এনিমেল ফার্ম

২০২৬ সালে, যখন বিশ্ব রাজনীতিতে ‘ফেক নিউজ’ এবং ‘পোস্ট–ট্রুথ’ শব্দগুলো দৈনন্দিন হয়ে উঠেছে, যখন লিডাররা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে পাওয়ার দখল করে, তখন জর্জ অরওয়েলের ‘এনিমেল ফার্ম’ যেটা প্রায় ৮১ বছর আগের লেখা, সেটা এখনও সমসাময়িক মনে হয়। কারণ ১৯৪৫–এর প্রকাশের সময় এটি ছিল রুশ বিপ্লবের পরবর্তী স্তালিনীয় যুগের এক নির্মম রূপক। আজও এই গল্প পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিপ্লবের আদর্শ কীভাবে ক্ষমতার হাতে বিকৃত হয়ে যায়–সেই চিরন্তন প্রশ্নের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।

১৯৩২ সালে আইনস্টাইন আর ফ্রয়েডের চিঠিপত্রের আদান–প্রদান নিয়ে একটি বই প্রকাশিত হয়, নাম ‘যুদ্ধ কেন?’ সেখানে আইনস্টাইন লিখেছেন, যুদ্ধের মূলে রয়েছে ক্ষমতা। বিশেষ করে প্রত্যেক দেশের শাসকশ্রেণি এই লোভে আক্রান্ত–তারা জাতীয় সার্বভৌমত্ব ছাড়তে চায় না, কারণ ক্ষমতা ছাড়লে তাদের নিয়ন্ত্রণ কমে যাবে। তিনি লেখেন: “প্রত্যেক দেশের শাসকশ্রেণির বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষমতার লোভ–এই লোভ জাতীয় সার্বভৌমত্বের কোনো সীমাবদ্ধতা মেনে নিতে চায় না।” এছাড়া, তিনি একটা ছোট্ট কিন্তু শক্তিশালী গ্রুপের কথা বলেন–যারা যুদ্ধকে ব্যবসা আর ব্যক্তিগত ক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখে। ক্ষমতা পেলে এই লোভটা আরও বেড়ে যায়, যা যুদ্ধকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে।

‘এনিমেল ফার্ম’ বইটি রাশিয়ান রেভল্যুশনের অ্যালেগরি হলেও, আজকের গ্লোবাল পলিটিক্সে–যেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় টার্ম অথরিটারিয়ানিজমের ছায়া ফেলছে, বা দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং প্রোপাগান্ডা চলছে–এটি আয়নার মতো আমাদের মুখোমুখি দাঁড় করায়। গল্প শুরু হয় ইংল্যান্ডের উইলিংডন শহরের ‘ম্যানর ফার্ম’–এ, উপন্যাসের শুরুটা হয় একটি সাধারণ খামারে, যেখানে মালিক মিস্টার জোন্স পশুদের দিয়ে অবিরাম খাটানোর পরও তাদের যথেষ্ট খাবার বা বিশ্রাম দেন না। গরু–ঘোড়া–শূকর–ভেড়া–কুকুর–সবাই মিলে একদিন এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ায়। তারা ঠিক করে, আর এই শোষণ সহ্য করা যাবে না।

কী ঘটলো? এক রাতে, খামারের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ এবং জ্ঞানী শূকর ‘ওল্ড মেজর’ এক গোপন সভা ডাকে। সে পশুদের তার অদ্ভুত স্বপ্নের কথা শোনায়– যেখানে মানুষ নেই, পশুরাই পৃথিবীর মালিক। সে হুঙ্কার দিয়ে বলে: “মানুষই আমাদের প্রকৃত শত্রু। তাদেরকে এই দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দাও, তাহলে ক্ষুধা আর অতিরিক্ত পরিশ্রমের মূল কারণ চিরতরে নির্মূল হবে। মানুষই হলো একমাত্র জীব যে উৎপাদন না করে শুধু ভোগ করে।” কেন ঘটলো? এই সভা ছিল বিপ্লবের বীজ–ওল্ড মেজর (যিনি কার্ল মার্ক্স এবং ভ্লাদিমির লেনিনের অ্যালেগরি) পশুদের শোষণের সচেতনতা দেয়, যাতে তারা বুঝতে পারে মানুষের (যেমন জোন্স, যিনি রুশ জার নিকোলাস ওও–এর প্রতীক) অধীনে তাদের জীবন কেন অসহ্য। তারা একটা গান তৈরি করে যে গানের মর্ম কথা হল শোষণমুক্ত, সমৃদ্ধ, স্বাধীন পশুদের সোনালি ভবিষ্যতের আহ্বান।

জোন্সের মামলায় হার এবং মদ্যপানের কারণে খামারের অবহেলা হয়, যা পশুদের ক্ষুধা এবং অসন্তোষ বাড়ায়। জুন মাসের এক শনিবার, জোন্স উইলিংডনে গিয়ে রেড লায়ন পাবে নেশা করে রবিবার দুপুর পর্যন্ত ফেরেন না। তার লোকেরা গরু দুধ দোহায়, কিন্তু পশুদের খাবার না দিয়ে শিকারে বেরিয়ে যায়। পশুরা সারাদিন অভুক্ত থেকে ছটফট করে। সন্ধ্যায় জোন্স ফিরে ঘুমিয়ে পড়লে, এক গাভী শিং দিয়ে শস্যভাণ্ডারের দরজা ভেঙে ফেলে। সব পশু ঢুকে খাবার খেতে শুরু করে। জোন্স জেগে চার কর্মচারী নিয়ে চাবুক হাতে আক্রমণ করে, কিন্তু ক্ষুধার্ত পশুরা পাল্টা আক্রমণ করে–সম্মিলিত শক্তিতে মানুষদের তাড়িয়ে দেয়। খামারের গেট থেকে ‘ম্যানর ফার্ম’ মুছে নতুন নাম ‘এনিমেল ফার্ম’ দেয়। কেন ঘটলো? এই বিদ্রোহ (রুশ রেভল্যুশনের অ্যালেগরি) অপ্রত্যাশিত কিন্তু অনিবার্য–জোন্সের অবহেলা (জারের অক্ষমতা) পশুদের (শ্রমিক শ্রেণির) একতা জাগায়। এটি দেখায় কীভাবে অসমতা বিপ্লবের জন্ম দেয়, কিন্তু বিপ্লবের পর কী হয়?

বিপ্লবের পর নেতৃত্ব নেয় তিন শূকর: স্নোবল (উদ্যমী, স্বপ্নদ্রষ্টা, লিওন ট্রটস্কির অ্যালেগরি), নেপোলিয়ন (গম্ভীর, ধূর্ত, জোসেফ স্তালিনের প্রতীক) এবং স্কুইলার (প্রোপাগান্ডা–ওস্তাদ, সোভিয়েত প্রচারযন্ত্রের প্রতীক)। তারা ওল্ড মেজরের শিক্ষাকে ‘এনিমেলিজম’–এ রূপ দেয় এবং সাতটি অপরিবর্তনীয় আইন লেখে: ১. দুই পায়ে হাঁটে যে–ই, শত্রু সে–ই; ২. চার পায়ে হাঁটে যে–ই, বন্ধু সে–ই; ৩. কোনো পশু পোশাক পরবে না; ৪. কোনো পশু বিছানায় শোবে না; ৫. কোনো পশু মদ খাবে না; ৬. কোনো পশু অন্য পশুকে হত্যা করবে না; ৭. সব পশু সমান। কেন? এই আইনগুলো (কমিউনিজমের ম্যানিফেস্টোর মতো) সমতা এবং স্বাধীনতার ভিত্তি, যাতে পশুরা (শ্রমিকরা) আর শোষিত না হয়। শুরুতে বেশ আনন্দময় সময় কাটে–পশুরা কাজ করে এবং ফল ভোগ করে।

কিন্তু সমস্যা শুরুটা হয় গাভীদের দুধ নিয়ে। কী ঘটলো? প্রথমত গাভীদের দুধ জমছে, কিন্তু পশুরা তো জানে না কী করে দুধ আহরণ করতে হয়। তো এই সমস্যা তারা এক সময় কাটিয়ে উঠে, কিন্তু এই দুধ এবং সংগৃহীত আপেল তারা কী করবে? তারা তো বিক্রি করতে জানে না। এসব তারা জমিয়ে রাখে এবং এ নিয়ে পরে ভাববে এমন সিদ্ধান্তে আসে। বিপত্তিটা শুরু হয় যখন তারা একদিন আবিষ্কার করে দুধ এবং আপেল রহস্যজনকভাবে উধাও হচ্ছে। একদিন জানা যায়, লিডার শূকররা সেগুলো নিজেদের জন্য রেখেছে। প্রতিবাদ হলে স্কুইলার বলে: “কমরেডরা, তোমরা কি ভাবছ আমরা এটা স্বার্থপরতার জন্য করছি? মোটেও না! আমরা শূকররা বুদ্ধিজীবী। আমাদের স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে খামার চলবে না, আর তখন জোন্স (মানুষ) ফিরে আসবে!” জোন্সের ভয়ে পশুরা মেনে নেয়। কেন? এটি দেখায় কীভাবে এলিটরা (শূকররা, যারা পার্টি লিডারদের প্রতীক) প্রিভিলেজ দাবি করে–প্রোপাগান্ডা (স্কুইলার) দিয়ে সাধারণ পশুদের (শ্রমিকদের) ম্যানিপুলেট করে।

এরমধ্যে এই লিডারদের ভেতর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। খামারের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্নোবল এবং নেপোলিয়নের যুদ্ধ চরমে। কী ঘটলো? স্নোবল একটা উইন্ডমিলের নকশা করে–বায়ুকল তৈরি হলে বিদ্যুৎ আসবে, খাটুনি কমবে, সপ্তাহে তিন দিন কাজ করলেও চলবে। সে বলে: “কমরেডরা, আমাদের এই হাড়ভাঙা খাটুনি আর থাকবে না। আমরা এমন এক খামার গড়ব যেখানে যন্ত্র আমাদের কাজ করে দেবে।” নেপোলিয়ন বিরোধিতা করে, নকশায় প্রস্রাব করে অবজ্ঞা দেখায়। তার যুক্তি: খাবার উৎপাদন বাড়াও, উইন্ডমিল সময় নষ্ট। সিদ্ধান্ত হয় একটা ইলেকশান এখন সময়ের দাবি। ভোটের দিন, স্নোবলের বক্তৃতায় পশুরা মুগ্ধ হয়। কিন্তু নেপোলিয়ন তার গোপন পোষা নয়টি হিংস্র কুকুর (গোপন পুলিশের অ্যালেগরি) লেলিয়ে দেয়। স্নোবল প্রাণভয়ে পালায়। নেপোলিয়ন ঘোষণা করে: “আর ভোট নয়, সব সিদ্ধান্ত আমার।” কেন? এটি পাওয়ার স্ট্রাগল দেখায়– স্নোবলের আধুনিকায়ন (ট্রটস্কির ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন) বনাম নেপোলিয়নের পেশী শক্তি (স্তালিনের পার্জ)। গণতন্ত্রের পতন হয় কারণ নেপোলিয়ন ক্ষমতার লোভে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে।

উইন্ডমিল তৈরির সময় হাড়ভাঙা খাটুনি হয়। কী ঘটলো? শক্তিশালী ঘোড়া বক্সার (শ্রমিক শ্রেণির প্রতীক), যার স্লোগান “আমি আরও কঠোর পরিশ্রম করব” এবং “নেপোলিয়ন সবসময় ঠিক”, অসুস্থ হয়। নেপোলিয়ন তাকে ‘চিকিৎসা’র নামে কসাইয়ের কাছে বিক্রি করে। স্কুইলার মিথ্যা ছড়ায়: “হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।” শূকররা বিলাসী হয়–তারা মানুষের (জোন্স–এর) বাড়িতে থাকতে শুরু করে, আইন বদলায়: “কোনো পশু চাদরসহ বিছানায় শোবে না।” আগে ছিল কোন পশু বিছানায় শুতে পারবে না, কিন্তু নিজেদের প্রয়োজনে তারা এই সংশোধনী আনে যে না বিছানায় শুতে পারবে কিন্তু চাদর থাকা যাবে না বিছানায়। মেজরের গান নিষিদ্ধ হয়। কেন? এটি দেখায় কীভাবে একনায়ক (নেপোলিয়ন) অনুগতদের (বক্সার) শোষণ করে– প্রোপাগান্ডা দিয়ে সত্য লুকায়, আইন বিকৃত করে।

শেষে, সাত আইন মুছে কেবল একটা আইন লেখা হয়: “সব পশু সমান, তবে কিছু পশু অন্যদের চেয়ে বেশি সমান।” কী ঘটলো? পশুরা দেখে শূকররা মানুষের সাথে মদ খায়, দুই পায়ে হাঁটে। কে মানুষ, কে শূকর–পার্থক্য নেই। কেন? এটি থিমের ক্লাইম্যাক্স–পাওয়ার করাপ্টস, রেভল্যুশন শোষকদের হাতে ফিরে আসে।

অতীতে এটি সোভিয়েতের ক্রিটিক ছিল, কোল্ড ওয়ারে অ্যান্টি–কমিউনিজমের টুল। কিন্তু ২০২৬–এ? এটি গ্লোবাল–যেখানে মিডিয়া ফ্র্যাগমেন্টেশন স্কুইলারের মতো মিথ্যা ছড়ায়, অথরিটারিয়ান লিডাররা (যেমন ট্রাম্পের অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে দুর্নীতির চক্র) ইনস্টিটিউশন ধ্বংস করে। বিশ্বের অনেক দেশেই দেখা যায়, বিপ্লব বা পরিবর্তনের স্লোগানগুলো সময়ের সাথে সাথে ক্ষমতার হাতে বিকৃতির শিকার হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও এমন উদাহরণ কম নয়।

তেমনি এই বই প্রশ্ন তোলে: আমাদের রেভল্যুশনগুলো (সোশ্যাল মুভমেন্টস) কি একই পথে? অরওয়েল বলেন, ‘পাওয়ার করাপ্টস–আবসোলিউট পাওয়ার অ্যাবসোলিউটলি’। ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে।

বিশ্ব সাহিত্যে অনুরূপ অ্যালেগরি প্রচুর। অরওয়েলেরই ‘১৯৮৪’ টোটালিটারিয়ান সার্ভেইল্যান্স দেখায়, যেখানে ‘বিগ ব্রাদার’ নেপোলিয়নের মতো নিয়ন্ত্রণ করে। অল্ডাস হাক্সলির ‘ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড’ টেকনোলজি দিয়ে কন্ট্রোলকে ক্রিটিক করে, যেখানে সমাজের ‘সমতা’ আসলে দাসত্ব। উইলিয়াম গোল্ডিং–এর ‘লর্ড অফ দ্য ফ্লাইজ’ শিশুদের দিয়ে সভ্যতার পতন দেখায়, যেখানে পাওয়ার স্ট্রাগল ‘এনিমেল ফার্ম’–এর মতো। রে ব্র্যাডবেরির ‘ফারেনহাইট ৪৫১’ বুক–বার্নিংয়ের মাধ্যমে সেন্সরশিপ ক্রিটিক করে, যা স্কুইলারের প্রোপাগান্ডার সাথে মিলে। রিচার্ড অ্যাডামসের ‘ওয়াটারশিপ ডাউন’ খরগোশদের দিয়ে টোটালিটারিয়ান সোসাইটি অ্যালেগরাইজ করে, যেখানে লিডারের লোভ সমাজ ধ্বংস করে। এসব বই প্রমাণ করে, পলিটিক্যাল স্যাটায়ার যুগে যুগে পাওয়ারের মুখোশ খোলে।

‘এনিমেল ফার্ম’ এর শেষ পৃষ্ঠায় এসে গল্পটা কি আদৌ কি শেষ হয়?-এটা জানালার কাচের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা পশুদের মতোই আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেই জানালা দিয়ে দেখা যায় শূকর আর মানুষের মুখ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। আর পাঠকের মনে একটা প্রশ্ন অবশিষ্ট থেকে যায়: আমাদের বিপ্লবগুলো, আমাদের স্বপ্নগুলো কি সত্যিই একই চক্রে ফিরে আসে? অরওয়েলের কথা যেন কানে বাজে: ক্ষমতা দুর্নীতিগ্রস্ত করে, আর পরম ক্ষমতা পরম দুর্নীতিগ্রস্ত করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *