বিদেশি নাগরিকত্ব এবং বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন অন্তত ছয় প্রার্থী। দুই প্রার্থী যুক্তরাজ্যের নাগরিক হয়েও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। বাকি চারজন বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য গোপন করে প্রার্থী হয়েছেন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নিজস্ব অনুসন্ধানে এই তথ্য জানিয়েছে। তবে সংস্থাটি এই ছয়জনের নাম-পরিচয় প্রকাশ করেনি। সমকাল তাদের তিনজনের বিষয়ে জানতে পারলেও দালিলিক প্রমাণ না পাওয়ায় নাম প্রকাশ করছে না।
টিআইবির তথ্যানুযায়ী, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের ২৭ জন শতকোটিপতি। তাদের মধ্যে ১৬ জন বিএনপির। ৯ জন স্বতন্ত্র। যাদের সবাই বিএনপির নেতা। প্রার্থীদের ব্যাংক এবং অন্যান্য ঋণ রয়েছে ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকার। বিএনপির ২৮৮ প্রার্থীর মধ্যে ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ ঋণগ্রস্ত। জামায়াতের ২২৪ প্রার্থীর ২২ শতাংশ ঋণগ্রস্ত। শীর্ষ ঋণগ্রস্ত ১০ প্রার্থীর আটজন বিএনপির। শত বিঘার চেয়ে বেশি জমির মালিক ১০ প্রার্থী।
প্রার্থীদের সম্পদের পরিমাণ ছয় হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। তবে তাদের করযোগ্য আয় ৬৯৩ কোটি টাকা। তাঁরা ৫৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা কর দিয়েছেন। ২৫৯ প্রার্থীর তুলনায় তাদের নির্ভরশীল এবং ২৮২ প্রার্থীর তুলনায় তাদের স্বামী বা স্ত্রী স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বেশি।
‘নির্বাচনী হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেছে টিআইবি। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটির এ তথ্য তুলে ধরেন সংস্থাটির কর্মকর্তা মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
বিদেশে থাকা সম্পদ গোপন
হলফনামায় দেওয়া প্রার্থীদের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অন্তত তিন প্রার্থী বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। কিন্তু তাদের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে।
পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এক প্রার্থী বিদেশে তিনটি ফ্ল্যাটের মালিকানা থাকার ঘোষণা দিলেও সংখ্যাটি কমপক্ষে তিন গুণ। ওই প্রার্থীর বিদেশে সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা।
টিআইবি নাম না জানালেও, হলফনামায় আরব আমিরাতে তিনটি ফ্ল্যাট থাকার কথা জানিয়েছেন সম্প্রতি বিএনপিতে ফেরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া এস কে এ একরামুজ্জামান। তিনি ডামি ভোটখ্যাত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে এমপি হয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসন থেকে। নির্বাচন করায় বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। সম্প্রতি তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তাঁকে দলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। তিনি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আরেকজন প্রার্থীও বিদেশে নিজস্ব মালিকানায় থাকা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য গোপন করেছেন। অনুসন্ধান অনুযায়ী, ওই প্রার্থীর ১১টি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেছে। যার মধ্যে আটটিই বাণিজ্যিক কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২১ জন প্রার্থী বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন হলফনামায়। দুইজন প্রার্থী দ্বৈত নাগরিকত্বের নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা সত্ত্বেও তা হলফনামায় দেননি।
একজন প্রার্থীর নির্ভরশীলের নামে ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্যে কেনা ১৪ লাখ পাউন্ড বা ২১০ কোটি টাকায় বাড়ি কেনার তথ্য থাকলেও, তা হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি বলে টিআইবি প্রতিবেদনে জানিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী বাড়ি কিনতে শেল কোম্পানির আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। মূল মালিকানায় কোম্পানির নিবন্ধন দেখানো হয়েছে আরব আমিরাতের দুবাইয়ে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন প্রার্থী বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য না দিলেও, তাঁর স্ত্রীর নামে দুবাইয়ে ফ্ল্যাট রয়েছে।
টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন প্রার্থীর করস্বর্গ হিসেবে পরিচিত একটি দেশে কোম্পানির নিবন্ধন রয়েছে। পুরোনো তথ্য অনেকটাই প্রকাশিত থাকলেও তা হলফনামায় দেননি।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে টিআইবি জানিয়েছিল, শেখ হাসিনার একজন মন্ত্রীর যুক্তরাজ্য ও আরব আমিরাতে অনেক বাড়ি রয়েছে। পরে সমকালের অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই মন্ত্রীর নাম সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। তিনি যুক্তরাজ্যে ২১১টি সম্পদের মালিক।
শতকোটিপতি ২৭ জন
টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী এক হাজার ৮৮১ প্রার্থীর মধ্যে ৮৯১ জন কোটিপতি। নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, ৬২০ কোটির সম্পদের মালিকানা নিয়ে শত কোটিপতির তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী আমিনুল ইসলাম। একই দলের ফেনী-৩ আসনের প্রার্থী ৬০৭ কোটি টাকার সম্পদের মালিক এবং ৫৮১ কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে তৃতীয় স্থানে কুষ্টিয়া-৩ আসনের জাকির হোসেন সরকার।
বৈধ সীমার চেয়ে বেশি জমি
আইনানুযায়ী কোনো ব্যক্তি ১০০ বিঘার বেশি কৃষিজমির মালিক হতে পারবেন না। তবে ১০ প্রার্থী ১৭৩ থেকে প্রায় পৌনে চার হাজার বিঘা জমির মালিক। তাদের মধ্যে ছয়জন বিএনপির প্রার্থী। দুইজন চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনের। একজন করে জামায়াত এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী।
চট্টগ্রাম-১৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. আলী আব্বাস তিন হাজার ৮৭০ বিঘা কৃষি ও অকৃষি জমির মালিক। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন লক্ষ্মীপুর-২ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হেলাল উদ্দিন। তিনি ৬৯০ বিঘা জমির মালিক। তৃতীয় স্থানে থাকা সাতক্ষীরা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রউফ প্রায় ৬৯৩ বিঘা জমির মালিক।
সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ
১০টি রাজনৈতিক দলের তথ্য তুলে ধরে টিআইবি জানিয়েছে, বিএনপির ৫৯ দশমিক ৪১ শতাংশ প্রার্থী ঋণগ্রস্ত। দ্বিতীয় অবস্থানে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা; এই হার ৩২ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং তৃতীয় জাতীয় পার্টির ২৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ প্রার্থী।
সংসদ নির্বাচনে মোট প্রার্থীর সাড়ে ২৫ শতাংশেরই কোনো না কোনো ঋণ বা দায় আছে। প্রার্থীদের সর্বমোট ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণ ১৭ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা।
ব্যবসায়ী, তরুণ ও শিক্ষিত বেশি, নারী কম
টিআইবির তথ্যানুযায়ী, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে তরুণ প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রার্থীদের বয়স ছিল ৭২ বছর। এবার তা ৫১ বছর। ২০৫ জন প্রার্থীর বয়স ২৫ থেকে ৩৪ বছর। ৪১৪ জন ৩৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী।
তবে এবারও নারী প্রার্থী কম। মোট প্রার্থীর মাত্র ৪ দশমিক ০২ জন নারী। তবে এ সংখ্যা গত নির্বাচনের চেয়ে সামান্য বেশি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের দলগুলোতে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ২৪। জামায়াত জোটে এ সংখ্যা ছয়।
এবারের নির্বাচনে ৭৪ দশমিক ৪২ শতাংশ প্রার্থী উচ্চশিক্ষিত। গতবার যা ছিল ৫৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ। হলফনামা অনুযায়ী প্রার্থীদের ৪৮ শতাংশের বেশি প্রার্থীর মূল পেশা ব্যবসায়ী। আইন ও শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন ১২ দশমিক ৬১ এবং ১১ দশমিক ৫৬ শতাংশ প্রার্থী।