কনসার্ট ফর বাংলাদেশের নেপথ্য কথা

জর্জ হ্যারিসন। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়া ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর আয়োজক। ২০০৯ সালের ১৩ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ‘শিকাগো নাও’ পত্রিকায় প্রকাশিত সেই ঐতিহাসিক আয়োজনের নেপথ্য ঘটনার কথা তুলে এনেছেন মো. মাহমুদুল হাসান

ভাঙন ও বন্ধুত্ব

‘বিটলস’ ব্যান্ডটি ভেঙে যাওয়ার পর, সেটির পরিচয় থেকে বেরিয়ে, একক ক্যারিয়ারেই মন দিয়েছিলেন হ্যারিসন। তাঁর একক রেকর্ড ‘অল থিংস মাস্ট পাস’ ব্যাপক সাফল্য পায়। অনেকের মতে, এটি যেকোনো বিটলস সদস্যের শ্রেষ্ঠতম সলো অ্যালবাম। ‘ডিলেনি অ্যান্ড বনি’তে বেশ কয়েকটি লাইভ শোতেও পারফর্ম করেন তিনি। তাতে করে লিয়ন রাসেল, জিম কেল্টনার, ডন প্রিস্টন ও জিম হর্নের মতো মিউজিশিয়ানের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় তাঁর। এ সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য তাঁর আয়োজন করা কনসার্টটি সফলে নেপথ্য ভূমিকা রেখেছে।

চ্যালেঞ্জ ও আত্মবিশ্বাস

১৯৭১ সালে এমন একটি আয়োজন ছিল রীতিমতো চ্যালেঞ্জের। নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন–ভেন্যুটা সহজেই পাওয়া গেছে। তবে মিউজিশিয়ান পাওয়া অত সহজ ছিল না। হ্যারিসন ও তাঁর তখনকার স্ত্রী প্যাটি বয়েড মিলে তৈরি করেছিলেন সেই কনসার্টের মিউজিশিয়ানের তালিকা। রিঙ্গো স্টারকে খুব সহজেই রাজি করাতে পেরেছিলেন তারা। জিন কেল্টনার, ক্লজ ভুরমান ও বিলি প্রিস্টন যোগ দিলেন। তাদের ক্যারিয়ারের জন্য সেটি ছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ এক রাত। এরিক ক্ল্যাপটন, লিয়ন রাসেল, পল ম্যাকার্টনি ও জন লেননকেও নিমন্ত্রণ জানালেন তারা। রাসেল চাইলেন নিজের ব্যান্ডটিকেও হাজির করতে। তবে শুরু থেকেই হাজির হওয়ার ব্যাপারে অনীহা ছিল পল ম্যাকার্টনির। এটিকে ‘বিটলস’-এর একটি পুনর্মিলনী হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন তিনি; আর সেটির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তবে জন লেনন বেশ আগ্রহ দেখালেন। কনসার্টটির দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসার এক সপ্তাহ আগ পর্যন্ত এতে পারফর্ম করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করলেন।

বব ডিলানের অবিস্মরণীয় মুহূর্ত

সেই আয়োজনে নানান নাটকীয়তা থাকলেও ছিলেন বব ডিলান। অন্য যে কারও চেয়ে, ববের উপস্থিতিই মনেপ্রাণে বেশি চাইছিলেন হ্যারিসন। মিউজিকের এ ঐতিহাসিক কনসার্টে ববের উপস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ ভেবেছিলেন তিনি। প্রস্তাব পেয়ে ববের মাথা থেকে একটা আইডিয়া এলো। বাংলাদেশের শরণার্থীদের সাহায্য করতে চাইলেন তিনি। কিন্তু ভয় ছিল তাঁর একটাই, মঞ্চভীতি! এর আগে, কয়েক বছর ধরে, দর্শকদের সামনে সরাসরি পারফর্ম করেননি তিনি। কোনো ব্যান্ডের ফ্রন্টম্যান হিসেবে কখনোই পারফর্ম করার অভিজ্ঞতা ছিল না তাঁর। বিটলসের সর্বশেষ কনসার্টটিও হয়ে গিয়েছিল কয়েক বছর আগে। ফলে ববকে সাহস জোগালেন হ্যারিসন; বললেন, আমি যদি পারি, তুমিও পারবে। তবে কনসার্টটি শুরু হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত কেউই নিশ্চিত ছিলেন না, বব আদৌ পারফর্ম করবেন কিনা। শেষ পর্যন্ত তিনি তা করেছিলেন, আর সেটি তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অবিস্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে আছে।

১৯৭১ সালে প্রযুক্তি এত সহজলভ্য ছিল না। তবু হ্যারিসনের নিরলস প্রচেষ্টায় কনসার্টটি হয়ে উঠেছিল ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *