবিষ্কার। এমন বৈচিত্র্য ক্যানিয়নটিকে আরও জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে, যা হারিয়ে গেলে পুনর্গঠন করা কঠিন।
বিজ্ঞানীরা আরও বলছেন, নেপলস উপসাগরের নিচে এই ক্যানিয়নের দেয়ালে পুরোনো ঝিনুকের খোলস ও মৃত প্রবালের অংশগুলো আগের বাস্তুতন্ত্রের চিহ্ন হিসেবে রয়ে গেছে। পূর্ববর্তী গবেষণায় পাওয়া একটি শামুকের খোলসের বয়স প্রায় পাঁচ হাজার ৫০০ বছর বলে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা এই বাস্তুতন্ত্রের দীর্ঘ ইতিহাস নির্দেশ করে। ক্যানিয়নের খাড়া দেয়ালে নতুন জীবের লার্ভা ও ভেসে আসা খাদ্যকে শিলার সঙ্গে লাগিয়ে রাখতে সহায়তা করে, ফলে নতুন প্রবাল গঠনের সম্ভাবনা বাড়ে। এ ছাড়া বিভিন্ন ফাটল ও ধাপ তৈরি হওয়ায় নানা প্রজাতির প্রাণী একই জায়গায় সহাবস্থান করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *