কাগজের জাহাজ

আবির সাত বছর বয়সী। থাকে শহরের এক পুরোনো গলির ভাঙাচোরা বাসায়, মা–বাবা আর ছোট বোন আনাইশার সঙ্গে। বাবা রাজমিস্ত্রি, মা বাসাবাড়িতে কাজ করেন।

আবিরের স্বপ্ন একটাই। একদিন বড় হয়ে সে ইঞ্জিনিয়ার হবে। দারুণ সব জাহাজ বানাবে। এখনো সে বানায়, তবে কাগজের। পুরোনো খাতা, খবরের কাগজ, এমনকি বাসার চালানের কাগজ দিয়ে সে বানায় অসংখ্য কাগজের জাহাজ। তাতে সে নামও দেয়, ‘আবির–এক’, ‘স্বপ্ন–নয়’, ‘আনা–সেভেন’।

আবির কখনো ক্লাসে ফাঁকি দেয় না। কিন্তু এক জিনিস সে করতে পারে না। মিথ্যা বলা।

একদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় আবির দেখল, পাশের বাসার ছাদের কিনারায় একটা ছেঁড়া ব্যাগ পড়ে আছে। ভেতর থেকে যেন কাগজ উঁকি দিচ্ছে। সে কৌতূহলে ছুটে যায়। খুলে দেখে, ভেতরে অনেকগুলো নতুন প্যাকেট, চকচকে কাগজে মোড়ানো। দেখে সে থমকে যায়। ওগুলো ড্রয়িং খাতা, রঙিন পেনসিল, ক্রেয়ন, মার্বেল, খেলনা গাড়ি, এমনকি চকোলেটও। এক পাশে একটা ছোট চিঠি, ‘বাচ্চাদের উপহার’। পাশে লেখা, ‘মুন ফাউন্ডেশন’।

আবির ভাবল, আচ্ছা… এগুলো কি আমাদের পাড়া শিশুকেন্দ্রে দেওয়া হবে? তার বুক কাঁপল, চোখ গেল কাগজের গাড়িগুলোর দিকে। সে কোনওদিন এত সুন্দর জিনিস একসাথে দেখেনি।

কেউ দেখেনি তো?’ সে নিজেকে জিজ্ঞেস করল। চারপাশে কেউ নেই। সে ব্যাগটা চুপচাপ বাড়ির ভাঙা বাথরুমের পাশে পুঁতে ফেলল। বোন আনাইশাকে কিছু বলল না। স্কুলেও কাউকে না।

তিন দিন কেটে যায়। আবির বাড়ি ফিরে দেখে পাশের ঘরের মমিন কাকার মুখ কালো হয়ে গেছে। কাকা এলাকায় শিশুদের জন্য একটি ছোট পাঠশালা চালাতেন। বললেন, ছোটদের ওসব দিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। ছাদে শুকাতে দিয়েছিলাম ব্যাগটা… কোথায় গেল?’

লোকজন বলল, ‘চুরি গেছে, বুঝলে? এ পাড়ায় এখন আর ভালো মানুষ নাই।’

আবির চুপচাপ সব শুনল। রাতভর ঘুম এল না। পরদিন স্কুলে সে হেডস্যারের রুমে গেল। দরজা ভেজা ছিল। সে ধীরে ঢুকে বলল, ‘স্যার, আমি একটা কথা বলতে চাই… কিন্তু বললে সবাই রাগ করবে, তাই আমি কাগজে লিখে রেখে যাচ্ছি।’

সে একটা ছোট চিঠি দিয়ে চলে গেল।

দুপুরে স্কুলে মাইক দিয়ে ঘোষণা হলো, ‘যে শিশু আমাদের চুরি যাওয়া ব্যাগ উদ্ধার করেছে, তার সততা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।’

সবাই চমকে গেল। আবির কিছু বোঝার আগেই হেডস্যার ও মমিন কাকা এসে তাকে সামনে ডাকলেন। কেউ কিছু বলেনি। তারা শুধু কাঁধে হাত রাখলেন।

মমিন কাকা বললেন, ‘চুরি নয়, ভুল হয়েছিল। আর ভুল মানে শেষ নয়, যদি মনের ভেতরে আলো থাকে।’ পরদিন সবার হাতে একটা করে উপহার। কিন্তু আবিরের জন্য আলাদা একটা মোটা ড্রয়িং খাতা। সেখানে লেখা– ‘আবিরের স্বপ্ন–জাহাজ একদিন সত্যি হবে। কারণ সে শুধু স্বপ্ন দেখে না, সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *