অস্কারের রাত মানেই যেন এক আলোকোজ্জ্বল স্বপ্নের মঞ্চ; যেখানে একে একে হাজির হন বিশ্বখ্যাত সব অভিনেতা-অভিনেত্রী, নির্মাতা আর কলাকুশলী। সবার চোখ তখন সেই সোনালি রঙের খামের দিকে। মুহূর্তটি যত এগিয়ে আসে, মিলনায়তনের ভেতর বাড়ে ততই উত্তেজনা। তারপরই শোনা যায় সেই বহুল পরিচিত বাক্য ‘অ্যান্ড দ্য অস্কার গোজ টু…।’
একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস অনুষ্ঠানের এই চেনা দৃশ্য আবারও দেখতে আরও কয়েক ঘণ্টা বাকি। আগামীকাল সোমবার বাংলাদেশ সময় ভোর ৬টায় আবারও দেখা যাবে এই চিত্র। তাইতো পুরো পৃথিবীর বিনোদনপ্রেমীদের নজর এখন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের হলিউডের ডলবি থিয়েটারে। এখানেই ২৪টি বিভাগে সেরা চলচ্চিত্র শিল্পী-কুশলীকে দেওয়া হবে অস্কার পুরস্কার। ৯৮তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসকে ঘিরে এখন চলছে নানান জল্পনা। চলচ্চিত্র দুনিয়ার সবচেয়ে বড় পুরস্কারটি কার কার ভাগ্যে জুটবে তা নিয়ে গোটা দুনিয়ার সিনেমাপ্রেমীদের আগ্রহ তুঙ্গে।
কার হাতে অস্কার!
মোট ২৪টি বিভাগে অস্কার ঘোষণা করা হলেও সবচেয়ে আলোচনার জন্ম দেয় সেরা সিনেমা, সেরা অভিনেতা, সেরা অভিনেত্রী আর সেরা নির্মাতা। চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মাঝে এখন একটাই প্রশ্ন–কে হবেন এবারের বিজয়ী? প্রতি বছর অস্কার নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণীর অন্ত থাকে না। এবারও আছে। অস্কারে কে বিজয়ী হবেন তা অনুমান করা সব সময়ই কঠিন। তারপরও বিশ্লেষণ করে কিছুটা আন্দাজ করা যায় বটে, কিন্তু কোনো কিছুই শতভাগ নিশ্চিত নয়।
এবারে সেরা ছবির দৌড়ে পল টমাস অ্যান্ডারসনের ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’কে অনেকেই এগিয়ে রাখছেন। তার সঙ্গে ভ্যাম্পায়ার ঘরানার হরর সিনেমা ‘সিনার্স’ শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছে। রাজনৈতিক থ্রিলারের ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ ইতোমধ্যে বিভিন্ন আয়োজনে পুরস্কার জিতেছে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, অস্কারেও এটি সেরা ছবির পাশাপাশি সেরা পরিচালকের পুরস্কার এনে দিতে পারে নির্মাতা পল টমাস অ্যান্ডারসনকে। তবে সিনার্সকে হেলাফেলার সুযোগ নেই। ছবিটি এবার অস্কার মনোনয়নে নতুন রেকর্ড গড়েছে। মোট ১৬টি মনোনয়ন; যা আগের রেকর্ডধারী ‘টাইটানিক’, ‘অল অ্যাবাউট ইভ’ এবং ‘লা লা ল্যান্ড’র ১৪টি মনোনয়নকেও ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে ‘হ্যামনেট’ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার জিতেছে। ধারণা করা হচ্ছে এবার লড়াই হবে ‘সিনার্স’, ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার এনাদার’ ও ‘হ্যামনেট’-এর সঙ্গে।
সেরা অভিনেতা বিভাগটি যেন এক রোমাঞ্চকর ধাঁধা। ‘মার্টি সুপ্রিম’ সিনেমায় ১৯৫০-এর দশকের এক পিং-পং খেলোয়াড়ের চরিত্রে টিমোথি শ্যালামের অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের দারুণ প্রশংসা কুড়িয়েছিল। শুরুতে মনে হয়েছিল, অস্কারের সোনালি মূর্তিটি হয়তো তাঁর হাতেই উঠবে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে একে একে সামনে চলে আসেন আরও কয়েকজন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। যেমন ‘দ্য সিক্রেট এজেন্ট’ সিনেমায় ওয়াগনার মৌরা অ-ইংরেজি [ব্রাজিল] ভাষার ছবিতে অভিনয় করে আলোচনায়। অন্যদিকে মাইকেল বি. জর্ডানের অভিনয়ও প্রশংসিত হয়েছে ‘সিনার্স’ ছবিতে। এ ছাড়াও ‘ন্যাশনাল সোসাইটি অব ফিল্ম ক্রিটিকস’ পুরস্কার পাওয়া ইথান হকও পিছিয়ে নেই। এদিকে লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ সিনেমায় দারুণ অভিনয় করলেও, তাঁকে কি সত্যিই দ্বিতীয় অস্কারের জন্য বিবেচনা করা হবে? অনেক সমালোচক মনে করেন, তাঁর এই অভিনয় ‘দ্য রেভেন্যান্ট’-এর মতো যুগান্তকারী নয়। তাই শেষ পর্যন্ত কে জিতবেন, তা বলা এখনও কঠিন।
সেরা অভিনেতার দৌড় যেখানে অনিশ্চিত, সেরা অভিনেত্রীর বিভাগটি কিন্তু অনেকটাই পরিষ্কার। এই দৌড়ে এগিয়ে আছেন জেসি বাকলি। ক্লোই ঝাওয়ের ‘হ্যামনেট’ ছবিতে এক মায়ের চরিত্রে তাঁর অসাধারণ অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের মুগ্ধ করে। গোল্ডেন গ্লোব, ক্রিটিকস চয়েজ এবং বাফটার মতো সব বড় পুরস্কার জিতে তিনি এখন অস্কারের খুব কাছেই। তবে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীরাও কম যান না। ‘ইফ আই হ্যাড লেগস আই’ড কিক ইউ’ ছবিতে সরব উপস্থিতি তৈরি করেছেন রোজ বার্ন। আছেন কেট হাডসন; যিনি প্রায় ২৫ বছর পর ‘অলমোস্ট ফেমাস’ সিনেমার পর ‘সং সাং ব্লু’ ছবিটি দিয়ে অস্কারের দৌড়ে এসে আলোচনায়। অন্যদিকে নরওয়েজিয়ান অভিনেত্রী রেনাতে রেইনসভে ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ ছবিতে অসাধারণ অভিনয় করে তাক লাগিয়েছেন। এমা স্টোন তো আছেনই। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে সাতটি অস্কার মনোনয়নের রেকর্ড গড়া এই অভিনেত্রী ইয়োর্গোস ল্যান্থিমোসের ‘বুগোনিয়া’য় অদ্ভুত সুন্দর এক চরিত্রে হাজির হয়েছেন।
অস্কারের আলো সাধারণত মূল চরিত্রগুলোর ওপরই পড়ে। কিন্তু কখনও কখনও পার্শ্ব চরিত্ররাই গল্প বদলে দেন। এবার সেরা পার্শ্ব অভিনেতা ও অভিনেত্রীর লড়াই ঠিক তেমনই। এবার হ্যাটট্রিক অপেক্ষায় আছেন শন পেন। ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ সিনেমায় এক ক্ষমতাধর রাজনীতিকের চরিত্রে অভিনয় করে এরই মধ্যে তিনি অ্যাক্টর অ্যাওয়ার্ডস জিতেছেন। এখন অস্কারের খুব কাছে। এখানে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী তরুণ অভিনেতা জ্যাকব এলোর্ডি। গিয়ের্মো দেল তোরোর ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ সিনেমায় দানবের চরিত্রে তিনি ক্রিটিকস চয়েস অ্যাওয়ার্ডস জিতেছেন। অন্যদিকে ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ ছবিতে জোয়াকিম ট্রায়ারের এক বৃদ্ধ শিল্পীর চরিত্রে স্টেলান স্কার্সগার্ডের অসাধারণ অভিনয় তাঁকে এনে দেয় গোল্ডেন গ্লোব।
পার্শ্ব অভিনেত্রীর লড়াইটাকে এক কথায় বলা চলে জমজমাট। একেকটা পুরস্কার আসর একেকজনকে বিজয়ী করেছে, আর প্রতিযোগিতাকে করেছে আরও কঠিন। টিয়ানা টেলর একমাত্র অভিনেত্রী যিনি ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ সিনেমার জন্য সবকটি বড় আসরেই মনোনয়ন পেয়েছেন। গোল্ডেন গ্লোব আর ন্যাশনাল সোসাইটি অব ফিল্ম ক্রিটিকসের পুরস্কার তাঁর সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল করেছে। অন্যদিকে বাফটা জিতে সমীকরণে এসেছেন উনমি মোসাকু। ‘সিনার্স’ ছবিতে এক আত্মত্যাগী মায়ের চরিত্রে তাঁর অভিনয় দেখলে চোখ ফেরানো দায়। তারপর আছেন অ্যামি ম্যাডিগান। ‘উইপন্স’ ছবির জন্য ক্রিটিকস চয়েস ও অ্যাক্টর অ্যাওয়ার্ডস জিতে কিছুটা এগিয়েও রয়েছেন তিনি। অস্কার মঞ্চে এই বিভাগটিই সবচেয়ে অনিশ্চিত আর রোমাঞ্চকর। শেষ হাসি কে হাসেন, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।
এবারের সঞ্চালক ও লালগালিচার জৌলুস
আমেরিকান টিভি তারকা কোনান ও’ব্রায়েন একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের ৯৮তম আসর সঞ্চালনা করবেন। এই নিয়ে টানা দু’বছর এই দায়িত্বে দেখা যাবে তাঁকে। আয়োজকেরা এবার ৯০০ ফুট দীর্ঘ লালগালিচা রেখেছেন। বরাবরের মতো পুরস্কার বিতরণ শুরুর আগে বিশ্বের নামিদামি তারকারা বলগাউন ও প্যান্টস্যুটসহ নজরকাড়া পোশাকে ও দামি অলঙ্কারে জৌলুস ছড়াবেন। আমন্ত্রিত অতিথিদের অনুভূতি জানতে ডলবি থিয়েটারের বাইরে ‘রেড কার্পেট শো’ সঞ্চালনা করবেন আমেরিকান জনপ্রিয় টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ট্যামরন হল ও জেসি পামার। বাংলাদেশ সময় রোববার দিবাগত রাত ৪টা ৩০ মিনিটে শুরু হবে এ আয়োজন। ৩০ মিনিটের এই বিশেষ আয়োজনে থাকবে অস্কারের মনোনীত অভিনয়শিল্পী, কলাকুশলী এবং পারফরমারদের নানা বিষয়।
মঞ্চ মাতাবেন যারা
৯৮তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের মঞ্চ শুধু পুরস্কার বিতরণীর জন্যই নয়; বরং সেটি হবে এক অনন্য সাংস্কৃতিক উৎসব। নির্বাহী প্রযোজক রাজ কাপুর ও ক্যাটি মুলান ঘোষণা দিয়েছেন, এবারের আয়োজন হবে চলচ্চিত্র ও সংগীতের এক মায়াবী মিলনক্ষেত্র। প্রযোজকরা জানিয়েছেন, এবারের সংগীত পরিবেশনা সাজানো হয়েছে দুটি আলোচিত ‘সিনার্স’ এবং ‘কেপপ ডেমন হান্টার্স’ ঘিরে। ঐতিহ্যবাহী কোরীয় বাদ্যযন্ত্রের সুরে-তালে ‘কেপপ ডেমন হান্টার্স’ ছবির ‘গোল্ডেন’ গাইবেন ইজেএই, অড্রে নুনা এবং রেই আমি। কোরীয় নৃত্য আর আধুনিক পপ সংস্কৃতির মিশেলে এই পরিবেশনা হবে রীতিমতো চোখ ধাঁধানো। অন্যদিকে ‘সিনার্স’ সিনেমার ‘আই লায়েড টু ইউ’ পরিবেশন করবেন রাফায়েল সাদিক ও মাইলস ক্যাটন। এই গানে থাকবে ব্লুজ, গসপেল আর সোলের মিশেলে। শুধু এই দুই ছবির গানেই শেষ নয়, থাকছে আরও বেশ কয়েকটি পরিবেশনা।
প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার অস্কার অনুষ্ঠানটি সরাসরি প্রচার করবে যুক্তরাষ্ট্রের এবিসি চ্যানেল। এবিসি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশে সরাসরি দেখানো হবে এই আয়োজন। বাংলাদেশে স্টার মুভিজ এসডি, স্টার মুভিজ এইচডি, স্টার মুভিজ সিলেক্ট এসডি, স্টার মুভিজ সিলেক্ট এইচডি চ্যানেলে উপভোগ করা যাবে অনুষ্ঠানটি।