ঐতিহাসিক জপমালা রানীর গির্জা

ঢাকার কোলাহলমুখর জীবন থেকে কিছুটা দূরে, নবাবগঞ্জ উপজেলার ইছামতী নদীর তীরবর্তী একটি শান্ত জনপদ হাসনাবাদ। সবুজে ঘেরা কোলাহলমুক্ত গ্রামেই দাঁড়িয়ে রয়েছে কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস আর ঐতিহ্যের অনন্য সাক্ষী–‘পবিত্র জপমালা রানীর গির্জা’। শুধু খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় হিসেবেই নয়–ধর্মীয় সম্প্রীতি, অলৌকিক কিংবদন্তি এবং প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীরও এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
হাসনাবাদ, গলাশিকান্দা, নয়নশ্রী, রাউতহাটি, ইকরাশি, ইমাননগর ও নয়ানগর সংলগ্ন এলাকাগুলোর প্রায় চার হাজার খ্রিষ্টভক্তের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র এই জপমালা রানীর গির্জা। তবে এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ৪০০ বছরের এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস, দেশান্তরের বেদনা এবং মানুষের ভক্তি ও বিশ্বাস।

হাসনাবাদ ও সংলগ্ন অঞ্চলে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের পদচারণার ইতিহাস প্রায় চার শতকের পুরোনো। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট শাহজাহানের নির্দেশে মোগল সেনারা হুগলিতে পর্তুগিজদের কুঠি ও গির্জা ধ্বংস করে দেয়। সে সময় প্রাণে বাঁচতে অনেক পর্তুগিজ ও বাঙালি খ্রিষ্টান দেশান্তরী হন।
তারা নদীপথে পালিয়ে বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার লরিকোপে বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে পদ্মার ভাঙনের মুখে তারা স্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। পদ্মা পাড়ি দিয়ে তারা ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ ও দোহারের শানকি, মালিকান্দা ও বান্দুরা অঞ্চলে নতুন করে জীবন শুরু করেন। পরে বাধ্য হয়ে হাসনাবাদ এলাকায় স্থায়ীভাবে বসতি গড়েন।
হাসনাবাদের এই গির্জা প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে রোমাঞ্চকর ইতিহাস। প্রাচীন নথিপত্র অনুযায়ী, হাসনাবাদের আদি নাম ছিল ‘হোসেনবাদ’ বা ‘হুসেনবাদ’; যার জমিদার ছিলেন দোস্ত মুহাম্মদ ওসমান। তাঁর নায়েব বিষ্ণু চন্দ্র তেওয়ারি একসময় চাতুর্যের আশ্রয়ে জমিদারকে বিতাড়িত করে নিজেই এ এলাকার কর্তৃত্বে বসেন। মোগলদের আশীর্বাদপুষ্ট নায়েব তেওয়ারি সদলবলে ঘোড়ায় চড়ে এলাকায় দাপিয়ে বেড়াতেন।

এমনই এক সময় হুগলি থেকে ইছামতী নদীর তীরে এসে ভেড়ে একটি পর্তুগিজ জাহাজ। সেই জাহাজ থেকে নামেন শ্বেতশুভ্র দীর্ঘকায় এক যাজক–ফাদার রাফায়েল গোমেজ। তিনি এই অঞ্চলে খ্রিষ্টীয় বাণী প্রচার শুরু করলে ক্ষিপ্ত হন নায়েব বিষ্ণু চন্দ্র তেওয়ারি। ফাদারকে ধরে নিয়ে একটি অন্ধকূপে নিক্ষেপ করেন তিনি। এর পরপরই ঘটে এক অদ্ভুত ঘটনা। ফাদারকে অন্ধকূপে ফেলার দিন থেকেই নায়েব তেওয়ারি তীব্র পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হন। কোনো চিকিৎসাতেই কাজ হচ্ছিল না। মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা স্বামীর আরোগ্য কামনায় তাঁর স্ত্রী ভগবানকে ডাকতে থাকেন। তৃতীয় রাতে তিনি স্বপ্নে দেখেন, এক জ্যোতির্ময়ী রমণী, যাকে মাতা মেরি বা জপমালা রানী বলে বিশ্বাস করা হয় তাঁকে বলছেন–‘ফাদারকে কূপ থেকে মুক্ত না করা পর্যন্ত তোমার স্বামীর রোগমুক্তি ঘটবে না।’

চতুর্থ দিন সকালে তড়িঘড়ি করে ফাদার রাফায়েলকে কূপ থেকে তোলা হয়। আশ্চর্যের বিষয়, তিন দিন ও তিন রাত অনাহারে অন্ধকূপে থাকার পরও ফাদার ছিলেন সম্পূর্ণ অক্ষত ও সুস্থ! এই অলৌকিক ঘটনায় নায়েব তেওয়ারি গভীরভাবে আলোড়িত হন। তাঁর মনের আমূল পরিবর্তন ঘটে। তিনি ফাদারের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন এবং খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের সুবিধার্থে হাসনাবাদে জমি দান করেন। এই ভূমিদানের কথা একটি স্বর্ণপাত্রে খোদাই করা হয়েছিল, যা আজও ইতিহাসের এক অমূল্য স্মারক হিসেবে সংরক্ষিত আছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এরপর নায়েব সস্ত্রীক লক্ষ্ণৌ চলে যান।
নায়েব তেওয়ারির দান করা জমিতে ১৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দে ফাদার রাফায়েল গোমেজ প্রথম উপাসনালয়টি নির্মাণ করেন। শুরুর দিকে গির্জা ঘরটি ছিল নিতান্তই সাধারণ–ছনের চাল আর চারপাশে বাঁশের বেড়া, কেবল বেদিটি ছিল পাকা। এ গির্জাটি উৎসর্গ করা হয় যিশুখ্রিষ্টের মাতা মেরি বা ‘জপমালা রানী’র নামে। পরবর্তী ১১১ বছর পর ১৮৮৮ সালে বর্তমানের এই বৃহৎ ও সুদৃশ্য গির্জা ভবনটি নির্মাণ করা হয়। এরপর কালের পরিক্রমায় ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লে এর মূল স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন রেখে দীর্ঘ ১১৪ বছর পর ২০০২ সালে গির্জাটির ব্যাপক সংস্কারকাজ সম্পন্ন হয়।
প্রায় ১০ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা বর্তমান গির্জা প্রাঙ্গণটি যেন এক টুকরো স্বর্গ। মূল ভবনের পাশাপাশি এখানে রয়েছে সাজানো-গোছানো বাগান, শান বাঁধানো ঘাট, বিশাল খেলার মাঠ এবং একটি শান্ত সমাধিস্থল।

এই ধর্মপল্লির ইতিহাস শুধু উপাসনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, শিক্ষা ও সমাজসেবায়ও রেখেছে অনন্য অবদান। বিদেশি মিশনারিদের সহযোগিতায় এখানে গড়ে উঠেছে শতাব্দীপ্রাচীন দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান–বান্দুরা হলি ক্রস উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১২) এবং সেন্ট ইউফ্রেজিস বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।
হাসনাবাদ জপমালা রানীর গির্জা শুধু খ্রিষ্টানদেরই নয়, সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতীক। প্রতিদিন সকালে এবং প্রতি রোববার খ্রিষ্টভক্তরা এখানে উপাসনায় মিলিত হন। তবে প্রতিবছর ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন উপলক্ষে এ গির্জাকে কেন্দ্র করে বসে এক মহামিলন মেলা। আর উৎসবের আমেজে মেতে ওঠে পুরো নবাবগঞ্জ। দূর-দূরান্তের হাজারো দর্শনার্থী– সব ধর্মের মানুষ উৎসবে যোগ দেন।
হাসনাবাদ ধর্মপল্লির যাজক কল্লোল লরেন্স রোজারিও এই সম্প্রীতির কথা তুলে ধরে বলেন, ‘গির্জাকে কেন্দ্র করে সুন্দর ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। জপমালা রানী বা যিশুখ্রিষ্টের মাতা মেরি আমাদের এই ধর্মপল্লির প্রতিপালিকা। এখানে কোনো হিংসা-হানাহানি নেই। আমাদের সম্প্রদায়ের লোকজন অন্যান্য ধর্মের মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে পাশাপাশি বসবাস করছে।’
কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হাসনাবাদের ‘জপমালা রানীর গির্জা’ তাই নিছক কোনো ইমারত নয়, এটি বিশ্বাস ও ভালোবাসার সৌধ, যা শত শত বছরের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে একই সুতোয় বেঁধে রেখেছে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *