সাইবার লিটারেসি ও সাইবার সিকিউরিটি

একটি তথ্য উপস্থাপন করে শুরু করছি লেখাটি। মহিলা ও শিশুবিষয়ক অধিদপ্তর পরিচালিত ‘নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার’ অভিযোগ জানানোর হেল্পলাইন সার্ভিস ১০৯ হেল্পলাইনে প্রতিদিন নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার অভিযোগ জানিয়ে কল আসে ছয় থেকে সাত হাজার! সাইবার সহিংসতার অভিযোগের এই সংখ্যাটি আগের যেকোন সময়ের কলের সংখ্যার চাইতে বেশি এবং তা রোজ রোজ বেড়েই চলছে। এরই ফলশ্রুতিতে, অফলাইন ও অনলাইন সহিংসতার ঘটনা প্রতিরোধে সারা দেশে পাঁচ হাজারের অধিক কুইক রেসপন্স টিম গঠন করার কাজ চলমান রয়েছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি আজ সভ্যতার চালিকাশক্তি একটি ক্লিকেই বদলে যাচ্ছে যোগাযোগ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও বিনোদনের চেহারা। কিন্তু এই উজ্জ্বল পর্দার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার বাস্তবতা সাইবার সহিংসতা। এটি এমন এক সহিংসতা, যা চোখে দেখা যায় না, অথচ তার আঘাত গভীরভাবে নারীর জীবন, ও সমাজে ছাপ ফেলে। নারীরা অনলাইন প্লাটফর্মে সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছেন সাইবার বুলিং, যৌন হয়রানি, ফটো ম্যানিপুলেশন, ডম্পিং, ভুয়া প্রোফাইল তৈরি ও ব্ল্যকমেইলিংয়ের মতো অপরাধের। বাংলাদেশে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের তথ্য বলছে, অনলাইন হয়রানির শিকারদের প্রায় পঁচাত্তর শতাংশই নারী। জাতিসংঘের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, আরব অঞ্চলে ষাট শতাংশ নারী ইন্টারনেট ব্যবহারকারী অনলাইন সহিংসতার শিকার, পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার বারো দেশে পঞ্চাশ শতাংশ নারী প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার মুখে, সাবসাহারান অঞ্চলের পাঁচটি দেশে আটাশ শতাংশ নারী আক্রান্ত, আর ডেনমার্ক, ইতালি, নিউজিল্যান্ড, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্রে ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী তেইশ শতাংশ নারী অন্তত একবার হলেও অনলাইন হয়রানির শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন জরিপেও ছবিটা ভিন্ন নয়, ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের আটাত্তর শতাংশ নারী অনলাইন সহিংসতার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তার মানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, বিশ্বের অন্যান্য দেশকে টপকে আমরা এই ক্ষেত্রে দারুণ এগিয়ে আছি! কিন্তু এই এগিয়ে থাকাটা আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য কতোটা নেতিবাচক তা কি আমরা বুঝতে পারছি? এ তথ্য শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং সমাজের নারীর নিরাপত্তার গভীর সংকেত।

সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এই সহিংসতা কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রযুক্তিগত কাঠামোর মিলিত ফল। অহরহ ভুয়া প্রোফাইল তৈরি করে মানহানি, ব্যক্তিগত ছবি বিকৃত করে ছড়িয়ে দেওয়া, মেসেঞ্জারে অশালীন বার্তা বা হুমকি, ব্ল্যাকমেইল ও রিভেঞ্জ পর্ন, এসব নারীর অনলাইন জীবনে প্রতিদিনের বাস্তবতা। ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে নারীর অনলাইন উপস্থিতি যত বাড়ছে, ততই তারা ডিজিটাল পরিচয়, ছবি, কণ্ঠ, তথ্য, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার হাতিয়ার হয়ে উঠছে। প্রযুক্তি যেন নারীর শরীর, পরিচয় ও তথ্যকে রূপান্তর করছে এক ধরনের ডেটায়, যা আবার ব্যবহৃত হচ্ছে পর্নোগ্রাফিক কন্টেন্ট, ডিপফেইক ভিডিও বা ব্ল্যাকমেইলের জ্বালানি হিসেবে।

ভুক্তভোগী নারীদের অনেকেই সমাজ, পরিবার বা কর্মক্ষেত্রের প্রতিক্রিয়ার ভয়ে ঘটনাগুলো প্রকাশ করতে পারেন না। এই নীরবতা তাদের মানসিকভাবে আরও একা করে দেয়, তৈরি করে গভীর ট্রমা। অনেক সময় সমাজই নারীকে দায়ী করে, ফলে তিনি নিজেই নিজের প্রতি সন্দিহান হয়ে পড়েন। এই মানসিক চাপই সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা। বাংলাদেশে এখন কিছু আইনি কাঠামো রয়েছে যেমন: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (২০২৪), ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, এবং সাইবার ক্রাইম ইউনিট, যেখানে ভুক্তভোগীরা সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারেন। এছাড়া ৯৯৯, সাইবার হেল্প ডেস্ক, এবং এটুআই উইমেন সেফটি সেল থেকেও জরুরি সহায়তা পাওয়া যায়।

কিন্তু অনলাইনে সহিংসতার শিকার নারীদের নিরাপত্তায় আইন থাকলেও, সাধারণ ক্রিমিনাল কোর্টে এসব অভিযোগের বিচার হওয়ায় নারীরা অভিযোগ এনেও কাঙ্ক্ষিত বিচার পান না। বাংলাদেশে ভুক্তভোগীদের ব্যক্তিগত তথ্যাবলির সহজলভ্যতা, ব্যবহারকারীদের অজ্ঞতা ও প্রযুক্তি বিকাশের সঙ্গে আইনি পদক্ষেপের ফাঁক থাকায় নারীরা সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন। পরিবার ও সমাজে মর্যাদাহানির ভয়, সাইবার অপরাধসংক্রান্ত মামলাগুলোর প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ হওয়াসহ নানা কারণে ভুক্তভোগী নারীরা অভিযোগ জানাতে আগ্রহী হন না। জুলাই অভ্যুত্থানে সম্মুখসারিতে থাকা ও রাজনীতিতে অংশ নেওয়া নারীরা অনেক বেশি সাইবার সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। এই সময়ে ডিজিটাল অধিকার সুরক্ষা আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন। পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন ক্রিয়াশীল সংগঠন, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এবং মিডিয়ার নারী কর্মীরা সমাজমাধ্যমে বেশি বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। যখন কোনো নারী আন্দোলনের সম্মুখভাগে চলে আসেন, স্পষ্টভাবে কথা বলেন, পরিচিতি লাভ করেন তখন সেই নারীর সমাজমাধ্যমে চরিত্রহননসহ তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়।

আর তাই, আমরা মনে করি শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আইনের যথাযথ প্রয়োগ, প্রযুক্তিগত সচেতনতা ও সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তন। আইনের কার্যকর প্রয়োগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও নিরাপদভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতনতা সৃষ্টি বিশেষ করে কিশোর ও তরুণ ছেলেদের, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ঘটনার শিকার হওয়ার পর নারী ভুক্তভোগীকে কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়া সেবা দেওয়ার ব্যবস্থার ওপর জোর দেন। নারীর অনলাইন নিরাপত্তা একটি সামাজিক আন্দোলন হয়ে উঠতে পারে, যদি আমরা প্রযুক্তি ব্যবহারের সংস্কৃতি বদলাই। তাই প্রয়োজন স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে ডিজিটাল সেফটি শিক্ষা, নারীদের জন্য সাইবার লিটারেসি ও সিকিউরিটি প্রশিক্ষণ, এবং গণমাধ্যমে সচেতনতা প্রচারণা। শুধু নারীরা নয়, পুরুষ ও তরুণ সমাজকেও এই শিক্ষার অংশ হতে হবে, যাতে প্রযুক্তি হয় সুরক্ষার হাতিয়ার, শোষণের নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *