কাঠমিস্ত্রি থেকে কিংবদন্তি নায়ক, এখন ৪ হাজার কোটি টাকার মালিক

১৩ জুলাই। আজ হলিউড অভিনেতা হ্যারিসন ফোর্ডের জন্মদিন। ১৯৪২ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে জন্ম নেওয়া ছেলেটি একসময় নিজের সংসার চালাতে কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। সেই মানুষই পরে হয়ে ওঠেন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় দুই চলচ্চিত্র চরিত্র—হ্যান সোলো ও ইন্ডিয়ানা জোনসের মুখ। আট দশক পেরিয়েও তাঁর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি; বরং নতুন প্রজন্মের কাছেও তিনি সমান প্রাসঙ্গিক।

অভিনয়ের স্বপ্ন, কিন্তু শুরুটা ছিল কঠিন
কলেজে পড়ার সময় অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় হ্যারিসন ফোর্ডের। ষাটের দশকে হলিউডে পা রাখলেও বড় কোনো সুযোগ পাচ্ছিলেন না। ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে তিনি কাঠমিস্ত্রির পেশা বেছে নেন। বহু বছর বাড়িঘর সংস্কার, আসবাব তৈরি করেই পরিবার চালিয়েছেন।
পরবর্তী সময়ে হ্যারিসন স্মরণ করেছেন, অভিনয় তাঁকে দীর্ঘদিন জীবিকা দিতে পারেনি। কিন্তু অভিনয়ের স্বপ্ন ছাড়েননি। সেই অধ্যবসায়ই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

ভাগ্য বদলে দেয় ‘স্টার ওয়ারস’
১৯৭৩ সালে ‘আমেরিকান গ্রাফিতি’ ছবিতে নজরে আসেন। পরিচালক জর্জ লুকাস তাঁর প্রতিভা চিনতে ভুল করেননি। ১৯৭৭ সালে ‘স্টার ওয়ারস’-এ হ্যান সোলো চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান হ্যারিসন ফোর্ড। ছবিটি বিশ্বজুড়ে ইতিহাস গড়ে আর রাতারাতি তিনি আন্তর্জাতিক তারকা হয়ে ওঠেন। পরে ‘দ্য এম্পায়ার স্ট্রাইক ব্যাক’, ‘রিটার্ন অব জেদাই’ এবং নতুন ‘স্টার ওয়ারস’ ট্রিলজিতেও একই চরিত্রে অভিনয় করে নতুন প্রজন্মের দর্শকদেরও মুগ্ধ করেন।

ইন্ডিয়ানা জোনস: যে চরিত্র তাঁকে অমর করেছে
হ্যান সোলো হ্যারিসনকে তারকা বানিয়েছিল, কিন্তু ইন্ডিয়ানা জোনস তাঁকে কিংবদন্তির আসনে বসায়।

১৯৮১ সালে ‘রাইডার্স অব দ্য লস্ট আর্ক’ মুক্তির পর বিশ্বের সিনেমাপ্রেমীরা নতুন এক অভিযাত্রিক নায়ককে পেয়ে যায়। চাবুক হাতে, টুপি পরা প্রত্নতত্ত্ববিদ ইন্ডিয়ানা জোনস আজও জনপ্রিয় সংস্কৃতির অন্যতম আইকনিক চরিত্র। এরপর ‘টেম্পল অব ডুম’, ‘দ্য লাস্ট ক্রুসেড’, ‘কিংডম অব দ্য ক্রিস্টাল স্কাল’, ‘ইন্ডিয়ানা জোনস অ্যান্ড ডায়াল অব ডেস্টিনি’—সব কটি ছবিতেই তিনি দর্শকদের রোমাঞ্চের জগতে নিয়ে গেছেন।

শুধু অ্যাকশন নয়, অভিনয়েরও শক্তিশালী কারিগর

অনেকে হ্যারিসনকে শুধু অ্যাকশন তারকা মনে করেন, কিন্তু তাঁর অভিনয়জীবন অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়।

১৯৮২ সালের বিজ্ঞান কল্পকাহিনিভিত্তিক ‘ব্লেড রানার’ আজ বিশ্ব সিনেমার ক্ল্যাসিক। ‘উইটনেস’ ছবিতে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি অস্কারে সেরা অভিনেতার মনোনয়ন পান। ‘দ্য ফিউজিটিভ’, ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’, ‘প্যাট্রিয়ট গেমস’, ‘ক্লিয়ার অ্যান্ড প্রেজেন্ট ডেঞ্জার’, ‘প্রসিউমড ইনোসেন্ট’—প্রতিটি ছবিতেই তিনি ভিন্ন ধরনের চরিত্রে নিজের দক্ষতা দেখিয়েছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও হ্যারিসন থেমে যাননি। মার্ভেল স্টুডিওর ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা: ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড’-এ অভিনয় করে তিনি প্রমাণ করেছেন, বয়স তাঁর কাছে কেবল একটি সংখ্যা।

ব্যক্তিগত জীবনে
হ্যারিসন ফোর্ডের ব্যক্তিগত জীবনও কম আলোচিত নয়। তিনি তিনবার বিয়ে করেছেন। ২০১০ সালে অভিনেত্রী ক্যালিস্তা ফ্লকহার্টকে বিয়ে করেন। তাঁদের সম্পর্ককে হলিউডের সবচেয়ে স্থায়ী দাম্পত্যগুলোর একটি বলা হয়।
ফোর্ডের পাঁচ সন্তান রয়েছে। ব্যস্ত অভিনয়জীবনের কারণে পরিবারকে যথেষ্ট সময় দিতে না পারার আক্ষেপও তিনি প্রকাশ করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি যদি এতটা সফল না হতাম, তাহলে হয়তো আরও ভালো বাবা হতে পারতাম।’

অভিনয়ের বাইরেও আরেক জীবন
অভিনেতা হওয়ার পাশাপাশি হ্যারিসন ফোর্ড একজন দক্ষ পাইলট। নিজের উড়োজাহাজ নিজেই চালান। বহু বছর ধরে পরিবেশ সংরক্ষণে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গেও যুক্ত আছেন। পরিবেশ রক্ষার বিভিন্ন উদ্যোগে তিনি নিয়মিত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

কত সম্পদের মালিক
দীর্ঘ ছয় দশকের অভিনয়জীবনে হ্যারিসন ফোর্ড হলিউডের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেতাদের একজন হয়ে উঠেছেন। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ৩০০–৩৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ৩ হাজার ৬০০ কোটি থেকে ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি)। তাঁর আয়ের বড় অংশ এসেছে ‘স্টার ওয়ারস’ ও ‘ইন্ডিয়ানা জোনস’ ফ্র্যাঞ্চাইজি থেকে। এ ছাড়া অন্যান্য ব্লকবাস্টার সিনেমা এবং সম্পত্তিতে বিনিয়োগ থেকেও বিপুল আয় করেছেন তিনি।

হ্যারিসন ফোর্ড একাডেমি অ্যাওয়ার্ডে মনোনয়ন পেয়েছেন, পেয়েছেন সিসিএ লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট সম্মান। ২০২৬ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অভিনয়শিল্পীদের সংগঠন স্যাড-আফট্রার সর্বোচ্চ সম্মান আজীবন সম্মাননা পুরস্কার লাভ করেন। এই সম্মাননা গ্রহণের সময় তিনি সহকর্মী, পরিচালক জর্জ লুকাস, স্টিভেন স্পিলবার্গ, স্ত্রী ক্যালিস্তা ফ্লকহার্টের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *