গাজা গণহত্যা ও বার্লিন বিতর্ক

শিল্প কি রাজনীতির ঊর্ধ্বে? নাকি ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুহূর্তে শিল্পীর নীরবতা নিজেই একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান হয়ে দাঁড়ায়? ২০২৬ সালের বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব (বার্লিনালে) ঘিরে এই পুরোনো বিতর্কটিই নতুন করে সামনে এসেছে। ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান ভয়াবহ আগ্রাসন ও গণহত্যার প্রশ্নে উৎসবের জুরি বোর্ডের ‘অরাজনৈতিক’ থাকার ভানকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন বুকারজয়ী ভারতীয় লেখিকা ও অ্যাক্টিভিস্ট অরুন্ধতী রায়। প্রতিবাদস্বরূপ তিনি বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব থেকে নিজের অংশগ্রহণ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

অরুন্ধতীর এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি উৎসব বয়কট নয়; বরং এটি বিশ্বজুড়ে শিল্পীদের প্রতি এক তীক্ষ্ণ নৈতিক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে; যখন চোখের সামনে হাজার হাজার মানুষ হত্যার শিকার হচ্ছে, তখন ‘নিরপেক্ষতা’র দোহাই দেওয়া কি প্রকারান্তরে নিপীড়কের পক্ষ নেওয়া নয়?

বিতর্কের সূচনা হয় গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার, উৎসবের উদ্বোধনী প্যানেলের একটি সংবাদ সম্মেলনে। সেখানে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ‘ড্রপসাইটনিউজ’-এর সাংবাদিক টিলো ইয়ুং জুরি সদস্যদের কাছে গাজায় চলমান গণহত্যায় জার্মান সরকারের সমর্থন এবং মানবাধিকারের প্রশ্নে তাদের ‘দ্বিমুখী নীতি’ নিয়ে প্রশ্ন রাখেন।

উত্তরে ২০২৬ বার্লিনালের সাত সদস্যের জুরি বোর্ডের সভাপতি, প্রখ্যাত জার্মান নির্মাতা ভিম ভেন্ডারস বলেন, ‘নির্মাতাদের রাজনীতির বাইরে থাকতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘‘আমরা যদি একান্তই রাজনৈতিক সিনেমা বানাই, তবে আমরা রাজনীতির মাঠে প্রবেশ করি। কিন্তু আমরা হলাম রাজনীতির বিপরীত শক্তি বা ‘কাউন্টারওয়েট’। আমাদের সাধারণ মানুষের কাজ করতে হবে, রাজনীতিবিদদের কাজ নয়।’’ ভেন্ডারস যুক্তি দেন, সিনেমা মানুষের চিন্তাধারা বদলাতে পারে, কিন্তু রাজনীতিকদের সিদ্ধান্ত নয়।

আরেক জুরি সদস্য, পোলিশ চলচ্চিত্র প্রযোজক এওয়া পুশচিনস্কা প্রশ্নটিকে ‘খানিকটা অন্যায্য’ আখ্যা দিয়ে বলেন, শিল্পীরা দর্শকদের রাজনৈতিক পছন্দের দায়ভার নিতে পারেন না। তিনি আরও যোগ করেন, ‘পৃথিবীতে আরও অনেক যুদ্ধ চলছে, যেখানে গণহত্যা হচ্ছে, কিন্তু আমরা তো সেগুলো নিয়ে কথা বলছি না।’

প্রসঙ্গত, গাজা নিয়ে আলোচনার ঠিক ওই মুহূর্তটিতেই সংবাদ সম্মেলনের লাইভ সম্প্রচার হঠাৎ করে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যাকে উৎসব কর্তৃপক্ষ পরে ‘যান্ত্রিক ত্রুটি’ বলে দাবি করেছে।
জুরি বোর্ডের এমন মন্তব্য প্রকাশ্য হওয়ার পর শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে অরুন্ধতী রায় জানান, ভেন্ডারস ও অন্য জুরিদের এমন মন্তব্যে তিনি ‘হতবাক ও বীতশ্রদ্ধ’।

১৯৯৭ সালে ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ উপন্যাসের জন্য বুকার পুরস্কার জয়ী এই লেখিকাকে এবারের উৎসবে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। উৎসবের ‘ক্ল্যাসিকস’ বিভাগে তাঁর অভিনীত ও চিত্রনাট্য লেখা ১৯৮৯ সালের সিনেমা ‘ইন হুইচ অ্যানি গিভস ইট দোজ ও’-এর একটি পরিমার্জিত সংস্করণ প্রদর্শিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জুরিদের মন্তব্যকে ‘বিবেকবর্জিত’ আখ্যা দিয়ে গভীর আক্ষেপের সঙ্গে তিনি উৎসব বয়কটের ঘোষণা দেন। অরুন্ধতী তাঁর বিবৃতিতে বলেন, ‘শিল্পের কোনো রাজনৈতিক অবস্থান থাকা উচিত নয়–তাদের মুখে এমন কথা শোনাটা আক্ষরিক অর্থেই বিস্ময়কর।’

