২০০ বছর পর ফিরল ‘ডারউইনের ঘুঘু’

সবাই ধরেই নিয়েছিল, গ্যালাপাগোস ঘুঘুর সাক্ষাৎ আর মিলবে না। এরা বিলুপ্ত। সর্বশেষ মানুষ তাদের দেখেছিল ১৮৩৫ সালে। অর্থাৎ প্রায় ২০০ বছর আগে। বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন ছিলেন শেষ ব্যক্তি, যিনি এ ঘুঘুদের অস্তিত্ব শেষবার রেকর্ড করেন। সম্প্রতি ইকুয়েডরের ফ্লোরিয়ানা দ্বীপপুঞ্জে আবারও ছোট্ট এ পাখিদের উপস্থিতি মিলছে। বিস্ময়করভাবে তারা ফিরে এসেছে প্রায় দুই শতক পর।

স্বভাবে লাজুক গ্যালাপাগোস থাকে মাটিতেই; এরা উড়তে পারে না। ঝোপঝাড়ের মধ্যে গর্ত তাদের ঠিকানা। গত বছর ফ্লোরিয়ানা থেকে ইঁদুর ও বন্য বিড়াল অপসারণে উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর পরই দ্বীপে আশ্চর্যজনকভাবে ফের আবির্ভূত হয়ে পাখিটি সংরক্ষণবাদীদের অবাক করে দিয়েছে। হারিয়ে যাওয়া পাখিটি কীভাবে ফিরে এলো, তা এক বড় রহস্য।

ফ্লোরিয়ানার পুনরুদ্ধারকারী সংস্থাগুলোও এ নিয়ে বিস্মিত। দ্বীপের প্রাণ-প্রকৃতি সংরক্ষণে কাজ করা পশু চিকিৎসক পাউলা কাস্তানো বলেন, ‘গ্যালাপাগোসের এমন প্রত্যাবর্তন আমাদের প্রত্যাশার বাইরে ছিল। এটি ফ্লোরিয়ানায় দেখা গেছে।’ তিনি বলেন, সম্ভবত এটি এতদিন একটি ছোট, গোপন, অলক্ষিত গোষ্ঠী হিসেবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল। ইকুয়েডরের জোকোটোকো কনজারভেশন ফাউন্ডেশনের সামুদ্রিক প্রাণী বিষয়ক বিজ্ঞানী পাওলা সাঙ্গোলকি বলেন, ‘এসব পাখি আবার দেখা যাচ্ছে। এখন তাদের দ্বীপের চারপাশে প্রায়ই ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। আপনি তাদের গান শুনতে পাচ্ছেন। তাদের দেখতে পাচ্ছেন– বিষয়টি অবিশ্বাস্য।’ 

এ পাখিদের শিকার করে– এমন প্রজাতির প্রাণীদের অপসারণের কারণে তারা ফিরে আসছে বলে মনে করেন গবেষকরা। ফ্লোরিয়ানা ও অন্যান্য দ্বীপপুঞ্জে বিভিন্ন পাখির প্রজাতি নিয়ে ২০ বছর ধরে গবেষণা করছেন ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী সোনিয়া ক্লেইনডর্ফার। তিনি বলেন, অত্যন্ত বিরল বলে বিবেচিত এ প্রজাতি তাৎক্ষণিক ফিরে এসেছে। এটি একটি উল্লেখযোগ্য ও আকস্মিক প্রত্যাবর্তন। 
গাঢ় নীল ছোট আকারের এ পাখির চোখের মণি কালো; তবে চারপাশটা লাল। ঠোঁট কালো। পিঠের অংশ অপেক্ষাকৃত কালো; ওপরে সাদা সাদা দাগ। ২০২৩ সালের শেষ দিকে এক দশকের প্রস্তুতির পর ফ্লোরিয়ানার স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার প্রকল্পের অংশ হিসেবে ইঁদুর ও বন্য বিড়াল নির্মূল অভিযান শুরু হয়। এর পরই এদের বিস্ময়কর প্রত্যাবর্তন ঘটে। 

ফ্লোরিয়ানা পুনরুদ্ধার প্রকল্পের অংশ চার্লস ডারউইন ফাউন্ডেশনের ল্যান্ডবার্ড সংরক্ষণের কর্মকর্তা বির্গিট ফেসলের মতে, নির্মূল অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় ২০২৫ সালে পাখি গণনা থেকে জানা যায়, গ্যালাপাগোস ঘুঘু, লাভা টিকটিকি, গেকো ও ডার্ক-বিল্ড কোকিলের মতো বেশ কয়েকটি প্রজাতি, যা আগে বিরল ছিল– সেগুলো বেশ ঘন ঘন দেখা যাচ্ছে। ফেসল বলেন, ‘কিন্তু সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ বিষয় ছিল গ্যালাপাগোসের পুনরাবিষ্কার। পাখিটি বহু শতাব্দী ধরে ফ্লোরিয়ানায় পাওয়া যায়নি। কেবল ইতিহাসেই ছিল উপস্থিতি। ডারউইন নিজেই এর নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন।  
ইকুয়েডরের ফ্লোরিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের অনেক স্থানই উঁচু ঘাসের জঙ্গলে পূর্ণ। এগুলোতে প্রবেশ করাও কঠিন। এসব ঘন ঘাসের জঙ্গলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাস করে নিরীহ ঘুঘুরা। দ্বীপটির সৌন্দর্য নিয়ে ডারউইন লিখেছেন, এসব দ্বীপপুঞ্জের প্রথম দর্শনের আকর্ষণীয় আর কিছু নেই।

ফ্লোরিয়ানা দ্বীপপুঞ্জে এখন অন্যান্য বিপন্ন পাখিরও উপস্থিতি বেড়েছে। পাখিরা সুর করে গান গাইছে, যা আগে কখনও দ্বীপে শোনা যায়নি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, একটি নিরাপদ ও শিকারিমুক্ত পরিবেশ কীভাবে প্রাণীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উদ্ভাবনের সুযোগ করে দিতে পারে, এ পরিবর্তন সে সম্পর্কে নতুন অন্তর্দৃষ্টি প্রকাশ করে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *