মোগলদের হাত ধরে এ দেশে ঈদ উৎসবের সূচনা

বাংলায় ঘটা করে ঈদ উদ্‌যাপনের ইতিহাসের সূচনা মোগলদের হাত ধরে। তার আগে বাংলা অঞ্চলে জাঁকজমকভাবে ঈদ–উৎসব বা ঈদের সংস্কৃতির খোঁজ সেভাবে মেলে না। ইতিহাস ঘাঁটলে এ অঞ্চলে প্রথম যে ঈদগাহের সন্ধান মেলে, সেটি ১৬৪০ সালের দিকে ধানমণ্ডিতে নির্মিত এবং শাহি ঈদগাহ নামে পরিচিত। বাংলার সুবেদার শাহ সুজার নির্দেশে তাঁর প্রধান অমাত্য মীর আবুল কাসেম এটি নির্মাণ করেন। ঢাকার ইতিহাসবিদ হেকিম হাবিবুর রহমানের লেখা থেকে জানা যায়, ১৬৪০ সালে প্রথম দিকে গড়ে ওঠা ধানমণ্ডির ওই ঈদগাহে সবার যাওয়ার সুযোগ ছিল না, কেবল নবাব, উচ্চপদস্থ রাজ কর্মচারী, কাজি–হাকিম এবং তাঁদের বন্ধুবান্ধবই ঈদগাহে যেতেন।

পরে সতের শতকের দিকে সিলেটের প্রথম ঈদগাহ শাহি ঈদগাহ এবং আঠারো শতকে কিশোরগঞ্জের নরসুন্দার তীরে শোলাকিয়াহ ঈদগাহসহ পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঈদগাহ বা ঈদের মাঠের গোড়াপত্তনের মধ্য দিয়ে মূলত মুসলমানদের এই প্রধান ধর্মীয় উৎসব পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

ইতিহাস বলছে, মোগল শাসক ও সুফী– দরবেশদের হাত ধরে বাংলার ঈদ–উৎসব দিনে দিনে বর্ণিল হতে শুরু করে। উৎসবকে আরও সপ্রাণ করতে ধীরে ধীরে এতে যুক্ত হয় ‘ঈদ–মিছিল’, ‘চানরাতের উৎসব’, ‘মেহেদি উৎসব’, ‘ঈদ মেলা’সহ বিচিত্র সব অনুষঙ্গ।

ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন ঢাকা সমগ্র গ্রন্থে জানাচ্ছেন, এই ঈদ শোভাযাত্রা বা আনন্দমিছিল ঢাকার নিমতলি প্রাসাদ থেকে চকবাজার, হোসেনি দালান ঘুরে আবার ফিরে আসত প্রাসাদে। আর ওই শোভাযাত্রা থেকে গরিব আদমিদের পয়সা ছিটিয়ে দেওয়া হতো।

এখন ঈদের চাঁদ দেখাকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়, সেকালেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ঈদের মূল আনন্দ শুরু হতো ঈদের চাঁদ দেখার মধ্য দিয়ে। ঈদের চাঁদ দেখতে কেউ নৌকা নিয়ে যেতেন বুড়িগঙ্গায়, কেউবা কেল্লায় উঠতেন। চাঁদ দেখার জন্য নবাববাড়ির ছাদই ছিল সবচেয়ে উপযুক্ত। চাঁদ দেখা গেলে নবাববাড়ি থেকে তোপধ্বনির আওয়াজ শোনা যেত। সন্ধ্যায় মোমবাতির আলোয় আলোকিত হতো মোগল আমলের ঢাকা।

সৈন্য শিবিরে বেজে উঠত শাহি তূর্য। সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলত আতশবাজির খেলা। গবেষক আনোয়ার হোসেন আমার সাত দশক বইয়ে জানাচ্ছেন, চাঁদ দেখার পর ঈদকে স্বাগত জানিয়ে কিশোরেরা মিছিল করত এবং কাসিদা গাইত। ঢাকায় চাঁদরাতে কী হতো, তার সবিস্তার বর্ণনা পাওয়া যায় আবু যোহা নুর আহমদের বই উনিশ শতকের ঢাকার সমাজ জীবন–এ। এতে তাঁর ভাষ্য, ‘চাঁদ দেখামাত্রই চারিদিক হইতে মোবারকবাদ, পরস্পর সালাম বিনিময় এবং গোলাবাজি ও তোপের আওয়াজ হইতে থাকিত।’

বিশ শতক পর্যন্ত ঈদের কেনাকাটা সাধারণ চাঁদরাতেই হতো। ছেলেরা কাগজের টুপি কিনত, মেয়েরা কিনত চুড়ি। তবে বর্তমানে ঈদ সামনে রেখে যেভাবে নতুন জামা–জুতা কেনার হিড়িক পড়ে, বাঙালি মুসলমান সমাজে এই চল খুব বেশি দিন গড়ে ওঠেনি। ইতিহাস থেকে জানা যায়, এ অঞ্চলে মাত্র কয়েক দশক আগ থেকে ঈদ উপলক্ষে মানুষ দর্জিবাড়িতে যাতায়াত শুরু করে। লোকসংস্কৃতিবিদ প্রয়াত শামসুজ্জামান খানের ‘বাঙালি মুসলমানের ঈদ’ প্রবন্ধে এ কথার সপক্ষে সাক্ষ্যও পাওয়া যাচ্ছে। তিনি লিখেছেন, ‘সেসময়কার সাধারণ মানুষ ধুতি পরতেন। নামাজের সময় ধুতির পেছনের গিঁঠ খুলে দিতেন।’

সেকালের ঈদ সম্পর্কে রাজনীতিক ও সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ তাঁর আত্মকথায় লিখেছেন, ‘ঈদের জামায়াতেও লোকেরা কাছাধুতি পরিয়াই যাইত। নমাজের সময় কাছা খুলিতেই হইত। সে–কাজটাও নমাজে দাঁড়াইবার আগে তবু করিত না। প্রথম প্রথম নমাজের কাতারে বসিবার পর অন্যের অগোচরে চুপি চুপি কাছা খুলিয়া নামাজ শেষ করিয়া কাতার হইতে উঠিবার আগেই কাছা দিয়া ফেলিত।’ তিনি অন্যত্র লিখেছেন: ‘তরুণদের ত কথাই নাই, বয়স্করাও সকলে রোজা রাখিত না। তারাও দিনের বেলা পানি ও তামাক খাইত। শুধু ভাত খাওয়া হইতে বিরত থাকিত। পানি ও তামাক খাওয়াতে রোজা নষ্ট হইত না, এই বিশ্বাস তাদের ছিল।’

পাশাপাশি ঈদ মেলার সংস্কৃতিটি খুব দ্রুতই বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে ছড়িয়ে পড়ে। গত শতকের ষাট ও সত্তরের দশকের সামাজিক ইতিহাসের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, ঈদকে কেন্দ্র করে বাংলার গ্রামীণ জনপদে মেলার যে সংস্কৃতি শুরু হয়, দ্রুতই তা ঈদের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ, কবি জসীমউদ্‌দীন প্রমুখ মনীষীর আত্মস্মৃতিতে সেকালের ঈদ উদ্‌যাপনের টুকরা টুকরা বিবরণ আছে। সেখান গত শতকের ঈদ–সংস্কৃতির চিত্র ফুটে ওঠে। জানা যায়, ঈদের সকালে শিশু–কিশোরেরা মুরব্বিদের কাছ থেকে ঈদসালামি সংগ্রহ করে তারপরই ঈদগাহে যেত। পরে ঈদের নামাজ শেষে ঈদগাহ থেকে ফেরার পথে মেলা থেকে নানা রকম খেলনা আর খাবার কিনে বাড়ি ফিরত। সে সময় এগুলোই ছিল ঈদের আনন্দময় স্মৃতি। শুধু ঈদ মেলা নয়, সেকালের ঈদের আনন্দ আরও ঝলমলে হয়ে উঠেছিল বিচিত্র সব ক্রীড়ামূলক আয়োজনে। যেমন ঈদকে ঘিরে নৌকাবাইচ, ঘোড়দৌড় বা বিভিন্ন ধরনের খেলা হতো। আঠারো শতকের শেষ বা উনিশ শতকের শুরু থেকে ঈদ উপলক্ষে বাংলার বিভিন্ন গ্রামে এই খেলাধুলার প্রচলন হয় বলে গবেষকদের অনুমান। যদিও এ অঞ্চলে নৌকাবাইচ, ঘোড়দৌড় বা নানা রকমের প্রতিযোগিতার ইতিহাস বেশ পুরোনো।

বলা বাহুল্য, পূর্ব বাংলার কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজে বিত্তহীনতা ও নগদ পয়সার অভাব থাকায় দরিদ্র কৃষি পরিবারে ঈদ উৎসবের কোনো ধুমধাম ছিল না। ঔপনিবেশিক ইংরেজ আমলের শেষ দিকেও গ্রামীণ মধ্যবিত্ত পরিবারের যাঁরা শহরে চাকরি করতেন বা ছোটখাটো ব্যবসা বা ওকালতি করতেন, তাঁদের বাড়িতে ঈদের দিনের খাদ্যতালিকায় পোলাও–কোরমা–জর্দার দেখা মিলত। তাঁদের সন্তানসন্ততিরাও ভালো কাপড়চোপড় পেত মা–বাবার কাছ থেকে। এসব পরিবারের বড়রাও ঈদে নতুন জামাকাপড় কিনতেন। কিন্তু বিপুলসংখ্যক দেহাতি মানুষ প্রায় ভুখানাঙ্গা অবস্থায়ই ঈদের দিনটি অতিক্রম করেছে। জাকাতের দান–খয়রাত, মসজিদের শিরনি বা সম্পন্ন গৃহস্থবাড়ি থেকে দেওয়া কিছু ভালো খাবারই ছিল তাদের ঈদের দিনের সম্বল।

ঐতিহাসিকদের মতে, উনিশ শতকের গোঁড়ার দিকে যখন এ অঞ্চলে মুসলমানের সংখ্যা বাড়তে থাকে, তখন ঈদ পালনর ব্যাপকতা বাড়তে থাকে। তবে শুরুটা হয়েছিল ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র হবার পর – যা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আস্তে আস্তে বিস্তৃত হতে থাকে। বস্তুতঃ ঈদ এখন বাঙালি মুসলমানের সর্ববৃহৎ জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *