চলতি সপ্তাহেই ইরানে হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র

চলতি সপ্তাহেই ইরানে হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। এ হামলায় দেশটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের টার্গেট করা হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের গালফ অঞ্চলের কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই। তারা বলেছেন, হামলা এ সপ্তাহে হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সময় আবার পরিবর্তনও হতে পারে। মঙ্গলবার মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী এবং যুদ্ধজাহাজ পৌঁছেছে, যা ইরানের ওপর সম্ভাব্য মার্কিন হামলার আশঙ্কা অনেকটাই বাড়িয়েছে।

তবে ইরান জানিয়েছে, মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে তারা প্রস্তুত। ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং বেশ কয়েকটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। যা মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের অধীনে আসে। তারা বলেন, যদি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায় তাহলে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী লক্ষ্য করে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়বে তেহরান। খবর টিআরটি ওয়ার্ল্ড, ইরনা ও আলজাজিরার।
ইরানে হামলা চালালে দেশটির পাল্টা হামলা কেমন হবে সেটি নিয়ে এখন আলাপ আলোচনা চলছে। ওই কর্মকর্তারা বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে যে আলোচনা চলছে সেটি এখন অনেকটাই উত্তপ্ত। ইরানে গত মাসের শেষ দিকে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। যা কঠোরভাবে দমন করে দেশটির সরকার। ওই সময় থেকেই বিক্ষোভকারীদের হত্যার অজুহাতে ইরানে হামলার হুমকি দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরান যখন বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে তখন বিক্ষোভকারীদের সরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

কিন্তু তিনি দুইদিন পরই আবার বলেন, সরকার বিক্ষোভকারীদের আর হত্যা করছে না। যা নির্দেশ করেছিল ট্রাম্প হামলার পরিকল্পনা বাদ দিয়েছেন। তবে অনেকে বলেছিলেন ইরানে হামলার আগে পরিকল্পনা আড়াল রাখতে তিনি এমন মন্তব্য করেছিলেন। যদিও কেউ কেউ আবার বলেছেন ট্রাম্প সত্যিই হামলা ইচ্ছা থেকে সরে গেছেন। ইরানে চরম উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে সৌদি আরব, কাতার এবং ওমান। এ তিনটি দেশ ইরানে সরাসরি হামলার বিরোধীতা করে। মার্কিন একটি সূত্র মিডেল ইস্ট আইকে অবশ্য জানিয়েছে, ওই সময় হামলা না চালানো ছিল সাময়িক। দেশটির একটি গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছেন, ট্রাম্প এখনো ইরানের সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনা বাদ দেননি।
এদিকে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড এক্সে একটি পোস্টে জানায়, লিংকনের স্ট্রাইক গ্রুপ এই অঞ্চলে পৌঁছেছে।  জাহাজগুলোকে বর্তমানে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়েছে। গত সপ্তাহে এ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ওয়াশিংটন এই অঞ্চলে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে একটি বিশাল নৌবহর পাঠাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র গত জুন মাসে ইরানের বিরুদ্ধে ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরাইলকে সমর্থন করেছিল এবং সংক্ষিপ্তভাবে যোগ দিয়েছিল। এছাড়া ট্রাম্প গত সপ্তাহে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক হামলার হুমকি থেকে সরে আসতে দেখা গেলেও, তিনি কখনই বিকল্পটি বাতিল করেননি।

এই মাসের গোড়ার দিকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা শুরু হয়েছিল। কারণ ইরান জুড়ে বিক্ষোভের বিরুদ্ধে ক্র্যাকডাউনের পর ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে যায়। ইরান বিক্ষোভকারীদের টার্গেট করতে থাকলে ট্রাম্প বারবার হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছিলেন, যদিও দেশব্যাপী বিক্ষোভ বন্ধ হয়ে গেছে। এদিকে যুদ্ধজাহাজ ছাড়াও পেন্টাগন ফাইটার জেট এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে যাচ্ছে।

এর আগে মার্কিন সামরিক বাহিনী ঘোষণা করেছিল, তারা এই অঞ্চলে একটি মহড়া চালাবে যা তাদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দেবে এবং ক্ষমতা প্রদর্শন করবে। এদিকে মার্কিন রণতরী পৌঁছানোর জবাবে ইরানের মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমায়েল বাঘাই বলেছেন, ইরান নিজের সক্ষমতার প্রতি আস্থাশীল। লিংকনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন, এই ধরনের একটি যুদ্ধজাহাজের আগমন ইরানের জাতিকে রক্ষা করার জন্য ইরানের সংকল্প এবং গুরুত্বকে প্রভাবিত করবে না।
চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের কাছে বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ঘটনার পর দেশ দুটির মধ্যে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা করছেন অনেকে। কিন্তু ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার সামনে যুক্তরাষ্ট্র তার যুদ্ধজাহাজকে রক্ষা করতে পারবে কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভা-ার রয়েছে ইরানের কাছে, যা সংখ্যা আনুমানিক তিন হাজারের বেশি।

এর মধ্যে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম ফাতেহ-১১০ এর মতো গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে। তেহরানের কৌশল নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতার চেয়ে বেশি সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র একযোগে নিক্ষেপের ওপর। শত সস্তা ড্রোন ও রকেট একসঙ্গে ছুড়ে ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের ট্র্যাকিং রাডারকে বিপর্যস্ত করতে চায় ইরান। শক্তিশালী হলেও, বিমানবাহী রণতরীকে সুরক্ষা দেয়া প্রতিটি আর্লেই বার্ক-শ্রেণির ডেস্ট্রয়ারে সাধারণত ৯০ থেকে ৯৬টি ভার্টিক্যাল লঞ্চ সেল থাকে। তবে ইরানের ছুড়ে দেওয়া ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা যদি এই প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তবে জাহাজগুলোর গোলাবারুদ কার্যত শেষ হয়ে যেতে পারে।

যুদ্ধজাহাজের প্রধান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হলো এজিস কমব্যাট সিস্টেম, যা শক্তিশালী এসপিওয়াই-১ রাডারের মাধ্যমে একসঙ্গে ১০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারে। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবচেয়ে বিপজ্জনক হুমকিগুলোকে অগ্রাধিকার দেয় এবং মাঝ আকাশে তাদের ধ্বংস করার জন্য ইন্টারসেপ্টরগুলিকে নির্দেশ দেয়। হুমকি যতটা সম্ভব দূরে থাকতেই ধ্বংস করার চেষ্টা করে মার্কিন নৌবাহিনী। এ কাজে ব্যবহৃত হয় স্ট্যান্ডার্ড মিসাইল-৬ (এসএম-৬), যা প্রায় ২৪০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এতে করে ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা বিমানবাহী রণতরীর কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই অনেকটা কমে যায়। যেসব হুমকি বাইরের প্রতিরক্ষা স্তর ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়ে, সেগুলোকে মোকাবিলায় ব্যবহৃত হয় ইভলভড সিস্প্যারো মিসাইল (ইএসএসএম)।

আকারে ছোট হওয়ায় একটি লঞ্চ সেলেই চারটি ক্ষেপণাস্ত্র বহন করা যায়, যা নিকটতম লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে তার ফায়ারপাওয়ার বা অগ্নিশক্তি চারগুণ বাড়িয়ে দেয়। এরপরও সব প্রতিরক্ষা ভেদ করে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র এগিয়ে এলে শেষ মুহূর্তে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয় ফ্যালানক্স ক্লোজ-ইন ওয়েপন সিস্টেম (সিআইডব্লিউএস)। রাডার-নিয়ন্ত্রিত এই গ্যাটলিং গান প্রতি মিনিটে প্রায় ৪,৫০০ রাউন্ড গুলি ছুড়ে আঘাতের ঠিক কয়েক সেকেন্ড আগে ওয়ারহেডকে ধ্বংস করে দিতে পারে। সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি মার্কিন জাহাজগুলো শত্রুর নির্দেশনা-ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে এসএলকিউ-৩২ ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থাও ব্যবহার করে।

এর মাধ্যমে গুলি না ছুড়েই আসন্ন ক্ষেপণাস্ত্রকে জাহাজ থেকে দূরে টেনে নেওয়া সম্ভব। এছাড়াও পারস্য উপসাগরের সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের প্রস্থ মাত্র ৩৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার। এই নিকটবর্তী অবস্থানের কারণে মার্কিন কমান্ডারদের হাতে প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় খুবই কম থাকে। কারণ স্থলভিত্তিক জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র মাত্র কয়েক মিনিটেই নৌবহরে আঘাত হানতে পারে। 
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ফের সংঘাতে জড়াতে পারে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর মধ্যেই ট্রাম্পকে নিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের একজন কর্মকতা। ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং ভাবাদর্শী হাসান রহিমপুর আজগাদি বলেছেন, তেহরানের উচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বন্দি করা, ঠিক যেমন তিনি মাদুরোর সঙ্গে করেছিলেন। ইরানের বিক্ষোভের বিষয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ মন্তব্য করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল যদি কোনো হামলা চালায়, তাহলে এর কঠোর জবাব দেয়ার হুঁশিয়ারি দেন ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রেজা তালায়ি-নিক।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের পক্ষ থেকে কোনো আগ্রাসন হলে, তা আগের চেয়ে আরও যন্ত্রণাদায়ক ও চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়বে। গত জুন মাসে হওয়া ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় ইরানের সামরিক প্রস্তুতি এখন আরও বেশি বলেও জানান তিনি। ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, তারা (যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল) যদি কোনো শত্রুতামূলক পদক্ষেপ নেয়, তবে নিশ্চিতভাবেই আগের চেয়ে আরও বেশি ব্যর্থ হবে এবং আরও বড় পরাজয়ের সম্মুখীন হবে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানবাহী রণতরী মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছানোর খবরের পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের কাছে বিদেশি যুদ্ধজাহাজের আগমন তেহরানের প্রতিরক্ষা অবস্থান বা কূটনীতির প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন আনবে না।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন,  আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। আমরা কখনো যুদ্ধকে স্বাগত জানাইনি, আবার কূটনীতি ও আলোচনার পথ থেকেও কখনো সরে আসিনি। এসব আমরা বাস্তবে দেখিয়েছি। সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে অন্তত ৬ হাজার মানুষের প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থা। হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) প্রাণহানির এই তথ্য নিশ্চিত করেছে বলে জানিয়েছে এএফপি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *