গাছের ডালে ডালে লাফিয়ে বেড়ানো ছোট্ট, চঞ্চল প্রাণীটি আমাদের সবার চেনা – কাঠবিড়ালি। তার দেহের রঙ বাদামি বা ধূসর, চোখ দুটি কৌতূহলে ভরা, আর ঝাঁকড়া লেজ যেন একখণ্ড তুলোর মেঘ। শিশুরা যেমন তাকে ভালোবাসে, তেমনি প্রকৃতিবিদরাও তাকে দেখেন এক বুদ্ধিমান ও পরিশ্রমী জীব হিসেবে। কাঠবিড়ালির জীবন আমাদের শেখায় কীভাবে ক্ষুদ্রতা সত্ত্বেও জীবনে বুদ্ধি, সতর্কতা ও অধ্যবসায় দিয়ে টিকে থাকা যায়।
কাঠবিড়ালির ইংরেজি নাম ঝয়ঁরৎৎবষ, আর বৈজ্ঞানিক নাম ঝপরঁৎঁং াঁষমধৎরং। এটি স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং জড়ফবহঃরধ গোত্রের অন্তর্ভুক্ত, অর্থাৎ ইঁদুর জাতীয় প্রাণীর ঘরানার সদস্য। পৃথিবীতে প্রায় ২০০টিরও বেশি প্রজাতির কাঠবিড়ালি আছে। এরা সাধারণত ইউরোপ, এশিয়া, উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকা মহাদেশের বনাঞ্চলে দেখা যায়। বাংলাদেশেও গ্রামগঞ্জের গাছপালায় ও শহরের পার্কে সহজেই চোখে পড়ে এদের দৌড়ঝাঁপ।
কাঠবিড়ালির দৈর্ঘ্য সাধারণত ২০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার এবং লেজ প্রায় সমান লম্বা। লেজটি শুধু ভারসাম্য রক্ষার জন্য নয়, বরং শীতের দিনে শরীর গরম রাখার জন্যও ব্যবহৃত হয়। তারা খাবার সংগ্রহ করতে ও গাছে ওঠানামা করতে অত্যন্ত দক্ষ। তাদের ছোট্ট তীক্ষ্ন নখর আর নমনীয় দেহের কারণে তারা চোখের পলকে গাছের এক ডাল থেকে অন্য ডালে ছুটে যেতে পারে। তাদের শ্রবণশক্তি ও ঘ্রাণশক্তি প্রবল। এ কারণে দূর থেকে বিপদ বুঝতে পারে, এমনকি শিকারির উপস্থিতিও তারা আঁচ করতে পারে। একে সত্যিই বলা যায় “চালাক কাঠবিড়ালি”।
কাঠবিড়ালি প্রধানত ফল, বাদাম, বীজ, ছোট পোকামাকড় ও কখনো ফুলের মধু খায়। শীতের সময় খাবারের অভাব দেখা দিলে তারা আগে থেকেই খাবার মজুত করে রাখে। বাদাম বা ফল তারা মাটির নিচে পুঁতে রাখে, পরে যখন ক্ষুধা লাগে তখন খুঁজে বের করে খায়। আশ্চর্যের বিষয়, অনেক সময় তারা সেই জায়গাটা ভুলে যায়–ফলে পোঁতা বাদাম থেকেই নতুন গাছ গজিয়ে ওঠে। একভাবে কাঠবিড়ালির এ ভুল প্রকৃতির পুনর্জন্মে ভূমিকা রাখে।
তারা সাধারণত গাছের ফাঁকে বা ডালের কোণে শুকনো পাতা, ঘাস ও নরম উপকরণ দিয়ে গোলাকার বাসা বানায়। একেকবারে মাদি কাঠবিড়ালি ২ থেকে ৫টি বাচ্চা দেয়। মা কাঠবিড়ালি অত্যন্ত যত্নে সন্তানদের লালন করে, বিপদ বুঝলে নিজের দেহ দিয়ে সন্তানকে আড়াল করে রাখে। প্রায় ৫ থেকে ৬ মাস বয়সেই ছোট কাঠবিড়ালিরা নিজেরা খাবার খুঁজে নিতে শেখে। তাদের গড় আয়ু সাধারণত ৬ থেকে ১২ বছর, তবে বন্য পরিবেশে নানা শিকারি প্রাণীর কারণে অনেকেই দীর্ঘকাল বাঁচে না।
কাঠবিড়ালি তার খাবার বা আশ্রয় রক্ষা করতে যে রকম বুদ্ধি ব্যবহার করে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। যদি কোনো পাখি বা শিকারি প্রাণী তাকে অনুসরণ করে, তখন সে অভিনয় করে খাবার লুকিয়ে রাখছে এমন ভান করে, কিন্তু প্রকৃত খাবার অন্য জায়গায় গোপন করে দেয়। এই আচরণ প্রমাণ করে যে কাঠবিড়ালি শুধু প্রবৃত্তিনির্ভর প্রাণী নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম এক ক্ষুদ্র বুদ্ধিমান প্রাণী।
মানুষের সঙ্গে কাঠবিড়ালির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। অনেক দেশে এটি ঘরোয়া পোষা প্রাণী হিসেবেও জনপ্রিয়। তার মিষ্টি স্বভাব, নরম গায়ের লোম আর অদ্ভুত কৌতূহলময় চোখ মানুষকে আকৃষ্ট করে। শিশুসাহিত্যেও কাঠবিড়ালির চরিত্র বারবার ফিরে আসে-‘ছোট্ট কাঠবিড়ালির গল্প’, ‘বাদাম চোর’, কিংবা ‘লেজ নেড়ে লাফানো বন্ধু’ নামে নানা গল্পে শিশুদের প্রিয় চরিত্র সে। কাঠবিড়ালি শুধু সুন্দর প্রাণীই নয়, প্রকৃতির জন্যও উপকারী। তারা বীজ ছড়িয়ে নতুন গাছ জন্মাতে সাহায্য করে, ফলে বন পুনরুজ্জীবনে ভূমিকা রাখে। অনেক বিজ্ঞানী কাঠবিড়ালিকে “প্রকৃতির মালী” বলে অভিহিত করেন–কারণ তাদের ছড়ানো বীজ থেকেই একদিন নতুন অরণ্য গড়ে ওঠে।
ক্ষুদ্র দেহের কাঠবিড়ালি আমাদের শেখায় বড় জীবনের শিক্ষা–পরিশ্রম, বুদ্ধি, আর ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি। যে প্রাণীটি সারাক্ষণ দৌড়ঝাঁপ করে, গাছের ডালে ডালে ছুটে বেড়ায়, তার ভেতর লুকিয়ে আছে প্রকৃতির এক অনন্য জ্ঞানের ভাণ্ডার। কাঠবিড়ালি যেন এক ছোট্ট কবিতা– প্রকৃতির ছন্দে নাচে, জীবনের বুদ্ধিতে বাঁচে।