গাজায় ইসরায়েলের চলমান হামলাকে তিনি সুস্পষ্ট ভাষায় ‘ইসরায়েল দ্বারা ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর চালানো একটি গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি শিল্পীদের নীরবতার তীব্র সমালোচনাও করেছেন। ইতিহাস তাদের বিচার করবে–বলেও উল্লেখ করেছে এই লেখিকা।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কট্টর সমালোচক এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে বরাবরই সোচ্চার থাকা অরুন্ধতী রায়ের এই বয়কট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে।
অরুন্ধতী রায়ের পাশাপাশি মিসরীয় নির্মাতাদের দুটি পুরোনো সিনেমার পরিমার্জিত সংস্করণও গাজা ইস্যুতে উৎসব থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো–প্রয়াত আত্তেয়াত আল আবনুদির ‘স্যাড সং অব তোউহা’ এবং হুসেইন শরিফের ‘দ্য ডিসলোকেশন অব অ্যাম্বার’।

এসব বয়কটের পরিপ্রেক্ষিতে বার্লিনালের এক মুখপাত্র এএফপিকে বলেন, ‘বার্লিনালে এসব সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমরা গভীরভাবে দুঃখিত যে তাদের আমরা স্বাগত জানাতে পারব না, কারণ তাদের উপস্থিতি এই উৎসবের আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারত।’

ঐতিহাসিকভাবে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব প্রগতিশীল এবং রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক কাজের জন্য পরিচিত। কিন্তু এবারের চিত্র যেন ভিন্ন। গাজা ইস্যুতে জার্মানির রাষ্ট্রীয় অবস্থানের কারণেই কি এমন নীরবতা?

যুক্তরাষ্ট্রের পর ইসরায়েলে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র রপ্তানি করে জার্মানি। ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ ঠেকাতে দেশটিতে বর্তমানে অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা জারি রয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালেও বার্লিনালে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সেবার গাজায় ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ও ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের প্রামাণ্যচিত্র ‘নো আদার ল্যান্ড’ সেরা ডকুমেন্টারির পুরস্কার জয় করে। কিন্তু পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে পরিচালকদের গাজা নিয়ে দেওয়া বক্তব্যকে জার্মান সরকারি কর্মকর্তারা ‘একপেশে’ বলে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।

জার্মানির এই অবস্থানের প্রতিবাদে ২০২৪ সালে পাঁচ শতাধিক আন্তর্জাতিক শিল্পী, নির্মাতা ও সংস্কৃতিকর্মী জার্মান-অর্থায়িত প্রতিষ্ঠানগুলো বয়কটের ডাক দিয়েছিলেন। তারা জার্মানির এই নীতিকে ‘ম্যাককার্থিজম’ বা ভিন্নমত দমনের নিকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। এই ভীতিকর নজরদারি পরিবেশের প্রভাব পড়েছে উৎসবে আসা তারকাদের ওপরও। মার্কিন অভিনেতা নিল প্যাট্রিক হ্যারিসকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় তাঁর ফ্যাসিবাদ দমনে শিল্প ভূমিকা রাখতে পারে কিনা, তিনি তা এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘অরাজনৈতিক’ কিছু করতেই তিনি বেশি আগ্রহী। একইভাবে সম্মানসূচক ‘গোল্ডেন বিয়ার’ পাওয়া মালয়েশিয়ান অভিনেত্রী মিশেল ইয়ো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৭১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এমন একটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে শিল্পের ‘অরাজনৈতিক’ হওয়ার দাবি কতটা যৌক্তিক?

ভিম ভেন্ডারস যখন বলেন, নির্মাতাদের ‘রাজনীতির বাইরে থাকতে হবে’, তখন তা আসলে শিল্প ও রাজনীতির কোনো তাত্ত্বিক বিতর্ক থাকে না। এটি মূলত চোখের সামনে ঘটে চলা একটি নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞকে অস্বীকার করার এবং সে বিষয়ে জোরপূর্বক নীরবতা চাপিয়ে দেওয়ার একটি কৌশল হয়ে দাঁড়ায়।

অরুন্ধতী রায় বার্লিনালে ২০২৬ বয়কটের মাধ্যমে মূলত সেই জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া নীরবতাকেই ভেঙেছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ভয়াবহ নিপীড়ন ও গণহত্যার মতো পরিস্থিতিতে ‘নিরপেক্ষতা’ বজায় রাখা কোনোভাবেই নিরপেক্ষতা নয়; বরং তা নিপীড়কের পক্ষ নেওয়ারই শামিল। শিল্পীর কাজ শুধু সুন্দরের আরাধনা নয়, বরং অসুন্দর ও অন্যায়ের চোখে চোখ রেখে সত্যটা বলা– অরুন্ধতীর এই সাহসী পদক্ষেপ সেই চিরন্তন সত্যটিই আবার প্রতিষ্ঠিত করল। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *