চাঁদে যেতে নাসার প্রস্তুতি

পাঁচ দশকের বেশি সময় পর আবার মানুষকে চাঁদের পথে পাঠাতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। বহুল প্রতীক্ষিত আর্টেমিস-২ মিশনের জন্য নির্বাচিত চার নভোচারী এখন চূড়ান্ত প্রস্তুতি পর্যায়ে প্রবেশ করেছেন। তাদের যাত্রা শুধু মহাকাশ অভিযান নয়, বরং মানবজাতির মহাকাশ অনুসন্ধানের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। 

গত শুক্রবার চার নভোচারী টেক্সাসের হিউস্টন থেকে বিমানে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারে পৌঁছান। এখান থেকেই তারা নাসার বিশাল আকৃতির স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এসএলএস) রকেটে করে মহাকাশে যাত্রা করবেন। আগামী ১ এপ্রিলের মধ্যে এ উৎক্ষেপণ সম্পন্ন হতে পারে। 

এই অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নাসার অভিজ্ঞ নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কচ ও কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন। চারজনের দলটি দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় ধরে কঠোর প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে এ পর্যায়ে এসেছে।

নভোচারীরা যাত্রা করবেন ওরিয়ন নামের অত্যাধুনিক ক্রু ক্যাপসুলে, যা বিশেষভাবে গভীর মহাকাশে মানুষ বহনের জন্য তৈরি করা হয়েছে। প্রায় ১০ দিনের এই মিশনে তারা উচ্চগতিতে চাঁদের চারপাশে একটি কক্ষপথে ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। যদিও এই মিশনে চাঁদে অবতরণের পরিকল্পনা নেই। তবে এটি হবে এমন একটি যাত্রা, যা পৃথিবী থেকে এর আগে মানুষ এত দূরে যায়নি। 

রিড ওয়াইজম্যান কেনেডি স্পেস সেন্টারে পৌঁছানোর পর সাংবাদিকদের বলেন, এই দেশ এবং পুরো বিশ্ব দীর্ঘদিন ধরে আবার এমন একটি মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করেছে। আর তাঁর দল মহাকাশে যাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। 

আর্টেমিস কর্মসূচি নাসার একটি বহু বিলিয়ন ডলারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যার লক্ষ্য চাঁদে মানুষের স্থায়ী উপস্থিতি গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর পথ তৈরি করা। আর্টেমিস-২ এ কর্মসূচির প্রথম মানববাহী মিশন।

এই অভিযানের মাধ্যমে ওরিয়ন মহাকাশযানের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি যেমন জীবনরক্ষা ব্যবস্থা, নেভিগেশন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং তাপরোধী ঢাল পরীক্ষা করা হবে। এই পরীক্ষাগুলো ভবিষ্যতে চাঁদে অবতরণসহ আরও বড় মিশনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

এই মিশনে ব্যবহৃত এসএলএস রকেটের মূল অংশ নির্মাণ করেছে বোয়িং। কঠিন জ্বালানির বুস্টার তৈরি করেছে নর্থরপ গ্রুম্যান। আর ওরিয়ন মহাকাশযান তৈরি করেছে লকহিড মার্টিন। এ প্রকল্পে একাধিক বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত অংশগ্রহণ রয়েছে। 

চার নভোচারীর মধ্যে তিনজনের মহাকাশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে। রিড ওয়াইজম্যান ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ১৬৫ দিন কাটিয়েছেন। ভিক্টর গ্লোভার ২০২০ সালে স্পেসএক্সের ক্রু-১ মিশনে অংশ নিয়ে ১৬৮ দিন মহাকাশে ছিলেন। ক্রিস্টিনা কচ ২০১৯ সালে টানা ৩২৮ দিন মহাকাশে অবস্থান করে নারীদের মধ্যে দীর্ঘতম সময় থাকার রেকর্ড গড়েন। অন্যদিকে জেরেমি হ্যানসেনের এটি হবে প্রথম মহাকাশযাত্রা, যা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার দীর্ঘদিনের মহাকাশ সহযোগিতার প্রতিফলন।

এই মিশনে আরও কয়েকটি ঐতিহাসিক দিক রয়েছে। ভিক্টর গ্লোভার চাঁদের নিকটবর্তী অঞ্চলে যাওয়া প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী হতে যাচ্ছেন। ক্রিস্টিনা কচ হবেন প্রথম নারী নভোচারী, যিনি এ ধরনের মিশনে অংশ নিচ্ছেন। আর জেরেমি হ্যানসেন হবেন প্রথম অ-মার্কিন নভোচারী, যিনি পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথের বাইরে পা রাখতে যাচ্ছেন। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *