ভিজিএফের চালে ‘রাজনৈতিক কোটা’

কোটা প্রথার বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘নতুন বাংলাদেশ’ অর্জিত হলেও লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে সরকারি ভিজিএফের চালে চালু হয়েছে নতুন ‘রাজনৈতিক কোটা’। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে গরিব ও দুস্থদের জন্য বরাদ্দ ৪৫২ টন চালের বড় একটি অংশ এখন রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের পকেটে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। 
প্রশাসনের সরাসরি সিদ্ধান্তে ও তদারকিতে এই ‘ভাগাভাগি’র ঘটনা প্রকাশ্যে ঘটায় স্থানীয় সাধারণ ও দুস্থ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

প্রকাশ্যেই চলছে কার্ডের ‘নিলাম’
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভিজিএফ কার্ডের এ নয়-ছয় গোপনে চললেও বর্তমানে তা বেশ হাঁকডাক দিয়ে প্রকাশ্যেই করা হচ্ছে। উপজেলার ৪৫ হাজার ২১১টি কার্ডের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রাজনৈতিক দল, সংবাদকর্মী ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে করে জনপ্রতি ১০ কেজি করে চাল পাওয়ার কথা থাকলেও প্রকৃত দুস্থরা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

হাজিরহাট ইউনিয়নের চার নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা দিনমজুর মো. হাসান বলেন, কার্ডের জন্য ইউপি সদস্য ও নেতাদের কাছে কয়েকবার গিয়েছি। এখন পর্যন্ত কার্ড পাইনি। শুনেছি, নেতারা তাদের পছন্দের লোকদের কার্ড দিয়েছেন।

চরলরেন্স এলাকার খুকী বেগম জানান, তাঁর স্বামী একজন রিকশাচালক। ভিজিএফ কার্ডের জন্য তিনিও জনপ্রতিনিধিসহ অনেকের কাছে গিয়েছেন। যথারীতি কার্ড মেলেনি। একই কথা জানিয়েছেন তোরাবগঞ্জ এলাকার হতদরিদ্র গৃহবধূ নূরনাহার বেগমও।

কোন ইউনিয়নে কত কার্ডের ‘কোটা’
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নে মোট ৭ হাজার ৩০০টি কার্ডের মধ্যে বিএনপিকে ১ হাজার ৩০০, সাংবাদিকদের ২৫০, জামায়াতে ইসলামীকে ৫০০ এবং গণঅধিকার পরিষদকে ৫০টি কার্ড দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে এখানে রাজনৈতিক ও পেশাজীবী কোটাতেই চলে গেছে ১ হাজার ৬০০ কার্ড।

অনুরূপভাবে চরকাদিরা ইউনিয়নে ৭ হাজার ৪০০ কার্ডের মধ্যে বিএনপিকে ১ হাজার ৬০০, জামায়াতকে ৫৩৫ এবং বিভিন্ন পেশাজীবীদের জন্য ২০০টি কার্ড বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তোরাবগঞ্জ, চরমার্টিন, চরকালকিনি, সাহেবেরহাট, পাটারীরহাট, চরলরেন্স ও চরফলকন ইউনিয়নেও একই কায়দায় দলীয় কোটায় কার্ড বণ্টন করা হয়েছে।

‘অসহায়ত্ব’ নাকি যোগসাজশ?
হাজিরহাট ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইকতারুল ইসলাম এই অনিয়মের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘কিছু সাংবাদিক ও রাজনৈতিক দলের চাপাচাপিতে কার্ডগুলো এভাবে বণ্টন করতে হয়েছে। এর বাইরে আমাদের কিছু করার ছিল না।’ অন্যদিকে চরকাদিরা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. হারুন জানান, তারা বাধ্য হয়েই দলীয়ভাবে কার্ডগুলো ভাগ করে দিয়েছেন।

উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরী বিষয়টিকে অস্বীকার করে বলেন, ‘কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেই আমরা নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি। বিএনপির নাম ভাঙিয়ে কেউ এমন কাজ করলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ জানতে চাইলে গণঅধিকার পরিষদের জেলা সেক্রেটারি সোলায়মান চৌধুরী বলেন, অন্য দলের মতো আমাদের দলও ভিজিএফ কার্ড পেয়েছে। তবে এটা বিএনপি-জামায়াতের তুলনায় খুবই নগণ্য। প্রকৃত দুস্থ মানুষের মাঝে কার্ডগুলো বিতরণ করার জন্য নেতাকর্মীদের বলা হয়েছে। অনিয়মের বিষয়ে কথা বলতে উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আবুল খায়েরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) পরিতোষ কুমার বিশ্বাস জানান, ঈদ ভিজিএফ কোটার ভিত্তিতে বণ্টন হওয়ার সুযোগ নেই। প্রকৃত গরিব ও দুস্থ মানুষেরাই এ কার্ডের চাল পাওয়ার কথা। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাহাত উজ জামানও একই কথা  বলেন, তাঁর ভাষ্য, এভাবে বিতরণ হওয়ার কথা নয় এবং তিনি বিষয়টি তদন্ত করে দেখবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *