দুই নদীর (দজলা ও ফোরাত) দেশ ইরাক। তুরস্ক থেকে সিরিয়া হয়ে আসা নদী দুটির পানি তলানিতে। উজানে বাঁধ, কম বৃষ্টিপাত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ খরার কবলে পড়েছে ইরাক। এই সংকট কাটাতে দেশটি তুরস্কের সঙ্গে ‘তেলের বিনিময়ে পানি’ চুক্তি করেছে।
আলজাজিরা জানায়, ১৯৩৩ সালের পর ইরাক ইতিহাসের সবচেয়ে শুষ্ক সময় পার করছে। পশ্চিম এশিয়া থেকে পারস্য উপসাগরে প্রবাহিত দজলা ও ফোরাত নদীর পানির স্তর কমে গেছে প্রায় ২৭ শতাংশ। কম বৃষ্টিপাত এবং উজানে পানির প্রবাহে বিধিনিষেধের কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, তুরস্ক ও সিরিয়ার উজানে নির্মিত বাঁধ, যুদ্ধে ধ্বংস হওয়া পুরোনো অবকাঠামো এবং সরকারি অব্যবস্থাপনা ইরাকের পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। চার কোটি ৬০ লাখ মানুষ এবং কৃষি খাতে ইরাকের সব পানির ৮০ শতাংশের বেশি ব্যয় হয়।
সম্প্রতি কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে দেশের বাঁধগুলোতে পানির ঘাটতি মেটেনি। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরাকের ৬০ শতাংশ পানি আসে তুরস্ক থেকে। এটা আগের বছরের তুলনায় কম।
গত নভেম্বরে তুরস্কের সঙ্গে কয়েকশ কোটি ডলারের ‘পানি সহযোগিতা চুক্তি’ করেছে ইরাক। এই চুক্তির আওতায় তুর্কি কোম্পানিগুলো ইরাকে নতুন পানিশোধন ও সংরক্ষণ অবকাঠামো তৈরি করবে। এর বিনিময়ে ইরাক প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ অপরিশোধিত তেল বেচে সেই অর্থ দিয়ে তুর্কি কোম্পানিগুলোর পাওনা পরিশোধ করবে। মূলত এটি তেলের বিনিময়ে পানির নিরাপত্তা কেনার চেষ্টা।
ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তোহান আল-মুফতি জানান, দজলা ও ফোরাত নদীর পানির প্রবাহ ধরে রাখতে এই প্রথম কোনো বাধ্যবাধকতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বাগদাদভিত্তিক পানিনীতি বিশেষজ্ঞ শুরোক আলাবায়াচি বলেন, ‘পানি একটি মানবাধিকার। একে তেলের রাজস্বের সঙ্গে পণ্য হিসেবে যুক্ত করা উচিত নয়।’
বিপর্যস্ত জনজীবন
নীতিনির্ধারণী বিতর্কের বাইরে সাধারণ মানুষের কাছে এই সংকট এখন জীবন-মরণের লড়াই। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, খরা ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে এক লাখ ৬৮ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। পানির অভাবে হাজার হাজার কৃষক চাষবাস ছেড়ে দিয়েছেন।
বাবেল প্রদেশের সাবেক কৃষক আহমেদ আল-জাশআমি জানান, পানির অভাবে বাগান শুকিয়ে যাওয়ায় তাঁর বাবা শোকে মারা গেছেন। এখন তিনি বাধ্য হয়ে নির্মাণসামগ্রীর দোকানে কাজ করেন।
ফালুজার হুসাম আনিজান পাঁচ একর ফলের বাগান বেচে দিয়েছেন। বাগানের জায়গায় এখন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে। তিনি ট্যাক্সি চালান। কৃষকরা মনে করেন, সরকারের দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা এই সংকটকে গভীর করেছে। হুসাম আনিজান বলেন, ‘দেখা যাক, এই চুক্তি কতদূর যায়। হয়তো আমরা আবার আশার আলো দেখতে পাব।’