মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টা পর হরমুজ প্রণালীর আকাশসীমা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। এ নিয়ে বিমানবাহিনীর কাছে একটি নোটিস (এনওটিএএম) জারি করা হয়েছে, যা ওই অঞ্চলে তীব্র উত্তেজনার প্রতিফলন। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে জানান, ইরানে আগেরবারের চেয়ে বড় হামলা চালানো হবে। তিনি বলেন, ইরান যদি হামলা আটকাতে চায় তাহলে তাদের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে এবং ইরান কোনো ধরনের পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না।
গত বছরের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময় দখলদার ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ চলছিল ইরানের। এবার ওই হামলার চেয়ে বড় হামলা হবে হুমকি দিয়ে ট্রাম্প লিখেছেন, বিশাল এক যুদ্ধজাহাজের বহর ইরানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রচ- শক্তি আর নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এটি বেশ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। কানাডার এক সামরিক ড্রোন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ইরানের ড্রোনের ঝাঁক মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বহরের জন্য বিশ্বাসযোগ্য হুমকি তৈরি করেছে। তিনি বলেন, আক্রমণ ঠেকাতে ইরান ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন প্রস্তুত রেখেছে। অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানের জন্য নিজেদের আকাশসীমা ও ভূখ- ব্যবহার করতে দেবে না বলে জানিয়েছে সৌদি আরব। খবর বিবিসি, ইরনা ও আলজাজিরার।
বুধবার প্রকাশিত নোটিশে বলা হয়েছে, ইরানি বাহিনী ২৭ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীর চারপাশে পাঁচ নটিক্যাল মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে লাইভ-ফায়ার মহড়া চালাবে। নোটিসে বলা হয়- নির্ধারিত এলাকার আকাশসীমা ভূমি স্তর থেকে ২৫০০০ ফুট পর্যন্ত, সামরিক কার্যকলাপের সময়টা বিপজ্জনক বলে ধরা হবে। হরমুজ প্রণালী বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য একটি কৌশলগত বাধা। যেখানে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এখান দিয়ে যাতায়াত করে। সেখানে যেকোনো বিঘœ প্রায়শই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সংকট সৃষ্টি করে এবং ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগকে বাড়িয়ে তোলে।
এদিকে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধির মধ্যে (এনওটিএএম) এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ইরান। কারণ মার্কিন বিমান বাহিনীও বিশাল এলাকাজুড়ে প্রস্তুতিমূলক মহড়া ঘোষণা করেছে। যার লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের টেকসই ক্ষমতা প্রদর্শন করা। ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য সমস্ত বিকল্প এখনো টেবিলে রয়েছে। যার মধ্যে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও রয়েছে, কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল ইরানের প্রভাব মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে।
এর আগেও ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতে ইসরাইলকে সমর্থন করে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে ইরানি কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে দিয়েছে, যেকোনো আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় দ্রুত এবং ব্যাপক প্রতিক্রিয়া জানাতে তারাও প্রস্তুত রয়েছে। ইরানে কয়েক সপ্তাহ আগে অর্থনৈতিক সংকট থেকে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। সরকার বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চালালে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাবে। পরে ইরান বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদ- দেওয়া থেকে সরে আসে। এদিকে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছেছে।
কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং বেশ কয়েকটি গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। যা মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীনে আসে। ড্রোন ডিজাইন ও উৎপাদনকারী কোম্পানি ড্রাগনফ্লাইয়ের প্রধান নির্বাহী (সিইও) এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা ক্যামেরন চেল ফক্স নিউজকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মানববিহীন ড্রোন প্রযুক্তি ওপর ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরীর মতো যুদ্ধজাহাজের বহরের বিরুদ্ধে স্যাচুরেশন আক্রমণ চালানোর জন্য ব্যবহার করা হতে পারে।
তার কথায়, ইরানের ড্রোন সক্ষমতার মূল্য এখন কয়েক মিলিয়ন ডলার। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত উন্নত সামরিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি কার্যকর হুমকি হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, ইরানি বাহিনী মার্কিন নৌবহর লক্ষ্য করে একসঙ্গে বহু সংখ্যক বা ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন নিক্ষেপ করতে সক্ষম। তার ভাষ্য, যদি অল্প সময়ের মধ্যে শত শত নিক্ষেপ করা হয় তাহলে কিছু তার লক্ষ্যে আঘাত হানবেই। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এসপিএর প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে টেলিফোন আলাপে এ আশ্বাস দেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান।
টেলিফোন আলাপে সৌদি যুবরাজ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদারে সংলাপের মাধ্যমে মতপার্থক্য দূর করতে যেকোনো প্রচেষ্টার প্রতি সৌদি আরবের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। এর আগে ইরানি গণমাধ্যম জানায়- পেজেশকিয়ান সৌদি যুবরাজকে বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে তেহরান যেকোনো যুদ্ধবিরোধী প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানায়।
এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) জানিয়েছে- ইরানের বিরুদ্ধে কোনো শত্রুতামূলক সামরিক কর্মকা-ের জন্য নিজেদের আকাশসীমা, ভূখ- বা আঞ্চলিক জলসীমা ব্যবহার করতে দেবে না তারা। অর্থনৈতিক সংকট ঘিরে সাম্প্রতিক অস্থিরতার জেরে ইরানি মুদ্রা রিয়াল ইতিহাসের সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে গেছে। বুধবার ইরানের বিভিন্ন মুদ্রা ট্র্যাকিং ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ রিয়াল, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বনি¤œ।
মুদ্রা ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট বনবাস্টের তথ্যানুযায়ী, শুধুমাত্র চলতি মাসেই ইরানি রিয়ালের দাম প্রায় ৫ শতাংশ কমে গেছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেও ইরানের নবনিযুক্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মাতি বলেছেন, বৈদেশিক মুদ্রা বাজার তার স্বাভাবিক পথেই আছে। গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার প্রতিবাদে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
এই বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন-পীড়নের অভিযোগ উঠে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর এবারের বিক্ষোভকে সবচেয়ে বড় দমন-পীড়ন হিসেবে বর্ণনা করছে। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, এই অস্থিরতা ও মৃত্যুর জন্য দায়ী বিদেশে অবস্থানরত বিরোধীদের মদদে পরিচালিত সন্ত্রাসী ও দাঙ্গাবাজরা। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্প ট্রাম্পের হুমকির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, মোতায়েন করা হয়েছে ইরানের কাছেই। এ ঘটনার পর আরও বেড়েছে আঞ্চলিক উত্তেজনা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ফের সংঘাতে জড়াতে পারে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।