চারপাশ আবছায়া, কুয়াশার চাদরে মোড়া নিঝুম প্রকৃতি। পৌষের এমন ভোরেই মনে পড়ে যায় কবি সুনির্মল বসুর সেই ‘শীতের সকাল’ কবিতার কথা। কবিতার মতোই আমেজ মাখা এক ভোরে ঘুম ভাঙল আমাদের। শীতের ছুটিতে ইট-কাঠের নগরী ছেড়ে এবার আমাদের গন্তব্য ‘লাল শাপলার বিল’। লিখেছেন শিশির কুমার নাথ
সাতসকালে নাওয়া-খাওয়া সেরে আমরা রওনা হলাম সিলেটের ডিবির হাওরের উদ্দেশে। হিমহিম হাওয়া কেটে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি। গন্তব্য সিলেট শহর থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার দূরে জৈন্তাপুরে। ঘণ্টা দেড়েকের যাত্রা শেষে আমরা পৌঁছলাম গন্তব্যের কাছাকাছি। চলতি পথের দুপাশে মেঘালয়ের আকাশছোঁয়া পাহাড়ের সারি যেন ঘন মেঘের মতো দাঁড়িয়ে স্বাগত জানাচ্ছিল আমাদের। জৈন্তাপুর বাজার থেকে কিছুটা এগিয়ে ডানদিকের কাঁচা সড়ক ধরে এক কিলোমিটার পথ পেরোলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক অলৌকিক দৃশ্য। শাপলার বিল যেন এক জলজ রূপকথার রাজ্য। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে অজস্র লাল শাপলার হাসি যেন পুরো বিলটিকে এক মায়াবী রূপ দিয়েছে। অদূরেই হাতছানি দিচ্ছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের নুয়ে পড়া সবুজ পাহাড়। পাহাড়, আকাশ আর লাল শাপলা মিলে প্রকৃতি এখানে এক অদ্ভুত সৌন্দর্যের ইন্দ্রজাল বুনেছে। যেন কোনো নিপুণ শিল্পীর আঁকা সবুজের ক্যানভাসে লাল ফুলের জলছবি।
বিলের নিস্তব্ধতা ভেঙে মাঝেমধ্যেই উড়ে আসছে মাছরাঙা, পানকৌড়ি আর নাম না জানা অসংখ্য ছোট পাখি। শাপলা পাতার ওপর দাঁড়িয়ে তারা শিকার ধরছে। মাঝে মধ্যে সাদা বকের সারি উড়ে এসে সাদর সম্ভাষণ জানাচ্ছে অতিথিদের। স্থানীয়ভাবে এটি লাল শাপলার বিল নামেই অধিক পরিচিত। মূলত ডিবি বিল, ইয়াম বিল, হরফকাট বিল ও কেন্দ্রী বিল–এ চারটি বিলের সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে এই শাপলার রাজ্য; যার মোট আয়তন প্রায় ৯০০ একর। প্রকৃতিপ্রেমীদের সুবিধার্থে বিলের মাঝখানে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে একটি নান্দনিক ওয়াকওয়ে।
কথিত আছে, একসময় এই বিলে কোনো শাপলা ছিল না। সীমান্তের ওপারে খাসিয়া সম্প্রদায় লাল শাপলা দিয়ে তাদের ধর্মীয় পূজা-অর্চনা করত। পূজার ফুলের চাহিদা মেটাতে খাসিয়া পরিবারগুলো এই বিলে লাল শাপলার চারা রোপণ করে। সেই থেকে ধীরে ধীরে ডিবি বিল, কেন্দ্রী বিল, হরফকাটা বিল, ইয়াম বিলসহ আশপাশের জলাশয়গুলো লাল শাপলায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। শাপলার পাশাপাশি এই হাওর এখন পরিযায়ী পাখিদেরও অভয়ারণ্য। শীত এলেই বালিহাঁস, পানকৌড়ি, পাতিসরালি ও জলময়ূরীর কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের পাশাপাশি এ হাওরের বুকে ঘুমিয়ে আছে এক বিষাদমাখা ইতিহাস। হাওরের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন সমাধি মন্দির, যা জৈন্তা রাজবাড়ির ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। লোকমুখে প্রচলিত, এটি রাজা বিজয় সিংহের সমাধি।
ইমরান আহমদ সরকারি মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও জৈন্তা ফটোগ্রাফিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা মো. খায়রুল ইসলাম এ সম্পর্কে বলেন, ‘কথিত আছে, রাজকন্যা কুড়ির সঙ্গে রাজার অসম প্রেমের বলি হতে হয়েছিল রাজা বিজয় সিংহকে। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে রাজা যখন এই বিলে পাখি শিকারে আসেন, তখন তাঁরই বিশ্বস্ত অনুচর নৌকা ফুটো করে রাজাকে পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করে। ২০১৪ সাল থেকে জায়গাটি পর্যটকদের নজরে আসে এবং পরবর্তী সময়ে ইজারা বাতিল করে এটিকে পর্যটনকেন্দ্র ঘোষণা করা হয়।’
লেখক ও প্রকাশক সুফি সুফিয়ান জানান, জৈন্তার প্রাচীন লোকগল্প ও গীতিকায় বিজয় সিংহের করুণ এ কাহিনির উল্লেখ রয়েছে। সিলেট গীতিকার ‘সোনাধনের গীতে’ বিজয় সিংহের কাহিনি পাওয়া যায়। গবেষক মোস্তাক আহমাদ দীনের লেখায়ও উঠে এসেছে বিজয় সিংহ আর রাজবাড়ির এই প্রেমকাহিনি।
ডিবির হাওরের আসল সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে যেতে হবে শীতকালে, বিশেষ করে সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে। তবে শাপলার হাসি দেখতে হলে পৌঁছাতে হবে খুব ভোরে। কারণ বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের তেজে শাপলারা তাদের পাপড়ি গুটিয়ে নেয়।
সিলেট নগরী থেকে জাফলংগামী বাসে করে জৈন্তাপুর বাজারে নামতে হবে। সেখান থেকে ব্যাটারিচালিত টমটম বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় সরাসরি বিলে যাওয়া যায়। সিলেট শহর থেকে সময় লাগবে এক থেকে দেড় ঘণ্টা। ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়েও একেবারে বিলের কাছে যাওয়া যায়, সেখানে পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা রয়েছে।
বিলের ঘাটে প্রায় শখানেক নৌকা বাঁধা থাকে। পুরো বিল ঘুরে দেখতে হলে নৌকা ভাড়া করতে হবে, যার জন্য গুনতে হবে ঘণ্টাপ্রতি ৫০০ টাকা। নৌকায় ভেসে ভেসে যখন আপনি শাপলার রাজ্যের গভীরে প্রবেশ করবেন, তখন মনে হবে আপনি পৌঁছে গেছেন ফুল, পাতা আর মেঠো গন্ধমাখা এক স্বর্গে।
বিলের পাশেই খোলা মাঠে রয়েছে রেস্তোরাঁ। সেখানে চালের রুটি আর হাঁস কিংবা গরুর মাংস দিয়ে সকালের নাশতা বা দুপুরের আহার সেরে নেওয়া যায়। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও বিলের পরিবেশ রক্ষার জন্য রয়েছে ‘শাপলা বিল সুরক্ষা কমিটি’। ডিবির হাওর ভ্রমণের পাশাপাশি পর্যটকরা জাফলং, সারি নদী ও খাসিয়া পুঞ্জি দেখার সুযোগও নিতে পারেন। প্রকৃতি আর পুরাকীর্তির এই রাজ্যে একটি দিন কাটালে তা আপনার স্মৃতির পাতায় উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। তবে অনুরোধ, সমাধি মন্দিরটি একটি ঐতিহাসিক ও স্পর্শকাতর স্থান–তাই এর পবিত্রতা রক্ষা করা ও ভেতরে প্রবেশ না করাই উত্তম।